মহাভাষ্য ও কাশিকার উদ্ধৃত অংশ দুটির উপর নির্ভর করে আমরা এখানে লোকায়তিক ধ্যানধারণা-সংক্রান্ত আমাদের মূল যুক্তিরও পুনরুল্লেখ করতে চাই। কাশিকায় ‘অর্থকামপ্রধানাঃ’ বলে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে—এখানে যেন লোকায়তিকদের পুরুষার্থের কথাই ব্রাতজীবীদের বিশেষণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আমাদের যুক্তি হলো, ব্রাত ব্রা প্রাগ-বিভক্ত যৌথজীবনে যে-হেতু কর্মজীবনের সঙ্গে মানব-চেতনার বিচ্ছেদ হয়নি সেই হেতুই অধ্যাত্মবাদ বা ভাববাদের আবির্ভাবও সম্ভব নয়—তাই, সে-স্তরের চেতনাকে আধুনিক অর্থে বস্তুবাদীদর্শন বলা অসঙ্গত হলেও তা লোকায়তিক চেতনাই—ওই লোকায়তিক চেতনা যতো মুক, অব্যক্ত ও অচেতন হোক না কেন। এই প্রসংগে ব্যাকরণ-সাহিত্যে ব্যবহৃত ওই উৎসেধজীবী শব্দটির তাৎপর্যও চিত্তাকর্ষক। মহামহোপাধ্যা কানে উৎসেধজীবী বলতে শারীরিক শ্রমজীবীই বোঝাতে চায় এবং আধুনিক টীকাকারও বলছেন, ‘শারীরিক শ্রমেন (ন তু বুদ্ধি বৈভবেন) জীবন্তি তে ব্রাতা’(১১০)।
তাহলে, ব্যাকরণ-সাহিত্যের দিক থেকেও প্রাগ-বিভক্ত যৌথ-জীবন ও তার সঙ্গে শারীরিক শ্রম এবং অতএব অর্থকামপ্রধান (লোকায়তিক) চেতনার যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায় কি?
কিন্তু গণ, ব্রাত প্রভৃতি শব্দে যে ওই প্রাগ-বিভক্ত যৌথ-সমাজই বোঝানো হয়েছে সে-আলোচনায় ফেরা যাক।
ম্যাকডোন্যাল(১১১), উইলসন(১১২), মনিয়ার-উইলিয়ামস(১১৩) প্রমুখ আধুনিক বিদ্বানেরাও গণ শব্দটির এই সমূহবাচকত্বের তাৎপর্য অনুসরণ করে ইংরেজী প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করছেন : ‘community, corporation, association,’ ইত্যাদি। মনিয়ার উইলিয়ামস তো সরাসরি ‘tribe’ শব্দটিই ব্যবহার করেছেন। এবং এ-জাতীয় অর্থনির্ণয়ের নমুনা ভারতীয় অভিধানেও দুর্লভ নয়। তাই, জে. এফ. ফ্লিট(১১৪) সিদ্ধান্ত করেছিলেন :
…the word ‘gana’ is given in Indian lexicons, with many other terms as primarily a synonym of samuha or samgha, of which the radical and leading idea is that of a ‘gathering together, a collection’.
ভারতীয় অভিধান অন্যান্য কয়েকটি শব্দের সঙ্গে গণ শব্দটিকে সমূহ বা সঙ্ঘের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত করা হয়েছে এবং তার প্রধান ও চূড়ান্ত অর্থ হলো একত্রিত হওয়া, যুথবদ্ধতা।
এবং, এই নজির থেকেই শ্রীযুক্ত ফ্লিট সরাসরি সিদ্ধান্ত করেন যে, গণ বলতে প্রাচীনেরা ‘tribe’-ই বুঝতেন(১১৫)। যদিও অবশ্য অন্যান্য বহু আধুনিক বিদ্বানের মতোই শ্রীযুক্ত ফ্লিটও ওই ‘tribe’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ কী তা আলোচনা করেননি(১১৬)। তিনি যদি মর্গানের গবেষণা অনুসরণ করে সে-কথার আলোচনা করতে রাজী হতেন তাহলে তাঁকেও আদিম-সাম্যসমাজের প্রসঙ্গ তুলতে হতো। আমরা একটু পরে সে-প্রসঙ্গে প্রত্যাবর্তন করবো। তার আগে দেখা দরকার শ্রীযুক্ত ফ্লিট-এর এই ব্যাখ্যা কী ভাবে খণ্ডন করবার চেষ্টা করা হয়েছে এবং ওই চেষ্টা সত্যিই স্বীকারযোগ্য কি না।
রয়েল এসিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায়(১১৭) পাতার পর পাতা জুড়ে এ-বিষয়ে শ্রীযুক্ত জে. এফ. ফ্লিটের সঙ্গে শ্রীযুক্ত এফ. ডাব্লিউ. টমাসের সুদীর্ঘ বিতর্ক হয়েছিলো। বিতর্কের কারণ ছিলো দুটি শিলালিপির পাঠোদ্ধার—শিলালিপি দুটি আনুমানিক পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীর এবং দুটি লিপিতেই ‘গণ’ শব্দের উল্লেখ দেখা গিয়েছিলো। শ্রীযুক্ত ফ্লিট এই গণ শব্দকে সরাসরি ‘ট্রাইব’ অর্থে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এ-তর্জমায় শ্রীযুক্ত টমাসের ঘোরতর আপত্তি ছিলো। তাঁর ধারণায়, গণ শব্দ সাধাণতভাবে ট্রাইব না বুঝিয়ে ট্রাইব-সমাজের শাসক-গোষ্ঠীটুকুকেই (‘governing body of the tribe’) বোঝায়। যদিও অবশ্য মর্গানের গবেষণা অনুসরণ করলে পর দেখতে পাওয়া যায়, ট্রাইব-সমাজ সম্বন্ধে আমরা সাধারণভাবে যে-জ্ঞান পাই তার সঙ্গে শ্রীযুক্ত টমাস কল্পিত এই প্রভেদের সঙ্গতি নেই।
এ-বিতর্ক শুধুমাত্র ওই পাশ্চাত্য বিদ্বানদের মধ্যেই আবদ্ধ ছিলো না। শ্রীযুক্ত ফ্লিট নজির দিয়েছিলেন স্যর ভাণ্ডারকরের রচনার, শ্রীযুক্ত টমাসকে সমর্থন জানালেন অধ্যাপক জয়সওয়াল(১১৮)।
এখানে আমরা বিশেষ করে অধ্যাপক জয়সওয়ালের যুক্তিরই আলোচনা করতে চাই। তার কারণ, আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে জোর দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, প্রাচীন সাহিত্যে গণ বলতে ট্রাইবের বদলে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই বুঝিয়েছিলো—এবং, এই মতবাদ আমাদের সিদ্ধান্তের সম্পূর্ন বিরুদ্ধ। আমরা বলতে চাই, গণ বলতে প্রাগ-বিভক্ত, অতএব প্রাক-রাষ্ট্র, সমাজ-সংগঠনকে বুঝতে হবে। তাছাড়া, ফ্লিট-বনাম-টমাসের বিতর্কে তথ্য প্রভৃতির ভিত্তি সামান্যই ছিলো; অপরপক্ষে অধ্যাপক জয়সওয়াল আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রাচীন সাহিত্য থেকে বহু তত্য উদ্ধৃত করেছেন। সেগুলিকে নতুন করে বিচার করলে শুধুই যে অধ্যাপক জয়সওয়ালের সিদ্ধান্ত বিচার করা হবে তাই নয়, আমাদের পক্ষে তথ্য-ভিত্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছবার কাজও অনেক সহজসাধ্য হবে।
ব্যাকরন-সাহিত্যে গণ এবং সঙ্ঘ বলে দুটি শব্দই যে একার্থবাচক, এ-কথা অধ্যাপক জয়সওয়ালও অস্বীকার করেন না। এ-বিষয়ে আমরা ইতিপূর্বেই কাত্যায়নের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছি—গণ, পূগ, পাষণ্ড, ব্রাত প্রভৃতি সমস্ত শব্দই সমূহ-বাচক। এবং অধ্যাপক জয়সওয়াল নিজেই বলছেন, পাণিনি গণ এবং সঙ্ঘ বলে দুটি শব্দকে একই অর্থে গ্রহণ করেছেন(১১৯) :
Panini, dealing with the formation of the word ‘Samgha’ in III. 3. 86 (সঙ্ঘাদ্ধৌ গণ-প্রশংসয়োঃ) says that the word ‘Sangha’ (as against the regular ‘Samghata’ derived from III, 3. 76) is in the meaning of ‘gana’.
অর্থাৎ, পাণিনি সঙ্ঘ শব্দের নিষ্পত্তি আলোচনা করতে গিয়ে বলছেন (সঙ্ঘদ্ধৌ গণ-প্রশংসয়োঃ—৩, ৩, ৮৬) সঙ্ঘ বলতে গণ বোঝায়—হন্ ধাতু জাত সঙ্ঘাত নয়।
অধ্যাপক জয়সওয়াল এ-বিষয়ে বৌদ্ধ পুঁথিরও নিদর্শন তুলছেন—সেখানেও গণ ও সঙ্ঘ শব্দ একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে(১২০)। সঙ্ঘ ও গণ-এর এই একার্থবাচকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, কৌটিল্যের সঙ্ঘবৃত্ত আলোচনা করবার সময় আমরা স্পষ্টই দেখতে পাবো, যে-সঙ্ঘগুলিকে ভাঙবার জন্যে তিনি নির্লজ্জতম পদ্ধতির নির্দেশ দিতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না সেগুলি ট্রাইব্যাল-সংগঠন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। অথচ, বিস্ময়ের কথা হলো, গণ ও সঙ্ঘের মধ্যে এই অভেদ প্রদর্শন করবার পরই অধ্যাপক জয়সওয়াল বলছেন(১২১) :
