আমাদের মূল যুক্তির পক্ষে এই যৌথ-জীবনের ইঙ্গিতটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, গণ-সংক্রান্ত আরো কয়েকটি শব্দের মধ্যে যেখানে ওই যৌথ-জীবনের ইঙ্গিতটি স্পষ্ট সেই শব্দগুলির উল্লেখ এখানে প্রাসঙ্গিক হবে। গণদ্রব্য(১৪১) বলতে বোঝায়, সাধারণের দ্রব্য—যে দ্রব্যের স্বামী অনেকে এবং একত্রিতভাবে। গণচক্রক(১৪২) বলতে বোঝায় একত্র ভোজন। গণান্ন(১৪৩) বলতে বোঝায় বহুস্বামীক অন্ন—যাতে অনেকের সত্ত্ব আছে। অবশ্যই, মনু যে-হেতু গণজীবনকে সুনজরে দেখেননি সেই হেতুই তাঁর কাছে এই গণান্ন নিন্দনীয়(১৪৪) : গণান্নং গণিকান্নঞ্চ লোকেভ্যঃ পরিকৃন্ততি—গণান্ন ও গণিকান্ন ভোজন করলে তপস্যাসিদ্ধ স্বর্গাদিলোক থেকে বিচ্যুত হতে হয়। ভ্রাতৃবর্গ অথবা বন্ধুবর্গের অনুষ্ঠেয় মরুৎস্তোম নামের যজ্ঞকে কাত্যায়নের শৌতসূত্রে গণযজ্ঞ(১৪৫) বলা হয়েছে। গণবন্ধন শব্দের তাৎপর্য ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই জাতীয় শব্দগুলির মধ্যে থেকে গণ-এর যৌথজীবনবাচকতাই ফুটে ওঠে।
—————————
১২৭. পাণিনি ৫.৫.১১৪।
১২৮. মহাভারত (কালীপ্রসন্ন সিংহ) ১১১৫-৭।
১২৯. K. P. Jayaswal op. cit 1:36.
১৩০. Ibid. 1:38.
১৩১. H. L. Morgan AS 393.
১৩২. F. Engels OFPPS 257ff.
১৩৩. H. L. Morgan AS 393ff.
১৩৪. এই কারণে অধিকাংশ লেখকই ‘tribe’ শব্দটিকে প্রায় নির্বিচারে ব্যবহার করে থাকেন।
১৩৫. G. Thomson SAGS ch. Iii.
১৩৬. H. L. Morgan AS Part III.
১৩৭. যদিও অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন যে বিবাহ-সম্পর্ক পরিবর্তিত হতে তুলনায় বেশি সময় লাগতে পারে; তাই এ-অনুমান যন্ত্রচালিতের মতো করা সঙ্গত নয়।
১৩৮. উত্তরে খাসি এবং দক্ষিণে নায়ারদের দৃষ্টান্ত উল্লেখযোগ্য। O. R. Ehrenfels MI দ্রষ্টব্য।
১৩৯. G. Thomson SAGS 155.
১৪০. Ibid. 71-2.
১৪১. বিশ্বকোষ ৫:১৯৮।
১৪২. ঐ।
১৪৩. ঐ ৫:২০০।
১৪৪. মনু ৪.২১৯।
১৪৫. কাত্যায়ন ২২.১১.২ cf. বিশ্বকোষ ৫:২০০
১৩. ব্রাত্য মানে কী
বলাই বাহুল্য, পুরোনো পুঁথিপত্রে গণ-সংক্রান্ত যে-অজস্র তথ্য পাওয়া যায় তার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ আমাদের পক্ষে বর্তমানে সম্ভব হবে না—বিশেষ করে এই কারণে নয় যে তাহলে আমাদের মূল যুক্তি থেকে বহুদূরে বিক্ষিপ্ত হবার ভয় থাকে। তাই এখানে আমরা আমাদের মূল যুক্তির দিকে নজর রেখেই গণ সম্বন্ধে আরো কিছু নির্বাচিত তথ্যর আলোচনা করবো। আমাদের মূল যুক্তি হলো, গণ বলতে প্রাক-বিভক্ত যৌথ-সমাজকে বোঝানো হয়েছে। পৃথিবীর অন্যন্য সমস্ত মানবদলের মতোই বৈদিক মানুষেরাও এককালে এই প্রাক-বিভক্ত যৌথ-সমাজেই জীবন যাপন করতেন। তাই তাঁদের সাহিত্যের প্রাচীনতর পর্যায়গুলিতে গণ বা গণপতি সম্বন্ধে ঘৃণার ভাব নেই। কিন্তু উত্তরকালে রাষ্ট্রশক্তির মুখপাত্ররা বৈদিক ঐতিহ্যের গরিমা দাবি করলেও গণসমাজকে—এবং অতএব গণপতিকেও—ঘৃণার চোখেই দেখতে শিখেছিলেন : মানব-গৃহ্যসূত্র বা যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে গণপতি বা বিনায়কের বিরুদ্ধে যে-বিষোদগার তার সঙ্গে মহাভারতের সংবাদদাতাদের মুখে বাহীক-প্রমুখদের সম্বন্ধে ওই তীব্র ঘৃণার সম্পর্ক রয়েছে। ভারতবর্ষের জমিতে যে এইরকম ঘটনা ঘটেছে তার কারণ, ভারতবর্ষ এতোটুকু দেশ নয় এবং এখানে পুরো দেশ জুড়ে একই তালে সব মানুষের সমাজজীবন সমান পরিবর্তন দেখা দেয়নি। তাই এদেশে রাষ্ট্রশক্তির পাশাপাশিই টিকে থেকেছে আদিম সাম্যসমাজ।
গণেশকে অনুসরণ করে গণসমাজ-সংক্রান্ত আমরা যে-ইতিহাসটার ইঙ্গিত পাই তারই অনুরূপ ইতিহাস পাওয়া যায় ব্রাত্য শব্দটির তাৎপর্য বিচার করলে। উত্তরযুগে যাঁরা বৈদিক ঐতিহ্যের বাহক বলে নিজেদের পরিচয় দেবার চেষ্টা করলেন, তাঁদের মধ্যে শুধুই যে গণ বা গণপতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষের ভাব ফুটে উঠলো তাই নয়, ব্রাত্য সম্বন্ধেও। তেমনি বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতর পর্যায়ে শুধুই গণ বা গণপতির গৌরবোজ্জল চিত্র নয়, ব্রাত্যেরও। এবং ব্রাত্যের এই ইতিহাসটিকে বিশ্লেষণ করার বিশেষ প্রয়োজন আছে; কেননা, আধুনিক পণ্ডিতমহলে ব্রাত্য শব্দটি নিয়ে নানা রকম ভুল ধারণার প্রচলন দেখা যায়।
বাহীকদের বর্ণনায় মহাভারতের যে-অংশের তর্জমা উদ্ধৃতি করেছি তাতে রয়েছে, ‘দেবগণ সেই ব্রতবিহীন দুরাচারদিগের অন্ন ভোজন করেন না’। প্রশ্ন হলো, ব্রতবিহীন শব্দটি এলো কোথা থেকে? মূলে আছে, ব্রাত্যনাম্ দাসমীয়ানাম্ অন্নম্ দেবাঃ ন ভুঞ্জতে (১৪৬)। স্পষ্টই, ওই ব্রাত্যানাম্ শব্দটিকে ব্রতবিহীন বলে তর্জমা করা হয়েছে। এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, আধুনিক কালে ব্রাত্য শব্দটির ওই রকমই একটা অর্থ করবার চেষ্টা করা হয়। এবং এ-চেষ্টা অকারণ বা অমূলক নয়। কেননা, মনু, বোধায়ন (১৪৭) প্রমুখেরা ব্রাত্য শব্দের অর্থ করেছেন সাবিত্রীপতিত। মনু (১৪৮) বলছেন, সাবিত্রীপতিতা ব্রাত্যা ভবন্ত্যার্য্যবিগর্হিতাঃ—ঠিক বয়সে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের সন্তানদের উপনয়ন না হলে তারা আর্যবিগর্হিত হয়, তাদেরই ব্রাত্য বলে। অতএব, মনুর মত অনুসরণ করে বলা হয়েছে (১৪৯) “সাবিত্রীপতিত উপনয়নাদি সংস্কারবিহীন ব্যক্তিই ব্রাত্য নামে অভিহিত। ব্রাত্যের যজ্ঞাদি বেদবিহিত ক্রিয়ায় অধিকার নাই—ব্রাত্য ব্যবহারযোগ্যও নহে, ইহাই এক শ্রেণীর শাস্ত্রসম্মত সিদ্ধান্ত।” এই রকমই অর্থের উপর নির্ভর করে আধুনিক পণ্ডিতেরা (১৫০) ব্রাত্য বলতে “ব্রত থেকে পতিত” অর্থ করছেন। “কিন্তু”, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৫১) দেখাচ্ছেন, “ব্রত হইতে পতিত এইরূপ অর্থে ব্রত শব্দের উত্তর কোন রূপ তদ্বিত প্রত্যয় করিয়া ব্রাত্য শব্দ নিষ্পন্ন হইতে পারে তাহার সূত্র পণিনির ব্যাকরণে নাই।” শাস্ত্রী মহাশয় শুধু এইটুকু কথাই বললেন, কিন্তু পাণিনির ব্যাকরণে এই ব্রাত্য শব্দের নিষ্পত্তি ঠিক কী ভাবে করা হয়েছে তার উল্লেখ তিনি করলেন না। সেইদিক থেকে দেখা যায়, ব্রাত্য শব্দের নিষ্পত্তি ব্রত শব্দ থেকে নয়। কেননা, পাণিনি বলছেন (১৫২), ব্রাত শব্দের উত্তর স্বার্থে এবং ঞং প্রত্যয় করে ব্রাত্য শব্দ নিষ্পন্ন হয়। তাই, ব্রাত এবং ব্রাত্য।
