মহাভারতের সভাপর্বে(১০৪) নকুলের দিগ্বিজয়-বর্ণনার এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, যুদ্ধে পৌরব ও পর্বতবাসী দস্যুদের পরাস্ত করবার পর উৎসব-সংকেত নামের সাতটি গণ তিনি জয় করলেন।
পৌরবং যুধি নির্জিত্য দস্যুন্ পর্বতবাসিনঃ।
গণানুৎসবসংকেতানজয়ৎ সপ্ত পাণ্ডবঃ।।
তাহলে এখানে সেকালের সাতটি গণ-এর কথা পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলির সমবেত নাম হলো উৎসব-সংকেত। প্রশ্ন হলো, উৎসব-সংকেত মানে কী? টীকাকার নীলকণ্ঠ বলছেন:
উৎসবসংকেতানাং স্ত্রী-পুরুষয়োঃ পরস্পরপ্রীতিরেব রত্যর্থং সংকেতঃ। ন তু দাম্পত্যব্যবস্থা। পশুনামিব যত্রান্তীত্যর্থঃ।
অর্থাৎ, এই উৎসব-সংকেতের বেলায় স্ত্রী-পুরুষদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি প্রীতিই হলো রতিসম্পর্কের সংকেত। এদের মধ্যে দাম্পত্যব্যবস্থা নেই। তাই, এদের যৌন-জীবন পশুদের মতোই নির্বিচার।
মনিয়ার উইলিয়ামস-এর অভিধান অনুসারে সংকেত কথার শব্দার্থ হলো এনগেজমেণ্ট। উৎসব শব্দটিকে আমরা আজকাল যে-অর্থে বুঝি এখানেও যদি সেই অর্থে গ্রহণ করবার অবকাশ থাকে তাহলে আধুনিক নৃতত্ত্ব-বিজ্ঞানের সঙ্গেও সামঞ্জস্য থাকে। কেননা, প্রাগ-বিভক্ত উপজাতি-সমাজে ‘উৎসবে’র সঙ্গেই ‘রত্যর্থং সংকেতঃ’ দেখা যায়। কিন্তু আপাতত সে-আলোচনা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেলো। তাহলেও এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, নীলকণ্ঠ দাম্পত্য-জীবন বলতে স্ত্রী-পুরুষের যে-সম্পর্ককে সমাজ সঙ্গত বলে মনে করতেন এই গণগুলির মধ্যে তার অভাব ছিলো। অবশ্যই, নীলকণ্ঠ যদি তাঁর সমসাময়িক নীতিবোধের তাড়নায় “পশুনামিব যত্রাস্তীত্যররথঃ” বলে গালাগাল না দিয়ে ওই প্রাগ-দাম্পত্য সম্পর্কের স্পষ্টতর বিবরণ দিতেন তাহলে এই গণগুলি প্রাগ-বিভক্ত সমাজের ঠিক কোন পর্যায়ে ছিলো তা মর্গানের গবেষণার আলোয় অনুমান হয়তো করা যেতো। কেননা, মর্গান দেখিয়েছেন, প্রাচীন প্রাগ-বিভক্ত সমাজে শুধুই যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রশক্তির অভাব তাই নয়, উত্তরকালের দাম্পত্য-ব্যবস্থারও অভাব আছে এবং অবশ্যই ওই প্রাগ-বিভক্ত সমাজেরও ইতিহাস আছে এবং সে-ইতিহাসের পর্যায়ভেদের সঙ্গে নরনারীর সম্পর্কেও প্রভেদ দেখা দিয়েছে। কিন্তু এখানে অতো খুঁটিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছবার অবকাশ না থাকলেও এটুকু নিশ্চয়ই বলা চলে যে, উত্তরকালের সংজ্ঞা অনুসারে যা দাম্পত্য-ব্যবস্থা (অর্থাৎ, এক-বিবাহ বা মনোগ্যামী) নীলকণ্ঠের বর্ণনা অনুসারে উৎসব-সংকেতের মধ্যে যেহেতু তার অভাব সেই হেতু এই গণগুলিকে প্রাগ-বিভক্ত সমাজের কোনো এক পর্যায় বলে না মেনে উপায় নেই।
কিন্তু অধ্যাপক জয়সওয়ালের পক্ষে এই মূল্যবান সূত্রটি অনুসরণ করবার কথাই ওঠে না। তার কারণ তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো প্রাচীন ভারতে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আবিষ্কার করা। তাই, তিনি বিনা দ্বিধায় লিখলেন(১০৫) :
The Utasaba-Sanketas were republicans, probably founded by two men Utasava and Sanketa. We may, however, point out that ‘sanketa’ is a technical term denoting an act or resolution passed by a republic and it is just possible that ‘sanketa’ here originally denoted a state founded by resolution of the Utasavas.
অর্থাৎ, উৎসব সংকেতগুলি প্রজাতান্ত্রিক ছিলো, খুব সম্ভব উৎসব ও সংকেত নামের দুই ব্যক্তি সেগুলির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কিন্তু এখানে বলে রাখা যায় যে, সংকেত একটি পারিভাষিক শব্দ, তার অর্থ হলো প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গৃহীত প্রস্তাব। এবং এও নিশ্চয়ই সম্ভব যে, সংকেত বলতে এখানে এমন এক রাষ্ট্র বোঝানো হয়েছে যা উৎসবদের গ্রহণ করা প্রস্তাবের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো।
অতো বড়ো একজন ঐতিহাসিকের রচনায় এ-রকম আবোল-তাবোল কথা পড়লে দুঃখিত হতে হয়। অথচ, সমসাময়িক কোনো আশা-আকাঙ্খাকে ঐতিহাসিক গবেষণার একমাত্র প্রেরণা বলে গ্রহণ করলে শেষ পর্যন্ত এ-ভাবে বিজ্ঞান ভ্রষ্ট ন হয়েই বা উপায় কী।
——————————–
৯৯. R. P. Dutt IT 314.
১০০. K. P. Jayaswal HP 1:vi.
১০১. Modern Review : 1919, March.
১০২. Amrita Bazar Patrika : 1919, 20th E.
১০৩. H. L. Morgan AS 47-154.
১০৪. সভাপর্ব ২৭.১৬।
১০৫. K. P. Jayaswal HP 1:156.
১১. গণ মানে কী—শব্দার্থ বিচার
তাহলে, নিজেদের সাময়িক ধ্যানধারণা ও আশা-আকাঙ্খাকে সচেতন ভাবে সমালোচনা করেই গণ-এর তাৎপর্য অন্বেষণে অগ্রসর হতে হবে।
গণ প্রসঙ্গে প্রাচীন পুঁথিপত্রে নানা রকম শব্দ ব্যবহার হয়েছে। প্রথমে সেগুলির অর্থ-বিচার করা দরকার।
মহামহোপাধ্যায় পি. ভি. কানে(১০৬) বলছেন, কাত্যায়নের মতে গণ, শ্রেণী, ব্রাত, পূগ, সংঘ ও পাষণ্ড এই ক’টি শব্দ একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে—অর্থটা হলো সমূহ বা বর্গ। মহামহোপাধ্যায় কাত্যায়ন থেকে উদ্ধৃত করছেন : গণাঃ পাষণ্ডপুগাশ্চ ব্রাতাশ্চ শ্রেণয়স্তথা, সমূহাখ্যাশ্চ যে চান্যে বর্গাখ্যাস্তে বৃহস্পতিঃ। এবং, মহামহোপাধ্যায়(১০৭) বলছেন, এই শব্দগুলি বৈদিক সাহিত্যেও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, কিন্তু সেখানে এগুলি শুধু সাধারণভাবে সমূহবাচক (a group),–তার চেয়ে আর কোনো বিশিষ্ট অর্থ এগুলির নেই।
পাণিনিও(১০৮) পূগ, গণ, সংঘ এবং ব্রাত শব্দ নিয়ে আলোচনা করেছেন, তাঁর ভাষ্যকারেরা এই শব্দগুলিকে আরো বিস্তারিতিভাবে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করছেন।
পাণিনি : ব্রাতেন জীবতি।
মহাভাষ্য : নানাজাতীয় অনিয়তবৃত্তয় উৎসেধজীবিনঃ সঙ্ঘধা ব্রাতাঃ। তেষাং কর্ম ব্রাতং। তেন ব্রাতকর্মণা জীবতীতি ব্রাতীনঃ।
কাশিকা : নানাজাতীয় অনিয়তবৃত্তয়োহর্থকামপ্রধানাঃ সঙ্ঘধাঃ পূগাঃ।
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, ব্রাত প্রভৃতি শব্দের অর্থে মূল ঝোঁকটা সমূহত্বের (যৌথ-জীবনের) উপরই। তবুও ভাষ্যকারদের কয়েকটি কথার শব্দার্থ সম্বন্ধে খুঁটিয়ে ভাবা দরকার। যেহেতু সমূহ-জীবনের পর্যায়ে জাতিভেদ দেখা দেওয়া সমাজ-বিজ্ঞান অনুসারে স্বাভাবিক ঘটনা নয় (কেননা, জাতিভেদ প্রধাণতই ভেদের কথা, আর তাই সমূহার্থের সম্পূর্ণ বিপরীত), সেইহেতু ভাষ্যকারদের ‘নানাজাতীয়’ শব্দকে সাধারণভাবে ‘নানা প্রকার’ অর্থে গ্রহণ করাই উচিত নয় কি? এই মানের সঙ্গেই ‘অনিয়ত বৃত্তি’ শব্দাদিরঅ সঙ্গতি থাকা সম্ভব—কেননা, জাতিভেদের একটি লক্ষণই হলো বৃত্তি বা জীবিকা স্থিরনিশ্চিত বা নিয়ত হয়ে যাওয়া। তাছাড়া, ব্রাতকর্ম বলতেও পুরো দলের কাজকর্ম বোঝানোই সম্ভব—ব্রাতের মধ্যে যদি জাতিভেদ সত্যিই থাকে তাহলে ব্রাতকর্ম বলে একটি শব্দ ব্যবহার করা স্বাভাবিক নয়। এই কারণেই, মহামহোপাধ্যায় কানের(১০৯) ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। তিনি বলছেন : Vratas are groups formed by ‘men of various castes’ with no fixed means of livelihood but subsisting by the might (or strength) of their bodies (by bodily labour of various kinds)। আমাদের মন্তব্য বলো, গণ বা ব্রাত নামের ওই যৌথ-জীবনের ধ্বংসস্তূপের উপরই উত্তরযুগের জাতিভেদের ইমারত গড়ে ওঠা সম্ভবপর।
