সেই ব্রাহ্মণ পুনরায় যাহা কহিলেন, তাহাও শ্রবণ কর। বাহীক দেশে শাকল নামে এক নগর আছে। তথায় এক রাক্ষসী প্রতি কৃষ্ণা চতুর্দশীর রজনীতে দুন্দুভিধ্বনি করত এইরূপ সঙ্গীত করিয়া থাকে যে, আহা! আমি কতদিনে পুনরায় এই শাকল নগরে সুসজ্জিত হইয়া গৌরীগণের সহিত গৌড়ীসুরা পান এবং গোমাংস ও পলাণ্ডুযুক্ত মেষমাংস ভোজন করিয়া বাহেয়িক সঙ্গীত করিব। যাহারা, বরাহ, কুক্কুট, গো, গর্দভ, উষ্ট্র ও মেষের মাংস ভোজন না করে, তাহাদের জন্ম নিরর্থক! হে শল্য! শাকলদেশের আবালবৃদ্ধ সকলেই সুরাপানে মত্ত হইয়া এইরূপ সঙ্গীত করিয়া থাকে; এতএব তাহাদিগের ধর্মজ্ঞান কিরূপে সম্ভাবিত হইতে পারে?
হে মদ্ররাজ, আর এক ব্রাহ্মণ কুরুসভার যাহা কহিয়াছিলেন, তাহাও শ্রবণ কর। হিমাচলের বহির্ভাগে, যে স্থানে পীলু বন বিদ্যমান আছে এবং সিন্ধু ও তাহার শাখা শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা ও বিতস্তা নদী প্রবাহিত হইতেছে, সেই অরট্টদেশ নিতান্ত ধর্মহীন; তথায় গমন করা অবিধেয়। ব্রাহ্মণ, দেবতা ও পিতৃলোক ধর্মভ্রষ্ট সংস্কারহীন অরট্টদেশীয় বাহিকদিগের পূজা গ্রহণ করেন না…
হে শল্য! কুরুসভায় বিপ্র আরো যাহা করিয়াছিলেন, আমি তাহা তোমার নিকট কীর্তন করিতেছি। যে ব্যক্তি যুগন্ধরে উষ্ট্রাদির দুগ্ধ পান, অচ্যুত স্থলে বাস বা ভূতিলয়ে স্নান করে তাহার কিরূপে স্বর্গলাভ হইবে? পঞ্চনদী পর্বত হইতে নিঃসৃত হইয়া যে স্থলে প্রবাহিত হইতেছে, সেই স্থলের নাম অরট্ট; সাধুলোক তথায় কদাচ দুইদিন অবস্থান করিবেন না। বিপাশা নদীতে বাহ ও বাহীক নামে দুইটি পিশাচ আছে। বাহকেরা তাহাদেরই অপত্য। উহারা প্রজাপতির সৃষ্ট নহেল সুতরাং হীনযোনি হইয়া কিরূপে শাস্ত্রবিহিত ধর্ম পরিজ্ঞাত হইবে। ধর্মবিবর্জিত কারস্কর মাহিষক, কালিঙ্গ, কেরল, কর্কোটক ও বীরকগণকে পরিত্যাগ করা কর্তব্য। হে মহারাজ! সেই ব্রাহ্মণ তীর্থগমনানুরোধে সেই অরট্টদেশে এক রাত্র অবস্থান করিয়াছিলেন। ঐ রজনীতে এক উলুখলমেখলা রাক্ষসী তাঁহাকে এই সকল বৃত্তান্ত কহিয়াছিল। সেই অরট্টদেশে এক রাত্র অবস্থান করিয়াছিলেন। ঐ রজনীতে এক উলুখলমেখলা রাক্ষসী তাঁহাকে এই সকল বৃত্তান্ত কহিয়াছিল। সেই অরট্টদেশ বাহীকগণের বাসস্থান, তথায় যে সকল হতভাগ্য ব্রাহ্মণ বাস করে, তাহাদের বেদাধ্যয়ন বা যজ্ঞানুষ্ঠান কিছুই নাই। দেবগণ সেই ব্রতবিহীন দুরাচারদিগের অন্ন ভোজন করেন না। অরট্টদেশের ন্যায় প্রস্থল, মদ্র, গান্ধার, খস, বসাতি, সিন্ধু ও সৌবীর দেশে এই কুৎসিত ব্যবহার প্রচলিত আছে।
হে শল্য! আমি পুনরায় তোমাকে এক উপাখ্যান কহিতেছি…কিছুদিন হইল, এক ব্রাহ্মণ আমাদের ভবনে অতিথি হইয়াছিলেন…(তিনি কহিলেন)…গান্ধার মদ্রক ও বাহীকেরা সকলেই কামাচারী, লঘুচেতা ও সংকীর্ণ।…হে মদ্রাধিপ! আমি আর একজনের নিকট বাহীকদিগের যে কুৎসিত কথা শ্রবণ করিয়াছিলাম, তাহাও কহিতেছি…। পূর্বে অরট্টদেশীয় দস্যুরা এক পরিব্রতা সীমন্তিনীকে অপহরণ পূর্বক তাঁহার সতীত্ব ভঙ্গ করিলে তিনি শাপ প্রদান করিয়াছিলেন যে, হে নরাধমগণ! তোমরা অধর্মাচরণপূর্বক আমার সতীত্ব ভঙ্গ করিলে; অতএব তোমাদিগের কুলকামিনীগণ সকলেই ব্যাভিচারিণী হইবে । আর তোমরা কখনই এই ঘোরতর শাপ হইতে বিমুক্ত হইবে না। হে শল্য! এই নিমিত্তই অরট্টদিগের পুত্রেরা ধনাধিকারী না হইয়া ভাগিনেয়গণই ধনাধিকারী হইয়া থাকে।…
পাণিনি যদি স্পষ্টভাষায় বলে থাকেন এ-হেন বাহীকরাই আয়ুধজীবী সঙ্ঘের বা গণের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত(১২৯) তাহলে নিশ্চয়ই মহাভারতে পাওয়া তাদের এই বর্ণনা গণসমাজের অর্থ-নির্ণয় কাজে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। অধ্যাপক জয়সওয়াল অবশ্যই মহাভারতের এই অংশকে অগ্রাহ্য করেননি। কিন্তু এই দীর্ঘ বর্ণনা থেকে তিনি শুধুমাত্র একটি তথ্য উদ্ধার করবার চেষ্টা করছেন : সেকালের ভারতবর্ষের ঠিক কোন অংশে বাহীকদের বাস ছিলো(১৩০)! বলাই বাহুল্য, সে-তথ্য তুচ্ছ নয়; কিন্তু তাই বলে এ-বর্ণনায় বাহীকদের সমাজ-জীবন সংক্রান্ত যে সাধারণ ছবিটি পাওয়া গেলো তাকেও অবজ্ঞা করা উচিত নয়। অথচ, অধ্যাপক জয়সওয়াল তা অবজ্ঞা করছেন। তার কারণ কি এই যে, সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাঠামোয় এ-বর্ণনায় পুরতে গেলে কাঠামোটিই ভেঙে চৌচির হবার ভয়?
অবশ্যই, মহাভারতের সংবাদদাতাদের বর্ণনায় বাহীকদের প্রতি একটা তীব্র ঘৃণার ভাব রয়েছে। সেই ঘৃণার প্রভাবে তাঁরা কিছুকিছু কাল্পনিক কথা এই বর্ণনায় জুড়ে দিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানে বাহীকদের সমাজ-জীবন সংক্রান্ত কিছু মূল্যবান তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলির দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ রাখলে আমরা দেখতে পাবো, এ-বর্ণনা প্রাগ-রাষ্ট্র ট্রাইব-সমাজেরই ইঙ্গিত দেয়।
বাহীকদের সম্বন্ধে মহাভারতের সংবাদদাতাদের মনে যা নিয়ে সবচেয়ে তীব্র ঘৃণা প্রথমে তারই আলোচনা করা যাক : বাহীকদের মধ্যে যৌন-নিষ্ঠার অভাব। এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, সভ্য-সমাজের কাছে পরিবার জীবন বা দাম্পত্য-ব্যবস্থা বলতে যা বোঝায় বাহীকদের মধ্যে মহাভারতের সংবাদদাতা তা দেখতে পাননি। কিন্তু সেই সঙ্গেই মনে রাখতে হবে, সভ্য-সমাজের এই দাম্পত্য-জীবন চিরন্তন নয় : প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক মানবজাতিই সভ্যতার দিকে এগোবার পথে যে-পর্যায়গুলি উর্ত্তীর্ণ হয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে সেগুলির মধ্যে আধুনিক বিবাহ-সম্পর্ক অনুপস্থিত। আমরা আগেই দেখেছি, মর্গানের পরিভাষা অনুসারে মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে বন্য-দশার নিম্ন স্তর থেকে; তারপর বন্য-দশার মধ্য ও উচ্চ স্তর পেরিয়ে মানুষ বর্বর-দশায় উঠে এলো এবং এই বর্বর-দশারও নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ এই তিনটি স্তর পেরোলে পরই মানুষের পক্ষে সভ্যতার আওতায় পৌঁছোনো সম্ভব। এবং মর্গান দেখালেন, বন্য-দশার আগাগোড়া এবং বর্বর-দশার নিম্ন ও মধ্য স্তর পর্যন্ত কোথাও আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের বা এক-বিবাহের পরিচয় নেই(১৩১) :
…it (অর্থাৎ, আধুনিক বিবাহ-সম্পর্ক) was preceded by more ancient which prevailed universal throughout the period of savagery through the Older and into the Middle Period of barbarism; and that neither the monogamian nor the patriarchal can be traced back to the Later Period of barbarism. They were essentially modern.
অর্থাৎ, বন্য-দশার আগাগোড়াই, এবং বর্বর-দশার আদ্য ও মধ্য স্তর পর্যন্ত সর্বত্রই, আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের তুলনায় প্রাচীনতর নরনারী-সম্পর্ক বর্তমান ছিলো। উচ্চ-বর্বর স্তরের আগে পর্যন্ত কোথাও এ-বিবাহ বা পিতৃ-প্রধান পরিবারের চিহ্ন পাওয়া যায় না। এগুলি একান্তই আধুনিক।
মর্গাএর এই সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ আছে। কেননা, যদিও বন্য-দশার নিম্ন স্তরে আজ আর কোনো মানবদলকে স্বচক্ষে দেখবার উপায় নেই তবুও বন্য-দশার মধ্য-স্তর থেকে শুরু করে বর্বর দশার মধ্য-স্তর পর্যন্ত প্রতিটা অবস্থায় আটকে-পড়ে-থাকা বিভিন্ন মানবদলকে প্রত্যক্ষভাবেই জানতে পারা গিয়েছে এবং দেখা গিয়েছে এই অবস্থাগুলির কোথাও আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের পরিচয় নেই। মনে রাখতে হবে, মানবজাতির যে-কোনো শাখাই সভ্যতার স্তরে পৌঁছুক না কেন তার পক্ষে বন্য-দশার নিম্ন-স্তর থেকেই যাত্রা শুরু করতে হয়েছে এবং তারপর ধাপে ধাপে বন্য-দশার মধ্য ও উচ্চ স্তরে উঠে ও তারপর বর্বর-দশার নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ স্তর পার হয়ে সভ্যতার পর্যায়ে পৌঁছুনো সম্ভব হয়েছে।
