কিন্তু তাছাড়াও দেশের জনমতকে ধোঁকা দেবার জন্যে দরকার ছিলো ইতিহাসের দোহাই। ও-তরফের পণ্ডিতেরা তাই আমাদের বারবার বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন যে, ভারতবর্ষে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথাই ওঠে না,—ভারতবর্ষের ঐতিহ্যে তার কোনো নজির নেই। বিদেশী শাসকদের মুখপাত্রেরা তাই প্রমাণ করছিলেন, সাধারণতান্ত্রিক স্বায়ত্বশাসনের দাবিটা আমাদের পক্ষে নেহাতই বিজাতীয় উৎসাহের পরিচায়ক।
ফলে, জাতীয় আন্দোলনের তরফ থেকেও ঐতিহাসিক গবেষণা যে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে উঠবে তাতে বিস্ময়ের অবকাশ নেই। তাগিদ পড়লো দেশের অতীত খুঁড়ে পাল্টা নজির খুঁজে বের করবার। আর, এই কারণেই ঐতিহাসিকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো উপেক্ষিত ও অবহেলিত গণগুলির দিকে। পাল্টা নজির হিসেবে ওই গণ-এর সাক্ষ্য সত্যিই দুর্মূল্য। কেননা, গণ বলতে আসলে যাই বোঝাক না কেন, এ-বিষয়ে এতোটুকুও সন্দেহের অবকাশ নেই যে, তা একরকমের সমাজসংগঠন এবং তার মধ্যে সাধারণতান্ত্রিক স্বায়ত্বশাসনের আয়োজন সত্যিই ষোলো আনা।
বই-এর ভূমিকায়(১০০) অধ্যাপক জয়সওয়াল সানন্দে ঘোষণা করলেন, স্যর শঙ্কর নায়ার ভারতসরকারের কাছে গঠনতান্ত্রিক সংশোধনের প্রথম সুপারিশে (৫ই মার্চ, ১৯১৭) বইটির পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃত করেছেন। আর, বইটির রচনা-সময়েই লেখক যে গণতান্ত্রিক সংশোধন-বিষয়ে কতোখানি হুশিয়ার ছিলেন তা বইটির সূচীপত্রের উপর একবার চোখ বোলালেই বুঝতে পারা যায়। তাঁর ভারত-আবিষ্কার থেকে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্রমূলক কোনো রকম খুঁটিনাটির হিসেবই বাদ পড়েনি : লোকসভার আসন, কোরাম, হুইপ, ভোট, অনুপস্থিতের ভোট, ব্যালট ভোট, সংখ্যা-গরিষ্ঠ সংক্রান্ত নীতি, প্রতিনিধি নির্বাচন পদ্ধতি, ভোটের অধিকার, রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, নাগরিকের অধিকার,—এক কথায়, জাতীয় কংগ্রেস তখন যে-গঠনতন্ত্র চেয়েছে তার প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি পর্যন্ত।
অধ্যাপক মজুমদারের বই-এর মূলেও এই রাজনৈতিক প্রেরণা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। বইটি সম্বন্ধে স্বদেশী পত্রিকাগুলির প্রতিক্রিয়া থেকেই তা অনুমান করা যায়। অধ্যাপক মজুমদারের বইটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই মডার্ন রিভিউ(১০১) উচ্ছ্বাস করে বললো : ইতিহাসকে অস্বীকার করে যাঁরা প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে, স্বায়ত্বশাসনে শুধুমাত্র পাশ্চাত্য জাতিদেরই একচেটিয়া অধিকার তাঁদের যুক্তিকে এ-বই একবারে নস্যাৎ করে দেবে। অমৃতবাজার পত্রিকা(১০২) সগর্বে ঘোষণা করলো : ফিরিঙ্গি ভায়ারা তো বারবার তর্ক তুলে বলেন যে, গণতান্ত্রিক পরীক্ষা ভারতবর্ষে চলবে না—এই বই তাঁদের একেবারে মুখের মতো জবাব হয়েছে।
ঐতিহাসিক আবিষ্কারের পিছনে সমসাময়িক রাজনীতির প্রেরণাটা এতোটুকুও অস্পষ্ট নয়।
আমাদের যুক্তি হলো, সেকাল সম্বন্ধে গবেষণায় প্রবৃত্ত হলেও একালের ঐতিহাসিক যেহেতু অনিবার্যভাবেই একালের আশা-আকাঙ্খার দ্বারা প্রভাবিত হতে বাধ্য সেই হেতু নৈর্ব্যক্তিক হবার একমাত্র পথ একালের ওই ধ্যানধারণাগুলিকে সচেতনভাবে সমালোচনা করবার প্রচেষ্টা। তাই, গণ-সংক্রান্ত আধুনিক ঐতিহাসিকদের গবেষণাকে গ্রহণ করবার আগে তাঁদের ওই রাজনৈতিক প্রেরণার সমালোচনা করা প্রয়োজন।
আমরা আমাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় জেনেছি, ওই রাজনীতির আসন অবদানই বা কোথায় আর সংকীর্ণতাই বা ঠিক কী। গণতান্ত্রিক গণতন্ত্রের দাবিতে নিশ্চয়ই অগ্রগতির স্বাক্ষর ছিলো। অপরপক্ষে, জনসাধারণের মধ্যে সাম্যজীবনের চাহিদাকে উপেক্ষা করাই এ-রাজনীতির প্রকৃত সংকীর্ণতা। উক্ত রাজনীতির প্রেরণায় যে ঐতিহাসিক গবেষণা তার বেলাতেই একই কথা। ইংরেজ ও ফিরিঙ্গি যুক্তির বিরুদ্ধে দেশের ইতিহাস থেকে গনতান্ত্রিক স্বায়ত্বশাসনের ঐতিহ্যকে তুলে ধরবার চেষ্টা এঁদের গবেষণার প্রকৃত গৌরব। কিন্তু অন্যান্য সমস্ত দেশের মানুষের মতোই ভারতবর্ষের মানুষও যে এককালে আদিম সাম্য সমাজে বাস করেছে সে-বিষয়ে চেতনার অভাব এঁদের গবেষণার প্রকৃত সংকীর্ণতা। বস্তুত, আমরা বহু প্রমাণের সাহায্যে একটু পরেই দেখতে পাবো, গণ শব্দের আদি তাৎপর্য অভ্রান্তভাবেই ওই আদিম সাম্যসমাজ। অথচ, দেশের ঐতিহ্য সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নজির খোঁজবার প্রেরণায় উভয় ঐতিহাসিকই গণকে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এঁদের প্রধান যুক্তি হলো, গণকে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে মানতেই হবে, কেননা, গণ-এর মধ্যে গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ আয়োজন রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র গণতন্ত্রের লক্ষণ থেকেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রমাণ হয় না। মর্গানের(১০৩) গবেষণার সাহায্য গ্রহণ করলে এঁরা অনায়াসেই দেখতে পেতেন, প্রাগ-বিভক্ত প্রাচীন সমাজে গণতন্ত্রের ষোলো আনা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রশক্তির পরিচয় নেই। ওই একান্ত গণতান্ত্রিক সাম্যসমাজের ধ্বংসস্তূপের উপরই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হয়েছে।
গণ বলতে প্রাচীনেরা সত্যিই যদি এ-হেন প্রাগ-বিভক্ত আদিম সাম্য সমাজ বুঝে থাকেন তাহলে জাতীয় কংগ্রেসের একটি নির্দিষ্ট দাবির মধ্যে ঐতিহাসিক গবেষণার প্রেরণাকে আবদ্ধ রেখে এই গণ-সমাজের স্বরূপ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। অধ্যাপক জয়সওয়াল ও অধ্যাপক মজুমদারের সিদ্ধান্ত তাই অনিবার্যভাবেই বিজ্ঞান-ভ্রষ্ট ও ভ্রান্ত হয়েছে। গণ-এর অর্থবিচার এবং প্রাচীন সমাজে গণতন্ত্রের আয়োজন নিয়ে আলোচনা সুদীর্ঘ হবে। এখানে শুধু নমুনা হিসেবে উল্লেখ করা যায় একটি নির্দিষ্ট রাজনীতির প্রেরণার ফলে অতো বড়ো বড়ো ঐতিহাসিকেরাও কী রকম কাল্পনিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।
