আগেই বলেছি, এই দৃষ্টান্তগুলি খুব কিছু বাছাই করে উদ্ধৃত করিনি। তার বদলে, প্রায় এলোমেলোভাবেই গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এগুলির মধ্যেই যে-বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা বিচার করলে চিত্তাকর্ষক তথ্য নিশ্চয়ই পাওয়া যায়।
প্রথমত দেখা যাচ্ছে, তৃতীয় দৃষ্টান্তের বেলায় লেখকরা Tribe শব্দ ব্যবহার করছেন কিন্তু আগের দুটি দৃষ্টান্তে caste শব্দ। অথচ তিনটি ক্ষেত্রেই মনবদলের যে-ধরনের বর্ণনা তার মধ্যে এমন কোনো ইংগিত নেই যার দরুন এই দু’রকম পৃথক শব্দ-ব্যবহার সমর্থিত হতে পারে। ট্রাইব আর কাস্ট অবশ্যই এক নয়; কিন্তু লেখকরা দেখছেন, তা সত্ত্বেও যেন একই রকম। সেই কারণেই আমরা বলছিলাম, এই ধরনের পিছিয়ে-পড়া মানুষদের পরীক্ষা করলে দেখা যায় ট্রাইব এবং কাস্ট-এর সীমারেখাটা অস্পষ্ট। তার মানে, ট্রাইব্যাল সমাজের অসমাপ্ত ধ্বংসাবশেষই জাতি-ভেদ প্রথার মূল উপাদান।
দ্বিতীয়ত দেখা যাচ্ছে, প্রথম নমুনাটির বেলায় যদিও লেখকরা exogamous sections বলে শব্দ ব্যবহার করছেন তবুও দ্বিতীয় এবং তৃতীয় নমুনার বেলায় তাঁরা exogamous septs বলে পরিভাষা ব্যবহার না করে পারছেন না। নৃতত্ত্বের ছাত্রের আকছে exogamous septs নামের পরিভাষা অপরিচিত নয়; কিন্তু এই পরিভাষা শুধুমাত্র ট্রাইব্যাল-সংগঠন সম্বন্ধেই প্রাসঙ্গিক। তার মানে কি এই নয় যে, লেখকরা এখানে caste বা জাতের বর্ণনায় এমন পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করেছেন যা শুধুমাত্র ট্রাইব-প্রসঙ্গেই প্রযোজ্য? কিন্তু আসল সমস্যাটা শুধুমাত্র পারিভাষিক শব্দ ব্যবহারের সমস্যাই নয়, তার চেয়ে ঢের মৌলিক এক সমস্যা। কেননা, তাঁরা একম একরকম সামাজিক প্রথার সম্মুখীন হয়েছেন যাকে একদিক থেকে কাস্ট বা জাত না বলে পারছেন না; আবার অপরদিকে তারি আভ্যন্তরীণ অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ট্রাইব্যাল-সংগঠনের পক্ষে প্রাসঙ্গিক পরিভাষা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর থেকে অনুমান করা যেতে পারে। জাত বা কাস্ট বলে ব্যবস্থাটি কোথা থেকে এলো।
বিষয়টির আলোচনা ভালো করে করতে হলে এখানে ট্রাইব্যাল-সংগঠনের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উল্লেখ করা দরকার।
আমেরিকা আদিবাসীদের মধ্যে মর্গান ট্রাইব্যাল-সমাজের যে-রূপটি দেখেছিলেন তাকেই আমরা এ-সংগঠনের টিপিক্যাল রূপ বা আদি-অকৃত্রিম রূপ মনে করতে পারি।
মর্গান দেখাচ্ছেন, প্রতিটি ট্রাইব সাধারণত বড়ো বড়ো দুটি ভাগে বিভক্ত। এই দুটি ভাগবে বলা হয় ফ্রাত্রি বা phartry। প্রতিটি ফ্রাত্রি আবার কয়েকটি করে আরো ছোটোছোটো মানবগোষ্ঠীতে বিভক্ত। এই ছোটো ছোটো গোষ্ঠীর মধ্যে প্রত্যেকটি মানুষই প্রত্যেকের সঙ্গে নিজেকে সজ্ঞাতি মনে করে, তাদের ধারণায় একই পূর্বপুরুষ থেকে তাদের সকলের উৎপত্তি। মর্গান এই ছোটোছোটো গোষ্ঠীগুলিকে বলছেন গেন্স্ বা gens; কিন্তু যে-কোনো কারণেই হোক আধুনিক নৃতত্ত্ববিদ্দের মধ্যে মর্গানের ওই পরিভাষাটি জনপ্রিয় হয়নি। গেন্স্-এর বদলে তাঁরা অন্যান্য শব্দ ব্যবহার করে থাকেন,—সাধারণত ক্লান (clan), কখনো বা সেপ্ট (sept), কখনো বা সিব্ (sib)। অবশ্যই, ট্রাইব্যাল-সমাজের উচ্চতম পর্যায়ে একাধিক ট্রাইব একটি বৃহত্তর সংগঠনের মধ্যে মিলিত হয়—তাকে বলা হয়েছে কন্ফেডারেসি অব্ ট্রাইব্স্ বা confederacy of tribes। এবং প্রত্যেক ট্রাইবের ক্ষেত্রেই দুটি করে ফ্রাত্রি চোখে পড়তে বাধ্য নয়; কোনো কোনো দৃষ্টান্তে ফ্রাত্রি চোখে পড়েই না, কোনো কোনো দৃষ্টান্তে ফ্রাত্রির সংখ্যা দুই-এর বেশি। কিন্তু এ-জাতীয় দৃষ্টান্তকে মোটের উপর ব্যতিক্রম মনে করা যেতে পারে।
গেন্স্ বা ক্লান সম্বন্ধে মর্গানের একটি মন্তব্য আমরা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। তিনি বলছেন, আমেরিকার আদিবাদসীদের মধ্যে সর্বত্রই চোখে পড়ে, কোনো-না-কোনো জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকেই এগুলির নামরকণ করা হয়েছে(২৩৮)। এই নামরকণ পদ্ধতি অবশ্যই টোটেম্-বিশ্বাসের পরিচায়ক।
এবার মর্হানের গ্রন্থ(২৩৯) থেকে একটি মূর্ত দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যাক।
‘ইরোকোয়া’দের কন্ফেডারেসি অব্ ট্রাইবস্
| কন্ফেডারেসির অন্তর্গত ছ’টি ট্রাইবের নাম | প্রতি ট্রাইবের অন্তর্গত ফ্রাত্রি | ফ্রাত্রির অন্তর্গত গেন্স্ বা ক্লান (পঞ্চম ও ষষ্ঠ ট্রাইবের বেলায় ফ্রাত্রি নেই) |
| ১ : সেনেকা (Seneca) | ক | ১ : ভালুক, ২ : নেকড়ে, ৩ : বীবর, ৪ : কাছিম। |
| খ | ১ : হরিণ, ২ : কাদাখোঁচা পাখি, ৩ : বক, ৪ : বাজপাখি। | |
| ২ : কেউগা (Cayuga) | ক | ১ : ভালুক, ২ : নেকড়ে, ৩ : কাছিম, ৪ : কাদাখোঁচা, ৫ : ঈল্মাছ। |
| খ | ১ : হরিণ, ২ : বাজপাখি, ৩ : বীবর। | |
| ৩ : ওননডগা (Onondaga) | ক | ১ : নেকড়ে, ২ : বীবর, ৩ : কাছিম, ৪ : কাদাখোঁচা, ৫ : বল্। |
| খ | ১ : হরিণ, ২ : ভালুক, ৩ : ঈল্মাছ। | |
| ৪ : টুসকারোরা (Tuscarora) | ক | ১ : ভালুক, ২ : বীবর, ৩ : বড়ো কাছিম, ৪ : ঈল্মাছ। |
| খ | ১ : ধূসর নেকড়ে, ২ : হলদে নেকড়ে, ৩ : ছোটো কাছিম, ৪ : কাদাখোঁচা। | |
| ৫ : মোহক (Mohawk) | ১ : ভালুক, ২ : নেকড়ে, 3 : কাছিম। | |
| ৬ : ওনেইডা (Onelda) | ১ : ভালুক, ২ : নেকড়ে, ৩ : কাছিম। |
এই দৃষ্টান্তটিকে সামনে রেখে ট্রাইব্যাল-সমাজের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা যাক। আমাদের বর্তমান আলোচনার পক্ষে প্রধানত দুটি বিষয়ের কথাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হবে। ১ : বিবাহ-পদ্ধতি। ২ : শাসন-পদ্ধতি।
