আমাদের যুক্তি হলো, ভূয়োদর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত মর্গানের এই সিদ্ধান্তগুলিকে প্রাচীন সমাজ সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে পারা বৈজ্ঞানিক মূলসূত্র হিসেবে গ্রহণ করেই প্রাচীন পুঁথিতে বর্ণিত সেকালের মানুষদের সমাজ-জীবনকে সনাক্ত করবার চেষ্টা করতে হবে। তাই এ-জাতীয় কোনো বর্ণনায় যদি আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের অভাব দেখা যায় তাহলে অনুমান করবার সুযোগ থাকে যে, বর্ণিত মানবদল বর্বর-দশার উচ্চ স্তরের আগেকার কোনো পর্যায়ে জীবন যাপন করতো। আলোচ্য ক্ষেত্রে, বাহীকদের মধ্যে আধুনিক সাম্পত্য-সম্পর্কের অভাব চোখে পড়ে। তাই তাদের সমাজ-জীবন বর্বর-দশার উচ্চ-স্তরের আগেকার কোনো এক পর্যায়ের বলেই অনুমান করা স্বাভাবিক। এই অনুমান গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বর্বর-দশার মধ্য-স্তরের পর থেকেই ট্রাইব্যাল-সমাজে,–বা আদিম সাম্যসমাজে,–ভাঙন শুরু হয়েছে(১৩২)। অতএব, পাণিনিত মতে এই বাহীকদের সমাজই যদি গণ-সমাজের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয় তাহলে স্বীকার করা দরকার যে, গণ বলতে প্রাগ-বিভক্ত ট্রাইব্যাল-সমাজই হওয়া স্বাভাবিক।
মর্গানের গবেষণা থেকেই সাধারণ বৈজ্ঞানিক মূলসূত্র হিসেবে আমরা আরো জেনেছি যে, মানব-ইতিহাসে এক-বিবাহমূলক সাম্পত্য-সম্পর্কের আবির্ভাব ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থার আবির্ভাব সম্পর্কহীন ঘটনা নয়(১৩৩)। বর্বর-দশার উচ্চ-স্তরে পৌঁছবার আগে পর্যন্ত শুধুই এক-বিবাহ নয়, রাষ্ট্র-ব্যবস্থারও পরিচয় নেই। আর যদি তাই হয় তাহলে বাহীকদের ওই গণ-সংগঠনকে কোনো রকম রাষ্ট্র-সংগঠন বলে অনুমান করারও সুযোগ নেই। গণ বলতে প্রাগ-রাষ্ট্র ট্রাইব্যাল সমাজই বুঝিয়েছে। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে যাঁরা ‘গণ’কে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা বলে মনে করেছেন তাঁদের কাছে প্রাক-রাষ্ট্র ট্রাইব্যাল সমাজের ধারণাটিই সুস্পষ্ট নয়(১৩৪)। তাই, গণের মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ষোলো-আনা আয়োজন দেখে তাঁরা অনুমান করেছেন যে, সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছাড়া গণ আর কিছুই নয়। কিন্তু, গণতন্ত্র অতএব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র—এ-অনুমান বিজ্ঞানসম্পত নয়। কেননা, অধ্যাপক জর্জ টমসন(১৩৫) দেখাচ্ছেন, এমনকি গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলিতেও ট্রাইব্যাল সমাজের মতো আদি ও অকৃত্রিম-গণতন্ত্রের আয়োজন ছিলো না।
অবশ্যই, মহাভারতের সংবাদদাতারা যদি বাহীকদের মধ্যে প্রচলিত নরনারী-সম্পর্ককে আরো খুঁটিয়ে বর্ণনা করতেন তাহলে আমাদের পক্ষে তাদের সমাজ-জীবনকে আরো সুনিশ্চিতভাবে সনাক্ত করবার সুযোগ বাড়তো। কেননা, আদিম সাম্যসমাজেরও একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে—বন্য-দশার মধ্য-স্তর থেকে শুরু করে বর্বর-দশার মধ্য-স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত সেই ইতিহাস। তেমনি, আধুনিক দাম্পত্য-জীবনের আগে পর্যন্ত যে-নরনারীসম্পর্ক তার মধ্যেও রূপান্তর ঘটেছে(১৩৬)। তাই প্রাচীনকালের কোনো মানবদলের মধ্যে প্রচলিত নরনারী-সম্পর্কের স্পষ্টতর বর্ণনা পাওয়া গেলে তারই উপর নির্ভর করে অনুমান করবার সুযোগ থাকে, বর্ণিত মানবদল আদিম-সমাজের কোন পর্যায়ে বাস কতো(১৩৭)। কিন্তু আমাদের দেশের প্রাচীন পুঁথিপত্র থেকে অতোখানি খুঁটিয়ে অনুমান করবার সুযোগ সত্যিই পাওয়া যায় না। তার কারণ, এই পুঁথিগুলির সংবাদদাতাদের উদ্দেশ্য প্রাচীন সমাজ সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সরবরাহ করা নয়, তার বদলে ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রচার। ফলে, তথ্যের দিক থেকে প্রায়ই তাঁদের বর্ণনা অস্পষ্ট ও পর্যাপ্ত—মোটের উপর শুধু এইটুকুই বোঝা যায় যে, বর্ণিত মানুষগুলির মধ্যে এক-বিবাহ বা আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের পরিচয় নেই। আমাদের মূল যুক্তির পক্ষে অবশ্য আপাতত এই তথ্যটুকুই পর্যাপ্ত বলে স্বীকৃত হতে পারে। কেননা, এর থেকে যদিও অনুমান করা যায় না যে, বর্ণিত মানবদল প্রাগ-বিভক্ত সমাজের ঠিক কোন পর্যায়ে বাস করতো তবুও একথা অনুমান করবার সুযোগ থাকে যে, তারা প্রাগ-বিভক্ত সমাজের কোনো-এক স্তরে জীবন যাপন করতো। সুখের বিষয়, এ-ক্ষেত্রে মহাভারতের ওই বর্ণনার মধ্যেই আরো একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত থেকে গিয়েছে। ইঙ্গিতটি হলো, বাহীকদের মধ্যে প্রচলিত উত্তরাধিকার-সূত্র : তস্মাত্তেষাং ভাগহরা ভাগিনেয়া ন সূনবঃ—তাদের মধ্যে পুত্রেরা ধনাধিকারী না হয়ে ভাগিনেয়রাই ধনাধিকারী হয়। এই উত্তরাধিকার-সূত্রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে টীকাকার নীলকণ্ঠ কী রকম কাল্পনিক কথা বলছেন তার নমুনা আমরা আগেই দেখেছি (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, উপসংহার অধ্যায়)। এ-জাতীয় উদ্ভট কথা তিনি কল্পনা করেছেন, তার কারণ প্রাচীন সমাজ-সংক্রান্ত সাধারণ তথ্যের উপর নির্ভর না করেই তিনি এই উত্তরাধিকার সূত্রটিকে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করেছেন। অথচ, প্রাচীন সমাজ-সংক্রান্ত তথ্যের দিক থেকে এই উত্তরাধিকার-সূত্রে মাতৃ-প্রধান সমাজের চিহ্ন থেকে গিয়েছে। আজো আমাদের দেশের মাতৃপ্রধান অঞ্চলগুলিতে(১৩৮) এ-জাতীয় উত্তরাধিকার ব্যবস্থা টিকে থাকতে দেখা যায়। পূর্ণাঙ্গ মাতৃ-প্রধান-সমাজে উত্তরাধিকারসূত্র ছিলো মায়ের দিক থেকে মেয়ের দিকে। এই ব্যবস্থারই কিছুটা রদবদল হয়ে মামার দিক(১৩৯) থেকে ভাগনের দিকে উত্তরাধিকারসূত্র প্রবর্তিত হলো। তারপর, শেষ পর্যন্ত মাতৃ-প্রধান সমাজ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যাবার পর, যখন পূর্ণ পিতৃ-প্রধানসমাজ দেখা দিলো তখন উত্তরাধিকারসূত্র হলো পিতা থেকে পুত্রের দিকে। মাতুল থেকে ভাগিনেয়র দিকে উত্তরাধিকারসূত্র যতোদিন বর্তমান ততোদিক পর্যন্ত সমাজ-সংগঠনে মাতৃ-প্রাধ্যান্যের লক্ষণ রয়েছে বলে অনুমান করা যায়। মাতৃ-প্রধান সমাজ ঠিক কী ও কেন—এ-প্রশ্ন নিয়ে একটু পরেই দীর্ঘতর আলোচনা তোলা যাবে। আপাতত এ-বিষয়ে অধ্যাপক জর্জ টমসনের(১৪০) নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত আমাদের মূল যুক্তির পক্ষে প্রাসঙ্গিক হবে :
…the social dominance of the female sex tend to go with the survival of common ownership.
অর্থাৎ, নারীজাতির সামাজিক প্রতিপত্তির সঙ্গে যৌথ-সম্পত্তিত যোগাযোগ আছে।
মহাভারত-বর্ণিত ওই উত্তরাধিকার-সূত্রে যদি নারীজাতির সামাজিক প্রতিপত্তির স্বাক্ষর,–বা অন্তত স্পষ্ট স্বারক,–থাকে তাহলে তারই মধ্যে যৌথজীবনের ইঙ্গিত থেকে গিয়েছে একথা অনুমান করবার অবকাশ আছে না কি?
