অর্থাৎ, শিশুসুলভ সারল্যময় এই জ্ঞাতিভিত্তিক সংগঠন সত্যিই অপরূপ। সিপাই নেই, পাইক নেই, পুলিশ নেই, সামন্ত নেই, রাজা নেই, রাজ্যপাল নেই, উজির নেই, কাজি নেই, কারাগার নেই, বিচারালয় নেই, সব কিছু ঘটে চলে সহজ সরলভাবে।…এখানে গরিব বা অভাবগ্রস্থ বলে কেউই থাকতে পারে না—বৃদ্ধ, অসুস্থ এবং যুদ্ধের দরুন যারা অক্ষম তাঁদের প্রতি কী কর্তব্য তা সাম্যবাদী পরিবার ও ‘গেন্’-এর জানা আছে। সকলেই স্বাধীন আর সমান—মেয়েরা পর্যন্ত।…নির্দোষ রেড-ইণ্ডিয়ানদের সঙ্গে যে-সব সাদা মানুষ সংস্পর্শে এসেছে তারা সকলেই এদের প্রশংসা করেছে—এই অসভ্য মানুষদের আত্মমর্যাদা, কুটিলতার অভাব, চরিত্রবল ও সাহস সম্বন্ধে প্রশংসা এবং এর থেকে বোঝা যায় ওই জ্ঞাতিভিত্তিক সমাজ কোন ধরনের নরনারী তৈরী করেছে।
সম্প্রতি আমরা আফ্রিকায় এই বীরত্ব দেখতে পেয়েছি। বছর কয়েক আগে লুলু কাফিরেরা এবং মাস দুয়েক আগে নুবিয়ানরা—উভয় উপজাতির মধ্যেই জ্ঞাতিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এখনো টিকে আছে—যা করেছে, তা কোনো ইয়োরোপীয় সেনাবাহিনী করতে পারে না।…শ্রেণী-বিভাগ ফুটে ওঠবার আগে পর্যন্ত মানবজাতি ও মানবসমাজ এই রকমই ছিলো! এবং তাদের সঙ্গে আজকের সভ্য মানুষদের সবচেয়ে বিরাট অংশটির যদি তুলনা করা যায় তাহলে চোখে পড়ে, আধুনিক শ্রমিক ও কৃষকদের সঙ্গে সেই পুরানো ‘গেনস্’-এর স্বাধীন মানুষদের আকাশ-পাতাল তফাত।
এই হলো ছবিটির একপিঠ। কিন্তু ভুললে চলবে না যে এই সংগঠন ধ্বংস পেতে বাধ্য ছিলো।…এই আদিম যৌথ সম্প্রদায়গুলির শক্তি ভেঙে যাওয়া দরকার ছিলো, এবং তা ভেঙে গেলো। কিন্তু এমন প্রভাবের দরুন তা ভাঙলো যা শুরু থেকেই আমাদের কাছে অধঃপতন বলে প্রতীয়মান হয়—প্রাচীন জ্ঞাতিভিত্তিক সমাজের সরল নৈতিক ঐশ্বর্য থেকে পতন। ঘৃণিত লোভ, পশুসুলভ ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, পঙ্কিল মাৎসর্য, স্বার্থপরভাবে যৌথ সম্পদকে লুঠ করা,–এই সব নীচ উৎসাহ ফুটে উঠলো, নতুন সভ্য সমাজে, শ্রেণীবিভক্ত সমাজে। চুরি, ধর্ষণ, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা—এই সব ঘৃণিত পদ্ধতিতে প্রচীন শ্রেণীহীন জ্ঞাতিভিত্তিক সমাজকে দাবিয়ে দেওয়া ও ভাঙা হলো। এবং ওই নতুন সমাজটি—গত আড়াই হাজার বছর ধরে তার অবস্থিতির মধ্যে—সংখ্যাগরিষ্ঠদের শুষে সংখ্যাকনিষ্ঠদের উন্নতি ছাড়া আর কিছুই নয়—এবং আজকের দিনে তার এই রূপটি আগেকার যে-কোনো সমস্যের চেয়ে প্রকট।
মহাবস্তু অবদান প্রভৃতি আমাদের দেশের প্রাচীন পুঁথিতেও এ-স্মৃতি খুঁজে পাওয়া যায় যে প্রীতির সম্পর্কের উপর প্রতিষ্ঠিত এক প্রাচীন-সমাজের ধ্বংস্তুপের উপরই শ্রেণীবিভক্ত সভ্য-সমাজ গড়ে উঠেছে। এই সভ্য সমাজের শাসক সম্প্রদায়ের কাছে এঙ্গেলস-বর্ণিত চুরি, ধর্ষণ, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা প্রভৃতিই যে আদর্শ কূটনীতি বলে স্বীকৃত হয়েছিলো তার প্রমাণও আমরা কৌটিল্যের রচনা থেকেই পেয়েছি। এবং ওই “সহজ সরল নৈতিক ঐশ্বর্যপূর্ণ” মানুষদের ট্রাইব্যাল সমাজ একেবারে সাম্প্রতিক যুগেও আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়নি। সে-মানুষদের বীরত্বের পরিচয় আমাদের অত্যন্ত সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসেও বারবার পাওয়া গিয়েছে। এদের প্রসঙ্গেই জনৈক বিখ্যাত ইংরেজ আমলা(২২৩) লিখছেন:
The very officers who have had to act most sharply against them speak most strongly, and often not without a noble regret and self-reproach, in their favour. ‘It was not war’, Major Vincent Jervis writes of the operations against the Santals in 1855. ‘They did not understand yielding ; as long as their national drums beat, the whole party would stand, and allow themselves to be shot down. They were the most truthful set of men I ever met’.
যে-অফিসারেরা এদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে নির্মম ব্যবস্থা অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁরাই আবার এদের পক্ষে সবচেয়ে জোর দিয়ে কথা বলেছেন,–এই উক্তিগুলিতে প্রায়ই এদের প্রতি শ্রদ্ধা ও নিজেদের বিরুদ্ধে তিরস্কারের ভাব থেকেছে। ১৮৫৫-এ সাঁওতালদের বিরুদ্ধে অভিযান বর্ণনায় মেজর ভিনসেণ্ট জার্ভিস বলছেন, ‘একে যুদ্ধ বলে না। সম্পর্পণ বলতে কী বোঝায় ওরা তা জানে না। যতোক্ষণ ওদের জাতীয় ঢাক বেজে চলবে ততোক্ষণ পুরো দলটা সোজা হয়ে থাকবে এবং গুলি খেয়ে মরতে রাজি হবে। আমি জীবনে এ-রকম সত্যনিষ্ঠ মানুষ আর কখনো দেখিনি।’
ট্রাইব্যাল-সমাজের ওই প্রাণশক্তির দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে এঙ্গেলস(২২৪) বলছেন, তারই স্পর্শ পেয়ে রোমান-যুগের পাঁক থেকে মুমূর্ষু ইয়োরোপীয় সভ্যতা পুনরুজ্জীবন লাভ করেছিলো :
What was the mysterioys charm with which the Germans infused new vitality into dying Europe?…It was not their specific national qualities that rejuvenated Europe, however, but simply—their barbarism, their gentile constitution. Their personal efficiency and bravery, their love of liberty, and their democratic instinct which regarded all public affairs as its own affairs, in short all those properties which the Romans had lost and which were alone capable of forming new states and raising new nationalities out of the muck of the Roman world—what were they but characteristic marks of the barbarians in the upper stage, fruits of the gentile constitution?……All that was vital and life-bringing in what the Germans infused into the Roman world was barbarism.
