অবশ্যই, বাংলা দেশে যা ঘটেছে পুরো ভারতবর্ষ জুড়েও যে তাই ঘটেছে এ-কথা মনে করবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু পুরো ভারতবর্ষের জনসংখ্যার যে-বিশ্লেষণ আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি তা থেকেও মোটের উপর একই ধরণের কথা অনুমান করবার সুযোগ থাকে না কি?
ভারতীয় সংস্কৃতির দিক থেকে ভারতীয় জনসংখ্যার এই বিশ্লেষণটির তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে বাধ্য। কিন্তু, দুঃখের বিষয়, সেই তাৎপর্যের প্রতি সব সময় আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় না।
শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্তের রচনা থেকে উদ্ধৃত ওই অংশের শেষ-পংক্তিটির দিকেই নজর রাখা যাক। তিনি বলছেন, আদিবাসীদের যে-বিরাট দলটি আর্যদের শাসনে এলো তারা আগের মতো কৃষক হয়েই রইলো। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে মানতেই হবে তাদের উৎপাদন-কৌশলে কোনো মৌলিক পরবর্তন দেখা যায়নি। অথচ, অপরপক্ষে, তাদের ওই ট্রাইব্যাল-সংগঠন নিশ্চয়ই আর আগেকার মতো রইলো না—বাংলাদেশে কৃষকদের গ্রামগুলি ট্রাইব্যাল-সমাজ নয়। কিন্তু ট্রাইব্যাল সমাজ না থাকলেও এই গ্রাম-জীবন থেকে ট্রাইব্যাল-সমাজের সমস্ত চিহ্নই নিঃশেষে বিলুপ্ত হতে পারেনি। কেননা, উৎপাদন কৌশলে কোনো মৌলিক পরিবর্তন দেখা দেয়নি। ট্রাইব্যাল সমাজ ভেঙে সে-সমাজের মানুষগুলিকে নিয়ে পুরোনো উৎপাদন-কৌশলের ভিত্তিতেই যদি ছোটো ছোটো আর নতুন গ্রাম-নিবেশ হয়ে তাহলে এই গ্রামগুলির মধ্যে থেকে ট্রাইব্যাল সমাজের সমস্ত চিহ্ন নিঃশেষে মুছে যাবার কথা নয়। সেই সঙ্গেই মনে রাখা দরকার, ট্রাইব্যাল সমাজের একটি প্রধান লক্ষণ এই গ্রামগুলির মধ্যে অনিবার্যভাবেই অনুপস্থিত। ফলে, ট্রাইব্যাল সমাজের যে-চিহ্নগুলি এই গ্রাম-সমাজে টিকে রইলো সেগুলি আর আর ওই মূল লক্ষণটি দ্বারা লালিত হতে পায়নি। অতএব, সেগুলির আমূল রূপান্তর ঘটতে বাধ্য। ট্রাইব্যাল সমাজের স্বাভাবিক পরিবেশে এই চিহ্নগুলির যে-তাৎপর্য ছিলো ট্রাইব্যাল সমাজ থেকে উৎপাদিত হয়ে চিহ্নগুলি যখন ওই খণ্ড কৃষিনিবেশের মধ্যে এসে পড়লো তখন আর সে-তাৎপর্য বেঁচে থাকবার কথা নয়।
প্রথমে দেখা যাক, ট্রাইব্যাল সমাজ ভেঙে যাবার সাধারণ ও স্বাভাবিক কারণটি কী? মার্কস ও এঙ্গেলস দেখাচ্ছেন, এর কারণ হলো মানুষের উৎপাদন-কৌশলের উন্নতি। পশুপালন বা কৃষিকাজ ভালো করে শেখবার পরই মানুষের সমাজে উদ্বৃত্তজীবী শ্রেণীর আবির্ভাব হওয়া সম্ভব—এই অবস্থায় পৌঁছবার পর তাই মানব-সমাজ শ্রমজীবী ও উদ্বৃত্তজীবী শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে, প্রাগ্-বিভক্ত ট্রাইব্যাল সমাজ ভেঙে দেখা দেয় নতুন শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। কিন্তু এই রকম স্বাভাবিক ও সাধারণভাবে ট্রাইব্যাল সমাজ ভেঙে যাবার পরও নতুন শ্রেণীবিভক্ত সমাজ থেকে সঙ্গে সঙ্গে ট্রাইব্যাল-সমাজের সমস্ত লক্ষণ একেবারে নিঃশেষে মুছে যায় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, রোমানদের মধ্যে ট্রাইব্যাল সমাজ ভেঙে রাষ্ট্রের আবির্ভাব হবার পরও ওই ট্রাইব্যাল-সংগঠনের নানা চিহ্ন টিকে থেকেছিলো। কিন্তু এই চিহ্নগুলির আদি-তাৎপর্য তখন বিলুপ্ত হয়েছে; কিংবা এঙ্গেল্স্(১৯২) যেমন বলছেন, চিহ্নগুলির আদিতাৎপর্য পর্যবসিত হয়েছে তার বিপরীতে :
In this manner the organs of the gentile constitution were gradually torn away from their roots in the people, in gens, phartry and tribe, and the whole gentile order was transformed into its opposite : from an organization of tribes for the free administration of their own affaires it became an organization for plundering and oppressing their own neighbors; and correspondingly, its organs were transformed from instruments of the will of the people. This could not have happened had not the greed for wealth divided the members of the gents into rich and poor; had not “property difference in a gens changed the community of interest into antagonism between members of a gens” (Marx); and had not the growth of slavery already begun to brand working for or living as slavish and more ignominious then engaging then engaging in plunder.
অর্থাৎ, এইভাবে জ্ঞাতিভিত্তিক সংগঠনের অঙ্গগুলি ক্রমেক্রমে জনসাধারণের মধ্যে—গেন্, ফ্রাত্রি ও ট্রাইবের মধ্যে,–তাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হলো এবং জ্ঞাতিভিত্তিক পুরো ব্যবস্থাটি পরিণত হলো নিজের বিপরীতে : স্বাধীনভাবে নিজেদের কাজ পরিচালনা করবার জন্যে ট্রাইবদের একটি সংগঠন থেকে এটা হয়ে দাঁড়ালো নিজেদের প্রতিবেশীদের উপর উৎপীড়ন ও লুঠতরাজ চালাবার একটি সংগঠন; এবং তারই অনুপাতে এই ট্রাইব্যাল সংগঠনের বিভিন্ন অঙ্গ জনসাধারণের ইচ্ছার যন্ত্র থেকে বদলে হয়ে দাঁড়ালো নিজেদের দলের মানুষগুলিকেই শাসন ও পীড়ন করবার যন্ত্র বিশেষ। যদি না ধনসম্পত্তির প্রতি লোভ গেন্-এর সম্পত্তির তারতম্য একই উদ্দেশ্যমূলক একটি সমবায়কে বদলে গেন্-এর সভ্যদের মধ্যে বিভেদ-বিরোধীতার পরিণত করতো” (মার্ক্স্), যদি না ইতিমধ্যেই যে-দাসপ্রথার জন্ম হয়েছে সেই-দাস্প্রথার দরুন খেটে খাওয়াকে দাসবৃত্তি এবং লুঠতরাজের তুলনায় ঘৃণাকর বলে সাব্যস্ত করা হতো—তাহলে এ-রকম ঘটনা ঘটতেই পারতো না।
কিন্তু পরে, স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে, আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো, বৈদিক মানুষদের মধ্যে গণ-সমাজ ভেঙে যাবার পরেও সে-সমাজের যে-চিহ্নগুলি টিকে থেকেছিলো সেগুলি সম্বন্ধে এঙ্গেল্স্-এর এই মন্তব্য কতো স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য।
