কোনো এক হাতি-টোটেম থেকেই যে গণেশের জন্ম হয়েছে তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ হলো গণেশের ওই গজাননটি। কিন্তু সেই সঙ্গেই মনে রাখা দরকার যে, এককালে গণপতি বা বিনায়ক শব্দের সঙ্গে শুধুমাত্র ওই হাতি-টোটেমটিরই সম্পর্ক ছিলো না। তার বদলে, সন্দেহ হয়, এই গণপতি শব্দটি ছিলো প্রাণীজগতের রকমারি বাসিন্দার সঙ্গে সংযুক্ত একটি সাধারণ নামের মতো। আগেই বলেছি, যাজ্ঞবল্ক্য প্রমুখের রচনা থেকে বোঝা যায়, বিনায়ক এক ছিলেন না, বহু ছিলেন। তাই অনুমান করতে হবে, এই বহু বিনায়কের মধ্যে গজাননধারী একটি নির্দিষ্ট বিনায়কই উত্তরকালে এক এবং অদ্বিতীয় বিনায়ক হয়ে দাঁড়ালেন—তিনিই আমাদের সিদ্ধিদাতা গনেশ। এবং ওই অন্যান্য বিনায়কদের চেহারা কী রকম ছিলো তা অনুমান করবার মতো অন্তত একরকম তথ্যের উল্লেখ আমরা আগেই করেছি। তন্ত্রসাহিত্যে গণেশের পঞ্চাশটি নামের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে কয়েকটি চিত্তাকর্ষক নাম হলো, বৃষভধ্বজ, বৃষকেতন, দ্বিজিহ্ব। এই নামগুলি থেকেই অনুমান করবার সুযোগ থাকে যে, এককালে ওই বহু বিনায়কের বহুপ্রকার রূপ ছিলো,–কোনোটা সাপের মতো, কোনোটা বা ষাঁড়ের মতো।
এই জাতীয় বহু টোটেম-রূপী বিনায়কদের মধ্যে গজাননধারী নির্দিষ্ট একটি বিনায়ক সিদ্ধিদাতা দেবতা হয়ে উঠলেন এবং তারই গৌরব-প্রচারে মুখর হয়ে উঠলো শাসক-শ্রেণীর সাহিত্য ও ভাস্কর্য! অথচ, তার আগের যুগের শাসক-শ্রেণীর সাহিত্যই বিনায়ক-বিদ্বেষে বিষাক্ত হয়েছিলো, বিনায়ককে চেনবার চেষ্টা ছিলো বিঘ্নরাজ বলেই।
বিঘ্নরাজ থেকে সিদ্ধিদাতা। ঘৃণিত, আতঙ্কসঞ্চারী টোটেম-রূপী বহু বিনায়কদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বিনায়কের এই দেবত্বপ্রাপ্তির সঙ্গে কি ভারতীয় ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাবের সম্পর্ক আছে? আছে। তার নাম গুপ্তরাষ্ট্র। সম্পর্কটা কী রকম? আনন্দকুমার কুমারস্বামী আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, ভারতীয় ভাস্কর্যের ইতিহাসে গণেশমূর্তির আবির্ভাব আকস্মিকভাবেই বহুল—অর্থাৎ কিনা, গুপ্তযুগ থেকেই দেখা গেলো হঠাৎ বহুলভাবে গণেশ-মূর্তির আবির্ভাব ঘটতে শুরু করছে। পুরাণগুলিও যে, অমনভাবে সিদ্ধিদাতার মাহাত্ম্যে মেতে উঠলো তাও ওই যুগটা বরাবর হওয়া অসম্ভব নয় : স্কন্ধপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ,–অর্থাৎ, যে-দুটি পুরাণে বিশেষ করে গণেশ মাহাত্ম্যের প্রচার হয়েছে,–গুপ্তযুগ বরাবরই রচিত কি না এ-বিষয়ে বিদ্বানেরা নিশ্চয়ই চিন্তা করতে পারেন; কিন্তু স্যর গোপাল ভাণ্ডারকর(১৭২) ইতিপূর্বেই অনুমান করেছেন যে, গুপ্তযুগে সমস্ত পুরাণগুলিকেই অন্তত ঢেলে সাজানো হয়েছিলো।
মহামহোপাধ্যায় পি. ভি. কানেও (১৭৩) মানছেন, গুপ্তযুগ থেকেই গনেশ মাহাত্ম্যর প্রচার শুরু হয়েছে।
তাই রকমারি টোটেম-রূপী বহু বিনায়কের মধ্যে গজরূপী নির্দিষ্ট বিনায়কটির পক্ষে দেবত্বপ্রাপ্তির সঙ্গে সেকালের ভারতবর্ষে একটি রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব-কাহিনীরও সম্পর্ক রয়েছে। মরেট ও ডেভির মিশর-ইতিহাস সংক্রান্ত গবেষণা থেকে আমরা যদি শিক্ষালাভ করতে প্রস্তুত থাকি তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের পক্ষে সন্দেহ করা অন্যায় হবে না যে, সিদ্ধিদাতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই হয়তো গুপ্ত-রাষ্ট্রের আবির্ভাব-কাহিনীর উপর আলোকপাত করবার আশা আছে। কেননা, গুপ্ত-রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঠিক কীভাবে হয়েছিলো ভারতীয় ইতিহাসে তা আজো অনেকাংশে অমীমাংশিত প্রশ্ন। বিদ্বানেরা ভেবে দেখতে পারেন, হাত-টোটেমযুক্ত কোনো ট্রাইব্যাল সংগঠন ভেঙে এই রাষ্ট্রের আবির্ভাব সম্ভব কি না। আলবারুণী(১৭৪) নাকি গুপ্তবংশের উৎপত্তি প্রসঙ্গে এক অরণ্যবাসী দুর্দান্ত দস্যুদের কথাই উল্লেখ করেছেন। তার মানে, তা কোনো এক ট্রাইব্যাল সংগঠন হওয়া অসম্ভব নয়। সেই ট্রাইবের সঙ্গে হাতি-টোটেমের কোনো সম্পর্ক ছিলো কি না এই প্রশ্ন অনুসন্ধানযোগ্য।
অবশ্যই, এখানে সে-অনুসন্ধান চালাবার যোগ্যতা আমাদের নেই, সুযোগও নেই। কিন্তু গণপতির বিচিত্র ইতিহাসের তৃতীয় পর্যায়টির ব্যাখ্যায় আলোচনার অন্তত একটি বহিঃরেখা দাঁড় করাবার প্রয়োজন ছিলো। এই তৃতীয় পর্যায়টি হলো, বিঘ্নেশ্বর থেকে সিদ্ধিদাতায় পরিণত হবার কাহিনী। আমরা দেখলাম, অন্তত কালনির্ণয়ের দিক থেকে এই কাহিনীর সঙ্গে ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক নতুন রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাবের সম্বন্ধ আছে।
সংক্ষেপে, গণেশের ইতিহাসে মোটের উপর তিনটি পর্যায় দেখা যায়। ভারতীয় সমাজ-ইতিহাসের সঙ্গে এই তিনটি পর্যায়ের সম্পর্ক রয়েছে।
এক : পৃথিবীর সব-মানুষের মতোই বৈদিক আর্য এবং অনার্য উভয় প্রকার মানুষই এককালে প্রাগ-বিভক্ত ট্রাইব্যাল সমাজে জীবন-যাপন করেছে। এই ট্রাইব্যাল সমাজেরই নাম হলো গণ। ফলে, বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতর পর্যায়গুলিতে গণ বা গণপতি নিন্দিত নয়।
দুই : ভারতবর্ষের মানুষদের উন্নতি হয়েছে অসমান তালে। তাই, রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হবার পরও রাষ্ট্র-ব্যবস্থার পাশাপাশিই থেকে গিয়েছে গণসমাজ। এই অবস্থায়, রাষ্ট্রশক্তির মুখপাত্রেরা গণসমাজকে কী রকম ঘৃণার চোখে দেখেছেন তার নজির মহাভারতে পাওয়া যায় এবং তাঁরা তাই গণপতিকেও কী রকম বিষনজরে দেখেছেন তার নজির পাওয়া যাওয়া মানবগৃহ্যসূত্র, যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি প্রভৃতিতে।
