কিন্তু এ-হলো উৎপাদন কৌশলে উন্নতি দেখা দেবার দরুন স্বাভাবিক ও সাধারণভাবে ট্রাইব্যাল সমাজ ভিতর থেকে ভেঙে যাবার কথা। তার বদলে, রাষ্ট্রশক্তি যদি বাইরের থেকে আক্রমণ চালিয়ে ট্রাইব্যাল সমাজকে ভেঙে দেয় এবং সে-সমাজের মানুষগুলিকে নিয়ে খণ্ড বিক্ষিপ্ত গ্রামনিবেশ করে তাহলে নিশ্চয়ই ওই গ্রামগুলির মধ্যে গণসমাজের চিহ্ন অনেক বেশি টিকে থাকবে কথা। কিন্তু ট্রাইব্যাল সমাজের প্রাণ বলতে ছিলো গণ-বন্ধন বা group-bond, মার্ক্স্-এর ভাষায় community of interest। গণবন্ধন দ্বারা লালিত বলেই ট্রাইব্যাল-সমাজের ওই চিহ্নগুলি ট্রাইব্যাল-সমাজের বুকে প্রাণবন্ত ও এমনকি উদ্দেশ্যমূলক : এগুলি মানুষকে বাঁচতে সাহায্য করেছে। ফলে, ওই গণবন্ধন ভেঙে যাবার পরও ট্রাইব্যাল মানুষদেরই নিয়ে গড়া বিক্ষিপ্ত গ্রামগুলির মধ্যে ট্রাইব্যাল সমাজের চিহ্নাবলী নিজেদের বিপরীতে পর্যবসিত হতে বাধ্য : যা ছিলো উদ্দেশ্যমূলক তাই হয়ে দাঁড়ালো উদ্দেশ্য-বিরোধী, যা-ছিলো জীবনের জীবনের সহায় তাই হয়ে দাঁড়ালো জীবনের প্রতিবন্ধ।
আমাদের দেশে উৎপাদন কৌশলের উন্নতির উপর নির্ভর করে যদি ট্রাইব্যাল সমাজ ভিতর থেকে ভেঙে নতুন সমাজের পথ করে দিতো তাহলে হয়তো আমাদের দেশের সমাজ-ইতিহাসও ইয়োরোপীয় সমাজ-ইতিহাসের অনুরূপ হতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। আমাদের দেশে স্থানে-স্থানে রাষ্ট্রশক্তি দেখা দিয়েছে, কিন্তু তখনো তাকে ঘিরে রয়েছে পুরোনো ট্রাইব্যাল সমাজ। এই ট্রাইব্যাল সমাজগুলির উপর আক্রমণ চালিয়ে রাষ্ট্রশক্তির অধিনায়কেরা এগুলিকে ধ্বংস করবার চেষ্টা করছেন এবং এই সমাজের মানুষগুলিকে নিয়ে গ্রাম-নিবেশ করবার চেষ্টা করেছেন। স্বভাবতই ওই গ্রামগুলির মধ্যে ট্রাইব্যাল সমাজের চিহ্ন অনেক স্পষ্টভাবে টিকে থেকেছে,–উৎপাদন কৌশলের স্বাভাবিক উন্নতি হলে এই চিহ্নগুলিও হয় তো স্বাভাবিকভাবে মিলিয়ে যেতো। কিন্তু তা যায়নি। কেননা, উৎপাদন কৌশলের স্বাভাবিক উন্নতি এ-দেশে ঘটেনি। ফলে, গ্রামগুলি অনেকাংশেই ট্রাইব্যাল গ্রামের মতোই হয়ে রইলো; কেবল গণবন্ধন থেকে ছিন্ন হলো বলেই এই গ্রাম্য-জীবনে ট্রাইব্যাল সমাজের চিহ্নগুলি পর্যবসিত হলো নিজেদের বিপরীতে।
ট্রাইব্যাল সমাজের অসম্পূর্ণ বিলোপ বলতে আমরা মোটের উপর এই কথাটিই বোঝাতে চেয়েছি। এবং আমাদের ধারণায় ভারতীয় সংস্কৃতির নানান বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করবার ব্যাপারে এই হাইপথেসিস্ বা প্রকল্প থেকেই সাহায্য পাবার সম্ভাবনা আছে। ধ্যানধারণার আলোচনায় পরে আসা যাবে; তার আগে দেখা যাক ভারতীয় সমাজব্যবস্থার কয়েকটি মূল বৈশিষ্ট্যকে বোঝবার চেষ্টায় আমাদের এই প্রকল্পটি কী ভাবে কাজে লাগতে পারে।
——————————–
১৮০. অর্থশাস্ত্র (রাধাগোবিন্দ বসাক) ২:২১০।
১৮১. Epigraphia Indica 1:243; 18:304.
১৮২. অর্থশাস্ত্র (রাধাগোবিন্দ বসাক) ২:২০৯।
১৮৩. ঐ ২:২১০।
১৮৪. W. W. Hunter IGI 4:165.
১৮৫. অবশ্যই ব্যবসাদার, ধর্মপ্রচারক, আড়কাঠি প্রভৃতির কৃপায় বর্তমান ভারতের ট্রাইব্যাল সংগঠনগুলির মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রি অনেক কৃত্রিমতা প্রবেশ করেছে।
১৮৬. W. W. Hunter op.cit. 4:171.
১৮৭. Ibid 4:174.
১৮৮. Ibid 4:183.
১৮৯. Ibid 4:172.
১৯০. Ibid 4:179.
১৯১. R. C. Dutta PB 11.
১৯২. F. Engels OFPPS 268.
১৯. গ্রাম-সমবায় : গণ-সমাজের অসমাপ্ত বিলোপ
ভারতীয় সমাজের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছোটো ছোটো গ্রাম-সমবায় (village-communities) এবং জাতিভেদ-প্রথা (caste-system)—এই দু’-এর উল্লেখ করতে হয়। আমরা বলতে চাইছি, উভয় বৈশিষ্ট্যকেই ট্রাইব্যাল সমাজের অসম্পূর্ণ বিলোপ বলে বোঝবার চেষ্টা করা যেতে পারে।
বৃটিশ আমলের প্রথম যুগের সেটল্মেণ্ট ও রেভিনিউ বিভাগের দলিল-পত্রগুলি বিশ্লেষণ করে মার্ক্ উইল্ক্স্,(১৯৩) জর্জ ক্যামবেল(১৯৪) এবং হেনরি মেইন(১৯৫) সিদ্ধান্ত করেন, ভারতবর্ষের গ্রামাঞ্চলের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো জমিতে যৌথ স্বত্ব অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পত্তির অভাব। তাছাড়া, ভারতবর্ষের মতো কৃষিপ্রধান দেশে আইনের বইগুলিতে জমির স্বত্বাধিকার-সংক্রান্ত আইন-কানুন চোখে পড়ে না(১৯৬)—এ-থেকেও অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে, আমাদের দেশে জমির উপর ব্যক্তিবিশেষের স্বত্বাধিকার তেমনভাবে ফুটে ওঠেনি। তাই হেগেল(১৯৭) এবং মার্কস(১৯৮) সিদ্ধান্ত করেছেন যে, আমাদের দেশের সাবেকী গ্রামগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার অভাব। জমির উপর যৌথ স্বত্ব বলে এই লক্ষণটি ট্রাইব্যাল সমাজেরই চিহ্ন। ইরোকোয়া-ট্রাইবের মানুষেরা বলে, জল আর বাতাসের মতোই জমি কেনা-বেচা করবার প্রশ্ন ওঠে না(১৯৯)।
বেডেন-পাওএল(২০০) যদিও মেইন প্রমুখের উক্ত সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণভাবে খণ্ডন করবার,–বা শুধরে নেবার—চেষ্টা করেছেন, তবুও এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, ভারতবর্ষের অন্তত কয়েকটি বিস্তৃত অংশের বেলায় তাঁদের ওই সিদ্ধান্ত তথ্য-নির্ভর এবং অবশ্য-স্বীকার্য। এবং সাধারণ নিয়ম হিসেবে বেডেন-পাওএল(২০১) যখন দাবি করেন যে, ঐতিহাসিকভাবে জমিতে যৌথ স্বত্বের চেয়ে প্রাচীনতর ব্যবস্থা হলো ব্যক্তিগত স্বত্ব,–তখন তাঁর দাবিটি যে ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন, সে-বিষয়ে কোনো রকম প্রশ্নের অবকাশ থাকে না। অপর পক্ষে, মেইন প্রমুখের সিদ্ধান্তের পক্ষে অনেক জোরালো যুক্তি রয়েছে। মার্ক উইক্ল্স্(২০২) যে-রকম বলছেন, সপ্তদশ শতাব্দীতে যে-সব ইয়োরোপীয় পরিব্রাজকেরা আওরংজেব-এর দরবার পরিদর্শন করেছিলেন তাঁরা এক বাক্যেই স্বীকার করেছেন যে, ভারতবর্ষে তখনো জমিত উপর ব্যক্তিগত মালিকানা ছিলো না। অবশ্যই, প্রাচীন গ্রীক বর্ণনাদাতাদের(২০৩) বক্তব্য কিছুটা অন্যরকম। কিন্তু মার্ক উইক্ল্স্(২০৪) দেখাচ্ছেন যে, এ-বিষয়ে তাঁদের মন্তব্য খুব বেশি মূল্যবান হতে পারে না। কেননা, তথ্য সঞ্চয়ের জন্যে প্রায়ই তাঁরা নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছিলেন একের পর এক তিন তিনজন দোভাষীর ব্যাখ্যার উপর, এবং এই তিনজনের মধ্যে একজনের কথাও গ্রীক বর্ণনাদাতারা বুঝতে পারতেন না। হয়তো সেই কারণেই, কীথ এবং ম্যাকডোন্যাল্ড(২০৫) আক্ষেপ করেছেন, এ-বিষয়ে গ্রীক বর্ণনাদাতাদের মধ্যে কারুর সঙ্গে কারুর মতের মিল নেই।
