—————
১৫৮. শান্তিপর্ব ১০৭।
১৫৯. ঐ।
১৬০. ঐ।
১৬১. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী : বৌদ্ধধর্ম ১৪২।
১৬২. ঐ ১৪৫।
১৫. সিদ্ধিদাতার জন্মকথা : গণসমাজ থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি
তাহলে প্রাচীনদের স্মৃতি থেকে এ-কথা একেবারে মুছে যায়নি যে, এক আদিম অবিভক্ত সমাজের ধ্বংসস্তূপের উপরেই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব ঘটেছিলো। সেই আদিম সমাজে শাসক-শাসিতে প্রভেদ নেই; রাজা নেই, প্রজা নেই; লোভ নেই, অধর্ম নেই—মানুষের সঙ্গে মানুষের শুধু প্রীতির সম্পর্ক। আমাদের বক্তব্য হলো, এদেশে আদিম সমাজের রূপটি ঠিক কী রকম ছিলো এবং কী ভাবে সে-সমাজ ধ্বংস হয়ে আবির্ভাব হলো রাষ্ট্রশক্তির—এ-বিষয়ে মৌলিক গবেষণার অবকাশ রয়েছে, ভারততত্ত্বে যাঁরা সুপণ্ডিত তাঁদের দৃষ্টি এই সমস্যার দিকে আকৃষ্ট হওয়া প্রয়োজন। গণপতির পদানুসণ করে আমরা এই ইতিহাসের বহিঃরেখার আভাষ পেলাম এবং সাধারণভাবে কয়েকটি কথা মানতে বাধ্য হলাম। প্রথমত, আমাদের প্রাচীন পুঁথিপত্রে এই প্রাগ্-বিভক্ত প্রাচীন সমাজের উল্লেখ রয়েছে—গণ, ব্রাত, সংঘ, পূগ, শ্রেণী প্রভৃতি নানান নামে প্রাচীনেরা এই সমাজকে অভিহিত করতে চেয়েছেন। এই আদিম সাম্যসমাজে অবশ্যই ষোলো আনা গণতন্ত্রের আয়োজন; দুঃখের বিষয় আধুনিক ঐতিহাসিকেরা এই গণতন্ত্রের লক্ষণ থেকে আদিম সমাজকে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে সনাক্ত করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে সর্বত্রই এক সঙ্গে এই আদিম সমাজ ভেঙে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব ঘটেনি। আজো, ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ওই জাতীয় আদিম সমাজ টিকে রয়েছে : সাঁওতাল বিদ্রোহের বর্ণনাদাতা ইংরেজ লেখক(১৬৩) সাঁওতালদের সম্বন্ধে বলছেন, they republicans and communists in politics—ওরা রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রজাতন্ত্রবাদী ও সাম্যবাদী। উনবিংশ শতাব্দীতেই যদি ওই জাতীয় সমাজ দেশে টিকে থাকে (আজো আছে), তাহলে আজ থেকে প্রায় হাজার দুয়েক বছর আগেকার ভারতবর্ষের রাজনৈতিক মানচিত্রে নিশ্চয়ই ওই আদিম সমাজের—বা গণ-সমাজের পরিচয় বেশি হবার কথা। অতএব, অনুমান করা যায়, প্রাচীন ভারতের এখানে-ওখানে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হবার পর তারই আশে পাশে গণসমাজও থেকে গিয়েছিলো। গণপতির পদাঙ্ক অনুসরণ করেই আমরা দেখতে পেলাম, রাষ্ট্রশক্তির মুখপাত্ররা এই গণসমাজকে খুব সুনজরে দেখেননি। এই কারণেই, প্রচীন আইনের পুঁথিতে গণপতি দেখা দিয়েছেন মূর্তিমান বিঘ্ন বা বিঘ্নরাজ হিসেবে।
অবশ্যই, গণপতির ইতিহাসে এর চেয়েও চিত্তাকর্ষক পর্যায় হলো ওই বিঘ্নরাজের পক্ষে সিদ্ধিদাতার পর্যবসিত হওয়া। এবং আমরা বলতে চাইছি, আধুনিক ঐতিহাসিকেরা যদিও গণপতির ইতিহাসের এই পর্যায়টির দিকে ভালো করে নজর দেননি তবুও এমন হওয়া অসম্ভব নয় যে, এই পর্যায়টির দিকে ভালো করে বিশ্লেষণ করলে পর ভারতীয় ইতিহাসের একটি বিখ্যাত রাষ্ট্রের আবির্ভাব কাহিনী উদ্ধার করা যাবে। অবশ্যই, ব্যক্তিগতভাবে আমার পক্ষে উক্ত বিশ্লেষণের যোগ্যতা নেই। কিন্তু দক্ষতর বিদ্বানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার আশায় আমি এখানে কয়েকটি কথার অবতারণা করতে চাই।
প্রথমত, ঐতিহাসিক বিবর্তনের কয়েকটি মূল নিয়ম আছে। এ-কথা না মানলে ইতিহাসকে বিজ্ঞানের মর্যাদা দেওয়া দুষ্কর(১৬৪)। কিন্তু এ-কথা মানতে হলে স্বীকার করতে হবে, অন্যান্য দেশের ইতিহাসের বেলায় যে-ভাবে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব ঘটেছে আমাদের দেশের ইতিহাসের বেলাতেও সেইভাবেই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হওয়াই স্বাভাবিক। তাই অন্যান্য কোনো দেশের বেলায় যদি কোনো সূত্র ধরে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব-কাহিনী নিয়ে সার্থক গবেষণা হয়ে থাকে তাহলে আমাদের দেশের পুরোনো ইতিহাসের বেলাতেও একই সূত্রে অগ্রসর হয়ে রাষ্ট্রের আবির্ভাব-কাহিনী উদ্ধার করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখের বিষয় যদিও বিদেশের ক্ষেত্রে এ-বিষয়ে সত্যিই উচ্চাঙ্গের গবেষণা হয়েছে তবুও এখনো আমাদের ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনুরূপ পথে অগ্রসর হবার উৎসাহ দেখা দেয়নি।
অথচ, আমাদের প্রাচীন পুঁথিপত্রেই এমন ইঙ্গিত রয়েছে যেগুলিকে বিশ্লেষণ করলে অনুরূপ পথে অগ্রসর হবার সুযোগ পাওয়া যায়। প্রথমে এইরকমেরই কিছু ইঙ্গিতের উল্লেখ করবো এবং তারপর আলোচনা করবো বিঘ্নরাজ থেকে সিদ্ধিদাতায় পর্যবসিত হবার পেছনে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব-কাহিনী সংক্রান্ত কী তথ্য পাওয়া যায়।
ধরা যাক মৌর্য রাষ্ট্রের কথা। এ-রাষ্ট্রের উৎপত্তি কী করে হলো? সাধারণত আমরা এ-বিষয়ে মূরা-নাম্নী দাসী পুত্রের কাহিনী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি। অথচ, আধুনিক গবেষণার আলোয় ইতিহাসের একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে আমরা আজ এ-কথা মানতে বাধ্য যে, ট্রাইব্যাল-সমাজ ভেঙেই রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়। এই ট্রাইব্যাল-সমাজকে চেনবার একটি উপায় হলো জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে সমাজর নাম-করণ পদ্ধতি—অর্থাৎ, টোটেমবিশ্বাস মূলক নাম। এই দুটি কথা মনে রাখলে মৌর্য-রাষ্ট্রের আবির্ভাব-ইতিহাস হিসেবে মূরা নাম্নী দাসীর কাহিনী নিশ্চয়ই পর্যাপ্ত হবে না। কেননা, অপরপক্ষে অন্যান্য তথ্য রয়েছে, এবং সেই তথ্যগুলির তাৎপর্য ইতিহাস-বিজ্ঞানের দিক থেকে মূল্যবান। প্রথমত, আধুনিক ঐতিহাসিকেরা জানেন যে, মৌর্য অশোক তাঁর রাজ্যে ময়ুর-বধ নিষিদ্ধ করেছিলেন(১৬৫)। এই ঘটনাটির তাৎপর্য ঠিক কী? এ-কি শুধুই অশোকের পক্ষে জীবে দয়ার পরিচয়? তা হতে পারতো, যদি রাজাজ্ঞায় নির্বিচারে সমস্ত রকম প্রাণীবধই নিষিদ্ধ হতো। কিন্তু নিষেধটা যেতেতু নির্দিষ্ট এক প্রাণী সম্বন্ধেই সেইহেতু অনুমান করবার সুযোগ থেকে যে এর পিছনে কোনোরকম টোটেম-বিশ্বাসের পরিচয় থাকতে পারে। কেননা, টোটেম বিশ্বাসের সঙ্গে টাবু-র বা নিষেধাজ্ঞার যোগাযোগ রয়েছে। এই টাবু প্রধাণত দু-রকম। এক, বিবাহ সংক্রান্ত; দুই, টোটেম-প্রাণীটির হত্যা ও আহার সংক্রান্ত : হরিণ-দলের মানুষ হরিণদলের কাউকে বিয়ে করতে পারবে না, হরিণ-দলের মানুষ হরিণ-হত্যা করতে পারবে না। হরিণ-দলের মানুষ অন্য যে-কোনো রকম প্রাণী হত্যা করতে ও ভক্ষণ করতে পারে, কেবল হরিণ হয়। তাই মৌর্য অশোকের রাজ্যে যদি নির্দিষ্টভাবে ময়ূর-বধ নিষিদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে এই নিষেধাজ্ঞাকে ময়ূর-বধ সংক্রান্ত টাবুর স্মারক মনে করবার অবকাশ থাকে না কী? তার মানে এই এই নয় যে, মৌর্য রাজবংশের উৎপত্তি ময়ূর-টোটেম-যুক্ত কোনো ট্রাইব্যাল-সমাজ থেকে হওয়াই সম্ভবপর? এবং ঠিই এই ইঙ্গিতটিই পাওয়া যায় জৈন-পুঁথিতে(১৬৬) :
চন্দ্রবচ্চন্দ্রগুপ্তহপি ব্যবর্দ্ধত দিনে দিনে।
ময়ূর পোষক কুলোৎপলিনী বনলাসকঃ।।
অর্থাৎ, গুপ্ত ছিদ্রযুক্ত তৃণমণ্ডপমধ্যে চন্দ্রসুধাপান করিয়া সন্তানপ্রসূত হয় বলিয়া তাহার নাম হইল চন্দ্রগুপ্ত। ইনি ময়ূরপোষক-কুলোৎপন্ন।
এইদিক থেকে ভেবে দেখলে মনে হয় ময়ূর-টোটেম-যুক্ত কোনো ট্রাইব্যাল-সমাজ থেকে মৌর্যবংশের উৎপত্তি অসম্ভব নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় আধুনিক ঐতিহাসিকেরা এখনো সূত্রটিকে অনুসরণ করে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেননি।
