২০. ট্রাইব্যাল-সমাজের অসম্পূর্ণ বিলোপ : জাতিভেদ
সাবেকী ভারতবর্ষের সমাজ ব্যবস্থার আর একটি মূল বৈশিষ্ট্য হলো জাতিভেদ। এই প্রথার ব্যাখ্যা হিসেবে বহু মতবাদ(২২৬) দাঁড় করাবার চেষ্টা হয়েছে। এবং এ-বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে, জাতিভেদ সম্বন্ধে এখনো অনেক গবেষণার প্রয়োজন আছে। আমরা বলতে চাই, ট্রাইব্যাল সমাজের অম্পূর্ণ বিলোপ সংক্রান্ত আমাদের প্রকল্প এই বৈশিষ্ট্যটির উপরও আলোকপাত করতে পারে।
একটি সময়ে জাতিভেদ-প্রথার ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করা হয়েছিলো, হিন্দুদের শ্রুতি-স্মৃতির লিখিত স্বাক্ষ্যগুলিকে বিশ্লেষণ করেই(২২৭)। কিন্তু সে-চেষ্টা সফল হয়নি। কেননা, স্মৃতিশাস্ত্রে জাতিভেদ প্রথার যে পরিচয় পাওয়া যায় তার সঙ্গে বাস্তবে প্রতলিত প্রথাটির বড়ো একটা মিল নেই(২২৮)। স্মৃতিশাস্ত্র চতুর্বর্ণের কথাই বলে। কিন্তি বাস্তবভাবে দেখা যায় জাতি প্রায় অসংখ্য। কথার কথা হিসেবে আমরা বলি ছত্রিশ জাত—এও কিন্তু খুবই কমিয়ে বলা।
বাস্তবভাবে সমাজে এই যে প্রায় অসংখ্য জাতের অস্তিত্ব,—একে শুধুমাত্র একালের ব্যাপার মনে করলে ভুল হবে। অতি প্রাচীন কাল থেকেই এই রকম। এবং সেদিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন রিস্ ডেভিডস্, রিচার্ড ফিক্ প্রমুখ বৌদ্ধশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ বিদ্বানেরা(২২৯)।
এঁদের রচনায় ঐতিহাসিক তথ্যের উৎস হিসেবে বৌদ্ধ পুঁথিপত্রগুলির প্রতি নতুন উৎসাহ দেখা গেলো। এবং এঁরা বললেন, বৌদ্ধ গ্রন্থাবলী থেকে জাতিভেদ সংক্রান্ত ও সাধারণভাবে প্রাচীন ভারতের সমাজ-ইতিহাস সংক্রান্ত যে-সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তার সঙ্গে ব্রাহ্মণদের রচনায় উল্লেখিত মতামতগুলির মিল হয় না। ব্রাহ্মণ-সাহিত্য, পুরাণ ও বিশেষ করে স্মৃতিশাস্ত্রগুলিতে, ব্রাহ্মণেরা নিজেদের চাহিদা ও আকাঙ্খাকেই বাস্তবের বর্ণনা বলে প্রচার করবার চেষ্টা করেছেন। অবশ্যই, ফিক্(২৩০) মানছেন, ব্রাহ্মণ মতাবলীর মধ্যে যদিও বাস্তবের প্রতিচ্ছবি নেই তবুও সেগুলি যে সামাজিক বাস্তবের উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই। তবুও, তিনি(২৩১) বলছেন, ব্রাহ্মণদের রচনায় মূল চেষ্টাটা ছিলো, সমাজ-বাস্তবে যে সব অজস্র জাতের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে সেগুলির কথা কোনো মতে চতুর্বর্ণ-মূলক থিয়োরিটির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, এবং অতএব, এই অন্যান্য জাতিগুলির একটা কাল্পনিক ব্যাখ্যা উদ্ভাবন করা। ফিক্ দেখাবার চেষ্টা করছেন,(২৩২) ব্রাহ্মণ-মতবাদ অনুসারে যে-জাতিগুলিকে বর্ণশঙ্কর আখ্যা দেওয়া হচ্ছে এবং যেগুলির উৎস সম্বন্ধে নানা রকম কল্পিত কাহিনী প্রচার করা হচ্ছে সেগুলির নাম থেকেই বোঝা যায় যে, এগুলি স্থান-বাচক বা ট্রাইব-বাচক : অর্থাৎ, নামগুলি এসেছে হয় কোনো জায়গার নাম থেকে আর না হয়তো কোনো ট্রাইবের নাম থেকে। এ রকম নামের অনেক দৃষ্টান্তই তিনি উল্লেখ করেছেন : মাগধ, নিষাদ, বিদেহ, অম্বষ্ট, মল্ল, লিচ্ছবি, চণ্ডাল। আবার ফিক্ বলছেন, কোনো কোনো জাতের নাম এসেছে মানুষদের পেশার দিক থেকে। যেমন : সূত (রথকারক), বেন (যারা বেতের কাজ করে), নট, কৈবর্ত, (জেলে), ইত্যাদি(২৩৩)।
তাহলে, এই ধরনের জাতগুলির ব্যাখ্যা হিসেবে ফিক্-এর সিদ্ধান্তটা কী? তিনি বলছেন, এ-দেশে আর্য-সমাজের বহির্ভূত নানান মানবদল বর্তমান ছিলো। তাদের এবং তাদের পেশা সম্বন্ধে আর্যদের মনে ঘৃণা যতোই থাকুক না কেন, একেবারে সরাসরি তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা সম্ভব হয়নি। আবার চতুর্বর্ণের কোনো একটি বর্ণের অন্তর্গত বলে স্বাভাবিকভাবে তাদের স্বীকার করে নেওয়াও যায়নি। অতএব, চতুর্বর্ণ-মূলক আর্যদের ওই মতবাদটিকেই আরো একটু ব্যাপক করে নেবার চেষ্টা হলো এবং তথাকথিত শঙ্কর-জাতগুলির কথা চতুর্বর্ণের কোনো এক বর্ণের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে এগুলি পরিবার-গত ও পেশা-গত নামের একটি করে কাল্পনিক ব্যাখ্যাও উদ্ভাবণ করা হলো(২৩৪)।
বৌদ্ধযুগের ভারতীয়-সমাজ সম্বন্ধে রিচার্ড ফিক্-এর এই গবেষণা যতোই মূল্যবান হোক না কেন, জাতিভেদ-প্রথার ব্যাখ্যা হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্তগুলিকে অসম্পূর্ণ না বলে উপায় নেই। তার নানান কারণ আছে। একটি কারণ হলো, তিনি ওই ব্রাহ্মণ-সাহিত্যের তথ্যকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করে জাতিভেদ-প্রথার একটা ব্যাখ্যা খোঁজ করবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই ব্রাহ্মণ-সাহিত্যের কথাগুলিকে তিনি আর্যজাতির মনগড়া কথা বলে প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করলেও, জাতিভেদ-প্রথা ওই তথাকথিত আর্যদের মধ্যেও অত্যন্ত প্রকটভাবেই ফুটে উঠেছিলো। অতএব, বৌদ্ধশাস্ত্র থেকে শুধুমাত্র শঙ্কর-জাতিগুলির কথা বিশ্লেষণ করেই জাতিভেদ সমস্যার একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধান দেওয়া যায় না—সমাধানটিকে স্বীকারযোগ্য, অতএব পূর্ণাঙ্গ, করতে হলে ‘আর্য’দের চতুর্বর্ণ-ব্যবস্থারও একটা ব্যাখ্যা তারই মধ্যে থাকা দরকার।
দ্বিতীয়ত, ফিক্ তাঁর তথ্য সংগ্রহ করেছেন প্রধাণতই জাতকের গল্পগুলি থেকে। অবশ্যই, এবিষয়্যে কোনো সন্দেহ নেই যে, সে-যুগের ভারতবর্ষের একটি বিশেষ অঞ্চল সম্বন্ধে ঐতিহাসিক তথ্যের যোগান জাতকের গল্পগুলির মধ্যেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। কিন্তু সেই সঙ্গেই একথাও মনে রাখা দরকার যে, জাতিভেদ-প্রথা শুধুমাত্র সেকালের ব্যাপার নয়, একালের ব্যাপারও। তাই, একালের বাস্তব পরিস্থিতিকে ঠিক মতো বিশ্লেষণ করতে পারলে সেকালের সাহিত্যের উপর আলোকপাত হবার সম্ভাবনাও থেকে যায়। বস্তুত, এই সম্ভাবনা সম্বন্ধে ফিক্ নিজেও অচেতন নন। তিনি বলেছেন(২৩৫) :
We do not hesitate to make use of the conditions of modern India which, on account of the stability of most Oriental cultures, have preserved so much of the past for comparison with, and for the explanation of, the earlier periods.
অর্থাৎ, প্রাচ্য সংস্কৃতির স্থবিরতার দরুন ভারতের আধুনিক পরিস্থিতিতেও প্রাচীন অবস্থার অনেক কিছুই টিকে থেকেছে; তাই প্রাচীন অবস্থার সঙ্গে তুলনা করবার জন্যে ও প্রাচীন অবস্থাকে ব্যাখ্যা করবার জন্যে ভারতবর্ষের আধুনিক অবস্থার কথা ব্যবহার করতেও আমাদের দ্বিধা হয় না।
বলাই বাহুল্য, ফিক্-এর এই ইংগিতটি অত্যন্ত দুর্মূল্য। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ-ইংগিতের সম্ভাবনা তিনি নিজের গবেষণাক্ষেত্রে বাস্তবে পরিণত করেননি।
