সিদ্ধিদাতা গণেশের বেলাতেও এই জাতীয় সূত্র থেকে গিয়েছে এবং দক্ষ ঐতিহাসিকদের পক্ষে সেই সূত্র অনুসরণ করে সেকালের ভারতবর্ষের আর একটি বিখ্যাত রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব-কাহিনী উদ্ধার করা বোধ হয় অসম্ভব নয়। ওই সূত্রগুলি ঠিক কী? এই প্রশ্নের জবাব দেবার আগে প্রাচীন মিশরের রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব-কাহিনী নিয়ে মরেট ও ডেভি(১৬৭) যে-সার্থক গবেষণা করেছেন তার কিছুটা উল্লেখ করবো। কেননা, আমাদের ধারণায় উক্ত বিদ্বানেরা যে-ভাবে অগ্রসর হয়েছেন গুপ্ত-রাষ্ট্রের আবির্ভাব প্রসঙ্গেও সেই পথে অগ্রসর হবার অবকাশ আছে।
মিশরের ইতিহাসে যিনি প্রথম একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসলেন তাঁর নাম মেনেস। কিন্তু মেনেস-এর পক্ষে এই একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসবার যে-বর্ণনা পাওয়া যার তা ভারি অদ্ভুত ধরনের। বর্ণনাটি হলো : বাজপাখি গিলে খেলো বাকি সব জানোয়ার। মরেট ও ডেভির গবেষণা থেকে বোঝা যায়, এই বর্ণনাটি মেনেস-এর পক্ষে একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসবার পক্ষে কেন সত্যিই এক নিখুঁত বর্ণনা। সূত্রটি হলো, মেনেস ছিলেন বাজপাখি-দলের প্রধান। বাজপাখি মানে তাই মেনেস-এর দলের টোটেম-চিহ্ন। কিন্তু এই দলের নেতার পক্ষে অনেক বড়ো এলাকা জুড়ে রাষ্ট্রশক্তির অধিনায়ক হতে হলে অবশ্য অন্যান্য দলগুলিকে পরাস্ত করা প্রয়োজন। মেনেস-এর দলের পরিচয় যে-রকম বাজপাখি তেমনি অন্যান্য দলের পরিচয়ও অন্যান্য জানোয়ার থেকেই। এখন, মরেট আর ডেভি দেখাচ্ছেন, মেনেস-এর পক্ষে একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসবার ঠিক আগের যুগটিতে অঙ্কিত অনেক ছবি পাওয়া যাচ্ছে—এই ছবিগুলোর বিষয়বস্তু হলো, নানান জানোয়ারের মধ্যে লড়াই চলছে এবং সেই লড়াইতে জয় হয়ে চলছে বাজপাখির। নানারকম টোটেম-দলের মধ্যে যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে বাজপাখি-টোটেমযুক্ত দলটির জয় আর কী ভাবে এঁকে বোঝানো যায়? চিত্রে মেনেস্-এর বিজয়কাহিনী সংক্রান্ত অন্যান্য যে-সব তথ্য পাওয়া যায় তাও এই টোটেম-বিশ্বাসের দিক থেকেই বুঝতে পারা সম্ভব : ফাঁসিকাঠে-ঝোলানো শত্রুদের কথা আঁকা হয়েছে কয়েকটি জানোয়ারকে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেওয়া হিসেবেই, কিংবা, বিজিত মানুষদের যেখানে শিরঃ-ছেদ আঁকা হয়েছে সেখানে যদিও মানুষদের চেহারা মানুষ হিসেবেই আঁকা তবুও তারা যে-কোন দলের মানুষ তা বোঝাবার জন্যে ছিন্নমস্ত মরদেহগুলির উপরই জন্তু-জানোয়ারের ছবি আঁকতে চিত্রকরেরা ভুলে যাননি। তাই, বাজপাখি গিলে খেলো বাকি সব জানোয়ার,–এই বর্ণনার অর্থ হলো বাজপাখি দলের কাছে পরাজয় ঘটলো অন্যান্য দলের মানুষদের(১৬৮)।
এই প্রসঙ্গেই মনে রাখতে হবে, মরেট এবং ডেভি দেখাচ্ছেন, বিজয়ী মেনেস্-এর পক্ষে রাজা হবার কাহিনীই হলো বাজপাখি-টোটেমটির পক্ষে দেবতা হোরাস হয়ে যাওয়ার কাহিনীও। অর্থাৎ, রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব ও দেবতার জন্ম স্বতন্ত্র কাহিনী নয়। টোটেম-সমাজে উপাস্য-উপাসকে তফাত নেই, দলের প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে টোটেমটির একাত্মভাব। তাই, এ-সমাজে আধুনিক অর্থে দেবতার বা আধুনিক অর্থে ধর্মভাবের কোনো অবকাশ নেই—কেননা, উপাস্য-উপাসকে তফাত না থাকলে সে-অবকাশ সম্ভব নয়। যে-দলের টোটেম হলো সূর্যমুখী ফুল সে-ফলের সবাই বলবে, আমরা হলাম সূর্যমুখী ফুল; যে-দলের টোটেম হলো সাময় হরিণ সে-দলের সবাই বলবে, আমরা হলাম সাময় হরিণ। তাই, বাজপাখি যতোদিন একটি দলের টোটেম ততদিন পর্যন্ত ওই দলের সকলের মনেই বাজপাখির সঙ্গে একাত্ম-চেতনা : তাই সবাই বাজপাখি, বাজপাখি তখনো তাদের কাছে উপাস্য-দেবতার স্বাতন্ত্র্য পায়নি। কিন্তু সেই আদিম-সাম্যসমাজ ভেঙে যখন রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হলো তখন দলের ঐশ্বর্য এলো ব্যক্তিবিশেষের কবলে—মেনেস্-এর কবলে। তেমনি অধ্যাত্ম-শক্তিও কেন্দ্রীভূত হলো একজায়গায়—বাজপাখি আর বাজপাখি রইলো না, দেবতা হয়ে গেলো, সে-দেবতার নাম হোরাস্। অবশ্যই, রাজা মেনেস ও দেবতা হোরাস্–দু’-এর মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। তাই ছবিতে দেখা যায়, রাজার ধ্বজায় আঁকা হয়েছে বাজপাখি হোরাসকে, দেখা যায় দেবতা হোরাস রাজার কাছে উপহার আনছে ক্রীতদাস। রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাবের সঙ্গে অধ্যাত্মশক্তির আবির্ভাবের এই যোগাযোগটির কথা মূল্যবান(১৬৯)।
মিশর-ইতিহাসের এই বিচিত্র ঘটনাটি থেকে আমাদের দেশের প্রাচীন-যুগের ইতিহাস সংক্রান্ত কোনো তথ্য অনুমান করবার অবকাশ আছে কি? একটি টোটেম দেবতার পক্ষে দেবতায় পরিণত হওয়ার নিশ্চয়ই আকস্মিক ঘটনা নয়, এবং তারই পাশাপাশি যদি কোনো রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হতে দেখা যায় তাহলে নিশ্চয়ই অনুমান করবার সুযোগ থাকে যে, টোটেমটির পক্ষে এই দেবত্বপ্রাপ্তি এবং ওই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব সম্পর্কহীন ঘটনা নয়—যে-ট্রাইব্যাল সমাজ ভেঙে এই রাষ্ট্রের উদয় হলো দেবত্বপ্রাপ্তির পূর্বে টোটেমটিও সেই ট্রাইব্যাল সমাজেরই পরিচায়ক ছিলো। আমাদের এই অনুমান আরো জোরালো হবে যদি দেখা যায় নবোদিত রাষ্ট্রশক্তি নবজাত ওই দেবতাটির মহাত্ম্যপ্রচারে প্রচুর উৎসাহের পরিচয় দিচ্ছে।
এই রকমই কিছুকিছু তথ্যের পরিচয় পাওয়া যায় সিদ্ধিদাতার জন্মকথা-প্রসঙ্গে।
গণেশের নরদেহের উপরে ওই রকমের একটা গজানন কেন? এ-প্রশ্ন পুরাণকারেরাও তুলেছিলেন এবং আমরা দেখেছি তাঁদের সমাধানগুলির অসংলগ্নতা ও পরস্পর-বিরোধিতা থেকেই প্রমাণ হয় যে, এগুলি উত্তরকালের কৃত্রিম রচনা। এই জাতীয় কৃত্রিম সমাধানের পরিচয় আধুনিক পণ্ডিতমহলেও দুর্লভ নয়। কেননা, ওই গজানন থেকে গণেশের উৎস সম্বন্ধে একটিমাত্র তথ্যই অবধারিতভাবে প্রমাণ হয়—প্রমাণ হয় দেবতাটির আদিরূপটা, অর্থাৎ, প্রাগ-দেবত্বপ্রাপ্তির রূপটা, ছিলো হাতি-টোটেম। হাতি-টোটেমের কথায় বিস্মিত হবার কারণ নেই। আমাদের দেশের পুরানো পুঁথিতে এ-জাতীয় টোটেমের উল্লেখ পাওয়া যায়(১৭০) এবং আধুনিক যুগের সেন্সাস-রিপোর্টেও দেখা যায় এই হাতি-টোটেমের উল্লেখ রয়েছে। আজো মহীশূর অঞ্চলে একদল মানুষের নাম হলো আনে(১৭১)—আনে মানে হাতি।
