আমাদের যুক্তি হলো, জাতিভেদ-প্রথার মূল ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে বৌদ্ধসাহিত্য ছাড়াও দুটি দিকে নজর রাখা দরকার। এক, ব্রাহ্মণাদি উচ্চ-বর্ণের কথা। দুই, সাম্প্রতিক ভারতবর্ষের বাস্তব পরিস্থিতির কথা। তাই এখানে আমাদের আকছে প্রধান প্রশ্ন হবে, জাতিভেদ-প্রথার মধ্যে এমন কোনো মূল লক্ষণ কি সত্যিই চোখে পড়ে যা একাধারে ব্রাহ্মণাদি উচ্চ-বগুলি এবং সাম্প্রতিক ভারতীয় পরিস্থিতি,—উভয়ের মধ্যেই বর্তমান? যদি সত্যিই সে-রকম কোনো লক্ষণের সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে সেইটির সূত্র ধরে অগ্রসর হয়েই এই জটিল সমস্যার সমাধান পাবার আশা আছে।
প্রথমত, বর্তমান ভারতের বাস্তব পরিস্থিতির কথাই বিচার করে দেখা যাক।
পুঁথিপত্রের গণ্ডি ছেড়ে আমরা যদি দেশের মানুষগুলির দিকে চেয়ে দেখতে রাজি হই আহলে প্রথমেই আমাদের চোখে পড়ে এক অতি বিস্ময়কর ঘটনা : আমাদের দেশের বিশেষ করে পিছিয়ে-পড়া অবস্থায় আটকে-থাকা মানুষদের মধ্যে ট্রাইব্যাল-ব্যবস্থা (Tribal organisation) এবং জাত-ব্যবস্থা (caste-organisation)—এই দুয়ের মধ্যে সীমারেখে সব সময় স্পষ্ট নয়। যাঁরা এই পিছিয়ে-পড়া মানুষদের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁদের অধিকাংশের বেলাতে গ্রন্থের নামকরণ ব্যাপারের মধ্যেই এই স্বীকৃতি থেকে গিয়েছে : বই-এর নামকরণ করবার সময় তাঁরা শুধুমাত্র Tribe বা শুধুমাত্র Caste শব্দ ব্যবহার করতে দ্বিধা বোধ করছেন—অতএব শিরোনামায় ট্রাইব এবং কাস্ট উভয় শব্দই সংরক্ষণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সেন্সাস্ কর্তৃপক্ষরা(২৩৬) এই পিছিয়ে-পড়া মানুষগুলির বর্ণনা দেবার জন্যে সাধারণত তাঁদের রিপোর্টের একটি স্বতন্ত্র খণ্ড প্রকাশ করে থাকেন এবং সেটির নাম দেওয়া হয় “ট্রাইবস্ এবং কাস্টস্” : ওই পিছিয়ে-পড়া মানুষদের ভিতর ট্রাইব এবং কাস্ট-এর মধ্যে সীমারেখাটা অস্পষ্ট বলেই এ ধরনের নামকরণ প্রয়োজন হয়েছে। একই কারণে, অনন্তকৃষ্ণ আয়ার, থার্স্টন, রাসেল প্রমুখ সকলেই ওই ধরনের মানুষদের সম্বন্ধে বই লেখবার সময় ট্রাইব এবং কাস্ট উভয় শব্দই প্রায় সমানার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন। কোনো একটি নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীকে ট্রাইব আখ্যা দেওয়া হবে, না, কাস্ট আখ্যা দেওয়া হবে—এ-বিষয়ে লেখকরা সব সময় খুব সুনিশ্চিত নন। এর থেকেই কি অনুমান করবার অবকাশ থাকে না যে, কাস্ট-সংগঠন ও ট্রাইব-সংগঠন খুবই ঘনিষ্ট সম্বন্ধে সংযুক্ত? আর যদি তাই হয়, তাহলে ট্রাইব-সংগঠন সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে পারা তথ্যকে অবলম্বন করেই কাস্ট-সংগঠনের সমস্যা সমাধান করবার আশা থাকে না কি? অবশ্যই, তাই বলে ট্রাইব আর কাস্টকে এক মনে করবার কারণ নেই; ট্রাইব্যাল-সমাজ বহু দেশেই টিকে আছে, কিন্তু জাতিভেদ-প্রথ সর্বত্র নেই। ভারতবর্ষেই যে-সব জায়গায় ট্রাইব্যাল-সমাজের বিশুদ্ধরূপ সেখানেও জাতিভেদ-প্রথার পরিচয় নেই। আমরা তাই অনুমান করতে চাইছি, জাতিভেদ-প্রথা আসলে ট্রাইব্যাল -সমাজের অসমাপ্ত বিলোপের পরিমাণ—ট্রাইব্যাল-সমাজেরই ধ্বংসাবশেষ এর মধ্যে টিকে রয়েছে, কিন্তু ট্রাইব্যাল-সমাজের মূল প্রাণশক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধ্বংসাবশেষটির আদি-তাৎপর্য বিপরীতে পরিণত হয়েছে। এবং ট্রাইব্যাল-সমাজের ওই অসমাপ্ত বিলোপের কারণ হলো, উৎপাদন-কৌশলের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলো—উৎপাদন-পদ্ধতির সাধারণ বা স্বাভাবিক উন্নতির ফলে ট্রাইব্যাল-সমাজ যদি ভিতর থেকে ধ্বংস পেতো আহলে তার বিলোপ অম্পূর্ণ হতো না। সেদিক থেকে কৌটিল্যের উদ্ধৃতি নীতিটি ভারতীয় সমাজ-ব্যবস্থাকে বোঝবার কাজে একটি মূল্যবান মূলসূত্র।
জাতিভেদের কথায় ফিরে আসা যাক। প্রথমে দেখা যাক, পিছিয়ে-পড়া মানুষদের মধ্যে জাতিভেদ-প্রথার যে-রূপটি চোখে পড়ে তাতে ট্রাইব ও কাস্ট-এর মধ্যবর্তী সীমারেখা কী রকম অস্পষ্ট। এখানে এলোমেলো ভাবে কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করলেই চলবে, কেননা প্রকৃতপক্ষে এ-জাতীয় দৃষ্টান্ত প্রায় অসংখ্য।
আমরা রাসেল ও হীরালাল(২৩৭) রচিত “মধ্যভারতের ট্রাইব এবং কাস্ট” বলে বই থেকে এখানে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করবো :
1. The Ahir caste has sub-castes, which again are divided into exogamous sections. The names of these sections ar often titular and totemic animals.
2. The Andh caste : The caste is divided into two groups : the Vartati or pure and the Khaltati or illegitimate, which take food together but do not intermarry. These again are divided into a large number of exogamous sects a few of which names are totemic, e.g., Majiria (cat), Ruigni (a kind of tree), Dumare (from Dumarm an ant-hill), Dukare (from Dukar, a pig), Titawe (from Titwa, a bird), and so on.
3. The Baita, a primitive Dravadian tribe, is divided into seven sub-tribes, which again are divided into a number of exogamous septs, the names of which are identical with those of the Gonds, as Markm, Maravi, Netam, Tekam. Prohibition of marriage into these septs are based on the number of gods that they worship. No sept can marry into another sect which also worship the same gods.
