অর্থাৎ, এই সব ছোটো ছোটো ও অত্যান্ত প্রাচীন ভারতীয় গ্রাম-সমবায়,–যার মধ্যে কিছু কিছু এখনো টিকে রয়েছে,–এগুলির ভিত্তিতে ছিলো জমিতে যৌথ স্বত্ব, কৃষির সঙ্গে কারিগরির মিশ্রণ এবং অপরিবর্তনীয় শ্রমবিভাগ, যা কিনা যখনই একটা নতুন যৌথ-সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে তখনই তার সামনে তৈরী আর বাঁধাধরা পরিকল্পনা হিসেবে থেকে গিয়েছে। ১০০ থেকে কয়েক হাজার একর জমি জুড়ে (নানা আকারের এই যৌথ-সম্প্রদায়গুলি), এক একটি নিটোল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ (সমবায় হিসেবে) নিজের যাবতীয় প্রয়োজন উৎপাদন করেছে। উৎপাদিত সামগ্রীর প্রধান অংশ পুরো সম্প্রদায় দ্বারা সরাসরি ব্যবহৃত হবার জন্যে তৈরী হয়, এগুলি পণ্যের রূপ পায় না। তাই সামগ্রিকভাবে ভারতীয় সমাজে পণ্যবিনিময়ের দরুন যে শ্রমবিভাগ আছে এই যৌথ-সমবায়গুলির আভ্যন্তরীন উৎপাদন তার প্রভাব-মুক্ত। শুধুমাত্র বাড়তিটুকুই পণ্য হয়, এবং তারও একটি অংশমাত্র রাষ্ট্রের কবলভুক্ত হবার পরই পণ্য হতে পারে—এক অস্পষ্ট অতীত থেকে রাজস্ব হিসেবে এই উৎপাদিত বস্তুগুলিরই একটা অংশ রাষ্ট্রের কবলভুক্ত হয়েছে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অংশে এই যৌথ-সমবায়গুলির সংগঠন বিভিন্ন রকমের। যেখানে সবচেয়ে সরল সংগঠনের পরিচয় সেখানে জমি যৌথভাবে চাষ করা হয় এবং উৎপন্ন-বস্তু সকলের মধ্যে বণ্টন করা হয়। সেই সঙ্গেই, প্রতিটি পরিবারে সহকারী শিল্প হিসেবে সুতোকাটা এবং কাপড়-বোনার কাজ চলে। এইভাবে একই কাজে নিযুক্ত জনসাধারণের পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই মোড়ল—সে একাধারে বিচারক, পুলিশ এবং রাজস্ব আদায়কারী; খাজাঞ্চী—সে কৃষি সংক্রান্ত সবকিছুর হিসেব রাখে; আর একজন কমর্চারী—সে অপরাধীদের শাস্তি দেয়, আগন্তুক পথিকদের নিরাপদে পরের গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসে; সীমানাদার—সে আশপাশের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য রাখবার জন্যে নিজেদের সম্প্রদায়টির সীমানা পরিদর্শন করে; জলপরিদর্শক—সে কৃষির জন্যে বারোয়ারী পুকুর থেকে জল সরবরাহের তদারক করে; ব্রাহ্মণ—সে ধর্মকর্ম পরিচালনা করে; পাঠশালার পণ্ডিত—সে বালির উপরে ছেলেদের লেখাপড়া শেখায়; পুঁজিদার-ব্রাহ্মণ বা গণৎকার—সে বীজ বোনবার, ফসল কাটবার ও অন্যান্য সব-রকম কৃষিকর্মের পক্ষে শুভাশুভ সময়ের নির্দেশ দেয়; একজন কামার ও একজন ছুতোর—তারা চাষবাসের সমস্ত যন্ত্রপাতি তৈরী ও মেরামত করে; কুমোর—সে গ্রামের জন্য সমস্ত হাঁড়িকুঁড়ি বানায়; নাপিত; ধোপা—সে কাপড় ধুয়ে দেয়; স্যাকরা; কোনো কোনো ক্ষেত্রে কবি—কোথাও বা সে স্যাকরার দবদলে আবার কোথাও বা পাঠশালার পণ্ডিতের বদলে থাকে। এই জনা বারো মানুষ পুরো যৌথ-সমবায়টির খরচে প্রতিপালিত হয়। জনসংখ্যা বেড়ে গেলে খালি জমিতে পুরোনো পরিকল্পনা অনুসারে নতুন একটি যৌথ-সমবায় প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই একরকম শ্রমবিভাগ দেখা যায়, কিন্তু এখানে কারখানা-শিল্পের (manufacture) মতো শ্রমবিভাগ অসম্ভব; কেননা, (এখানে—যৌথ-সমবায়গুলিতে) কামার বা ছুতোরের বাজার অপরিবর্তনীয় থেকেছে, বড়ো জোর কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রামগুলির আয়তনের উপর নির্ভর করে একের বদলে দুই বা তিনজন করে এ-রকম কামার বা ছুতোর থাকে। যৌথ-সমবায়ের মধ্যে যে-নিয়ম অনুসারে শ্রমবিভাগ নিয়ন্ত্রিত হয় তা প্রাকৃতিক নিয়মের মতোই অমোঘ; অপরপক্ষে কামার বা ছুতোর ধরনের প্রতিটি কারিগরই নিজের কারখানায় চিরাচরিত পদ্ধতিতে উক্ত কাজের পক্ষে প্রয়োজনীয় পুরো ক্রিয়াটি একাই করে যায়, তাদের মাতাহ্র উপর এ-ব্যাপারে হুকুম দেবার কেউই নেই। এই স্বয়ংসম্পূর্ণ যৌথ-সমবায়গুলি—যেগুলি থেকে একই রূপে নতুন যৌথ-সমবায়ের জন্ম হয় এবং যেগুলি দৈবাৎ বিনষ্ট হলে একই জায়গায় এবং একই নাম নিয়ে যেগুলি আবার গজিয়ে ওঠে—এগুলির মধ্যের উৎপাদন-সংগঠনের সারল্যই এসিয়াটিক সমাজের অপরিবর্তনীয়তাকে বোঝবার ব্যাপারে মূলসূত্র; এসিয়ায় রাষ্ট্রের ক্রমাগত উত্থান-পতনের এবং এসিয়াটিক সাম্রাজ্যের ক্রমাগত ধ্বংস ও পত্তনের পাশাপাশি গ্রামগুলির ওই অপরিবর্তনীয়তা অত্যন্ত প্রকট ভাবেই চোখে পড়ে। রাজনৈতিক আকাশের ঝোড়ো মেঘ সত্ত্বেও সমাজের মূল অর্থনৈতিক উপাদানগুলির কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে।
মার্ক্স্-বর্ণিত এই কৃষিমূলক গ্রামসমবায়গুলি সমাজ-ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে ঠিক কোন পর্যায়ে পড়ে তা নিয়ে গবেষণা করবার প্রয়োজন আছে। কেউ কেউ মনে করেন(২২০), এখানে মার্ক্স্ ট্রাইব্যাল-পর্যায়ের গ্রামগুলিরই বর্ণনা দিচ্ছেন। এবং সে-কথা মনে করবার কারণও আছে। কেননা, এই বর্ণনার কিছু আগে মার্ক্স্ বলছেন(২২১):
Co-operation, such as we find it at the dawn of human development, among races who live by the chase, or, say, in the agriculture of Indian communities, is based, on the one hand, on ownership in common of the means of production, and on the other hand, on the fact, that in those cases, each individual has no more torn himself off from the navel-string of his tribe or community, than each bee has freed itself from connection with the hive.
অর্থাৎ, মানব-উন্নতির শুরুর দিকে শিকারজীবী জাতিগুলির মধ্যে, বা, ধরা যাক, ভারতীয় গ্রামসমবায়গুলির কৃষিকর্মের ক্ষেত্রে, যে-সমবায় দেখা যায় তার ভিত্তিতে একদিকে হলো উৎপাদনের উপায়গুলির উপর যৌথ স্বত্ব এবং অপরদিকে হলো, এ-সমস্ত ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি ব্যক্তিই পুরো ট্রাইবের সঙ্গে নাড়ির সম্পর্কে সংযুক্ত, যেমন কিনা প্রত্যেকটি মৌমাছিই মৌচাকের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
মার্কস-এর এই উক্তিটি থেকেই বুঝতে পারা যায় তাঁর মতে ভারতীয় গ্রাম-সমবায়গুলির মধ্যে ট্রাইব্যাল-সমাজের চিহ্ন কতো স্পষ্ট। কিন্তু তাই বলে, এগুলিকে শুধুমাত্র বা পুরোপুরি ট্রাইব্যাল মনে করলেও ভুল করা হবে। কেননা, মার্কস ও এঙ্গেলস ট্রাইব্যাল সমাজে যে সরল, সহজ জীবনীশক্তির পরিচয় দেখছেন এই গ্রাম-সমবায়গুলির মধ্যে তার একান্ত অভাব। আমরা বলতে চাইছি, ট্রাইব্যাল-সমাজের অসম্পূর্ণ বিলোপের পরিণাম হিসেবেই যেহেতু এই গ্রাম-সমবায়গুলি গড়ে উঠেছিলো সেইহেতু একদিকে যেমন এই গ্রাম-সমবায়ের মধ্যে ট্রাইব্যাল-সমাজের স্পষ্ট ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে অপরদিকে আবার দেখা যায় সেই ধ্বংসাবশেষগুলির ভিতর ট্রাইব্যাল-সমাজের প্রকৃত সঞ্জীবনীশক্তি মরে গিয়েছে—চিহ্নগুলির মূল তাৎপর্য পরিণত হয়েছে তার বিপরীতে। এই তফাতটা বোঝবার জন্যে প্রথমে দেখা যাক, মার্কস-এঙ্গেলস-এর মতে ট্রাইব্যাল সমাজের সহজ, সরল প্রাণশক্তির পরিচয়টা কী রকম; তারপর দেখা যাবে তাঁদেরই মতে ভারতীয় গ্রাম-সমবায়গুলির মধ্যে সেই প্রাণশক্তির পরিচয় আছে কি না।
ট্রাইব্যাল-সমাজ প্রসঙ্গে এঙ্গেলস(২২২) বলছেন:
And this gentile constitution is wonderful in all its childlike simplicity! Everything runs smoothly without soldiers, gendarmes or police; without nobles, kings, governors, prefects or judges; without prisons; without trials……There can be no poor and needy—the communistic household and the gens know their obligations toward the aged, the sick, and those disabled in war. All are free and equal–including women. …… And the kind of men and women that are produced by such a society is indicated by the admiration felt by all white men who came into contact with the uncorrupted Indians (আমেরিকার আদিবাসী), admiration of the personal dignity, straightforwardness, strength of character and bravery of these barbarians.
We have witnessed quite recently examples of this bravery in Africa. The Zulus a few years ago and the Nubians a few months ago—both of them tribes in which gentile institutions have not yet died out—did what no European army can do. ……This is what mankind and human society were, before class divisions arose. And if we compare their condition with that of the overwhelming majority of civilized people today, we will find an enormous gulf between the present-day proletarian and small peasant and the ancient free member of a gens.
This is one side of the picture. Let us not forget, however, that this organization was doomed to extinction. ……The power of these primordial communities had to be broken, and it was broken. But it was broken by influences which from the outset appear to us degradation, a fall from the simple moral grandeur of the ancient gentle society. The lowest interest—base greed, brutal, sensuality, sordid avarice, selfish plunder of common possessions—usher in the new, civilized society, class society; the most outrageous menas—theft, rape, deceit and treachery—undermine and topple the old, classless gentle society. And, the new society, during all the 2,500 years of its existence, has never been anything but the development of the small minority at the expense of the exploited and oppressed great majority; and it is so today more than ever before.Page 89 of 238
