অবশ্যই, শিলালিপি প্রভৃতিতে ভূসম্পত্তি-দানের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং এই নজির দেখিয়ে কেউ কেউ(২০৬) অনুমান করেছেন যে, তাহলে নিশ্চয়ই জমি ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিলো। কিন্তু এই জাতীয় দলিলগুলিতে ভূসম্পত্তি বলতে ইয়োরোপীয় সামন্ততান্ত্রিক অর্থে ভূসম্পত্তি নাও বোঝাতে পারে—এমন হওয়া অসম্ভব নয় যে, দান বলতে এখানে গ্রামাঞ্চল থেকে রাজার প্রাপ্য রাজস্বটুকুকেই উল্লেখ করা হয়েছে(২০৭)। তাছাড়া, এই দলিলগুলি থেকেই দেখা যায় দানের আগে দাতার পক্ষে গ্রামবাসীদের সম্মিলিত সম্মতি নেবার দরকার পড়তো(২০৮)। গ্রামের জমির উপর গ্রামবাসীদের যদি যৌথ অধিকার না থাকে তাহলে এইভাবে তাদের কাছ থেকে যৌথ সম্মতি নেবার প্রয়োজন হবে কেন?
কোনো কোনো ইংরেজ পণ্ডিত প্রমাণ করতে চেয়েছেন, সাবেককালের ভারতবর্ষে জমির উপর কৃষকদের মালিকানা যে ছিলো না তা আসল কারণ হচ্ছে জমির প্রকৃত মালিক বলতে ছিলো রাজা বা সামন্ততান্ত্রিক প্রভুর দল। যেমন, ভিন্সেণ্ট স্মিথ(২০৯) লিখছেন, ভারতবর্ষের নেটিভ আইন অনুসারে চাষ-জমিকে বরাবরই রাজসম্পত্তি বলে দেখা হয়েছে। ইংরেজ-শাসনের তরফ থেকে ইতিহাসের নামে এ-রকম একটা মিথ্যে কথা প্রচার করবার প্রয়োজন ছিল; কেননা, ইংরেজ-শাসনের খুঁটি হিসেবে ওরাই এ-দেশে জমির মালিক নাম দিয়ে জমিদার-শ্রেণী হিসেবে যে নতুন এক-শ্রেণীর মানুষ সৃষ্টি করেছিলো এই জাতীয় ভুয়ো ইতিহাস তার কলঙ্ক কিছুটা পরিমাণে ঢাকা দিতে পারতো(২১০)। অধ্যাপক জয়সওয়াল(২১১) তাই স্মিথ সাহেবকে বিদ্রূপ করে বলছেন, এবং ঠিকই বলছেন, ‘ভারতবর্ষের সত্যিকারের প্রামাণ্য আইনকর্তা-প্রবর্তিত নেটিভ আইন বলতে ঠিক এর বিপরীত। এ-রকম আইন অন্য কোনো দেশের নেটিভ আইন হতে পারে, কিন্তু ভারতবর্ষের নেটিভ আইন নিশ্চয়ই নয়’।
জৈমিনী, নীলকণ্ঠ, মাধব,কাত্যায়ন। মিত্রমিশ্র প্রভৃতির রচনা থেকে বিস্তৃত উদ্ধৃতির উপর নির্ভর করে অধ্যাপক জয়সওয়াল দেখাচ্ছেন(২১২) সাবেককালের ভারতবর্ষে জমির মালিক বলতে রাজা বা সামন্ত প্রভু হতেই পারে না। তিনি আরো বলছেন, জাতকের গল্পগুলি থেকে যে-ঐতিহাসিক তথ্য উদ্ধার করা যায় তাও ভিন্সেণ্ট স্মিথের সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বিপরীত(২১৩)। কিন্তু ভারতবর্ষে জমির উপর রাজার মালিকানা ছিলো না—এ-কথা তথ্যবলে প্রমাণ করলেও অধ্যাপক জয়সওয়াল দেখাতে চাইছেন, জমির উপর কৃষকদের ব্যক্তিগত মালিকানা ছিলো(২০১৪)। তাঁর নিজের সিদ্ধান্তের দুর্বলতা ঠিক এইখানেই এবং এ-দুর্বলতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে যখন তিনি ভিন্সেণ্ট স্মিথের বিরুদ্ধে তর্ক করে বলেন, এ-হেন জনপ্রিয় একটি পাঠ্যপুস্তকে এ-বিষয়ে অমন ভ্রান্ত একটা সংস্কারগ্রস্ত মতবাদ প্রচারিত হওয়াটা খুবই ক্ষোবের ব্যাপার,–বিশেষ করে ক্ষোভের ব্যাপার এই কারণে যে, লেখক এ-বিষয়ে অত্যন্ত যোগ্য আলোচনাকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করেই নিজের মতবাদ পেশ করতে চাইছেন(২১৫)। বিশেষ যোগ্য আলোচনা বলতে অধ্যাপক জয়সওয়াল একটি বই-এরই উল্লেখ করছেন—১৮৬৯-এ প্রকাশিত মার্কস উইল্ক্স্-এর লেখা মাইসোর-ইতিহাস(২১৬)। আমরা ইতিপূর্বেই উক্ত গ্রন্থের উল্লেখ করেছি এবং বলেছি, প্রধানত এই গ্রন্থের ভিত্তিতেই হেগেল, মার্ক্স্ প্রমুখ মনীষীরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, সাবেককালের ভারতবর্ষের জমির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা দেখা দেয়নি—জমি ছিলো গ্রামবাসীদের যৌথ সম্পত্তি। তাই অধ্যাপক জয়সওয়াল যদি সত্যিই মনে করেন, ভিন্সেণ্ট স্মিথের পক্ষে এই গ্রন্থটিকে অগ্রাহ্য করে জমির উপর রাজত্ব-স্বত্ব প্রমাণ করবার চেষ্টাটা খুবই গর্হিত কাজ হয়েছে, তাহলে অধ্যাপক জয়সওয়ালের নিজের পক্ষে উক্ত গ্রন্থকেই অগ্রাহ্য করে জমির উপর ব্যক্তিগত মালিকানার কথা প্রচার করা কী করে সঙ্গত হতে পারে?
অবশ্যই, এ-কথার কোনো সন্দেহ নেই যে, সাবেকী ভারতবর্ষে জমির মালিকানা সংক্রান্ত সমস্যা আজো অনেকাংশেই অমীমাংসিত। এ-বিষয়ে মৌলিক গবেষণার প্রয়োজন আছে। তাছাড়া, ভারতবর্ষ সত্যিই এতোটুকু জায়গা নয়—প্রায় ইয়োরোপের মতো বড়ো একটি মহাদেশ-বিশেষ। তাই এদেশে ভূমিব্যবস্থা যে সর্বত্র একই রকমের ছিলো তাও মনে করা ঠিক হবে না। তবুও পূর্বগামীদের গবেষণার উপর নির্ভর করে অন্তত এটুকু অনুমান করা বোধ হয় অসঙ্গত নয় যে, ভারতবর্ষের কয়েকটি বিস্তৃত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যই ছিলো স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃষিমূলক গ্রামসমবায় এবং এই সব গ্রামে জমি ছিলো গ্রামবাসীদের যৌথ সম্পত্তি। বেডেন্-পাওএল্ যদি সত্যিই প্রমাণ করে থাকেন যে, অন্যান্য অঞ্চলে জমির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা দেখা দিয়েছিলো তাহলেও নিশ্চয়ই এ-কথা প্রমাণিত হয় না যে, উইল্ক্স্, মেইন্ প্রমুখেরা অন্যান্য অঞ্চল সম্বন্ধে যে-বিপরীত সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন তা খণ্ডিত হয়ে যায়(২১৭)।
জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার অভাব ও স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামগুলিতে যৌথ-জীবনের কথা আমরা এখানে বিশেষ করে উল্লেখ করতে চাইছি আমাদের মূল প্রকল্পটির পক্ষে নজির দেখাবার আশায়। প্রকল্পটি হলো, এদেশে ট্রাইব্যাল-সমাজের বিলোপ পরিপূর্ণ হয়নি—জমিতে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অভাব ও গ্রামগুলিতে যৌথ-জীবনের স্বাক্ষর ওই ট্রাইব্যাল-সমাজেরই ভগ্নাবশেষ। কিনতি সেই সঙ্গেই আমরা বলতে চাইছি, রাষ্ট্রশক্তি যদি বাইরের থেকে ট্রাইব্যাল-সমাজকে আক্রমণ করে, সে-সমাজ ভেঙে এবং সেই সমাজেরই মানুষগুলিকে নিয়ে ছোটো ছোটো গ্রাম-নিবেশ করে থাকে তাহলে এই গ্রাম-গুলিতে যে-রক্ম ট্রাইব্যাল-সমাজের বহু চিহ্ন টিকে থাকবার কথা সেইরকমই ট্রাইব্যাল-সমাজের মূল সঞ্জীবনী-শক্তি থেকে উৎপাটিত হয়ে বিরুদ্ধ-পরিবেশে গ্রথিত হবার ফলে এই চিহ্নগুলির আদি-তাৎপর্য তার বিপরীতে পর্যবসিত হতে বাধ্য। ট্রাইব্যাল-সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে যে-যৌথজীবন ছিলো বাঁচবার সহায়, রাষ্ট্রশাসন ও রাষ্ট্রশোষণের অন্তর্ভূক্ত ওই স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামগুলির বৈশিষ্ট্য হবার পর সেই যৌথ-জীবনের ধ্বংসাবশেষই মানুষের জীবনের পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ালো।
