গণপতিরই আর একটা নাম হলো লোকবন্ধু, লোকনাথ(৯৭)। লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস-সন্ধানে আমরা তাই এই লোকবন্ধুরই পদাঙ্ক অনুসরণ করবার পণ করেছি। সে-পথে এগোতে গেলে সর্বপ্রথম নিশ্চয়ই প্রশ্ন তুলতে হয় : গণ মানে কী? কেননা গণনায়ক শুধুই গণের নায়ক নন, তাঁর একটি নামই হলো গণ—শুধু গণ। তাই গণের রহস্য না বুঝলে গণনায়কের রহস্য বোঝা যাবে না।
———————–
৮৮. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৬৪।
৮৯. H. Mitra op. cit. 1935, 104.
৯০. ঋগ্বেদ ২.২৩.১।
৯১. বাজসনেয়ী সংহিতা ২৩.১৯।
৯২. M. Monier-Williams op. cit. 548.
৯৩. Ibid.
৯৪. বিশ্বকোষ ১০.১২৬-৭।
৯৫. এই গ্রন্থের চতুর্থ পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।
৯৬. H. P. Shastri AV 2.
৯৭. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৬৪।
১০. গণ মানে কী—কালীপ্রসাদ জয়সওয়াল ও রমেশচন্দ্র মজুমদার
গণ মানে কী? এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া সত্যিই তেমন দুরূহ হওয়া উচিত নয়। কেননা, প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র রেখে যাবার ব্যাপারে প্রাচীনেরা মোটেই কৃপণ ছিলেন না। তবু এ-কথাও ঠিক যে, শুধুমাত্র ওই দলিলগুলির শব্দার্থের মধ্যে আবদ্ধ থাকলে গণকে বোঝবার চেষ্টা একপেশে, অতএব ভুলও হতে পারে। তার কারণটা খুব জটিল নয়। দলিলগুলির উপর চোখ বোলালেই বুঝতে পারা যায় গণ ছিলো সেকালের কোনো একরকম সমাজ-সংগঠন। তাই, গণকে বুঝতে হলে সংস্কারমুক্ত সমাজবিজ্ঞানের সাহায্যও প্রয়োজন।
এই সংস্কারমুক্তির কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, শুধু যে সেকালের রচনাই সেকালের সামাজিক-পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হতে বাধ্য তাই নয়, সেকালের রচনা সম্বন্ধে একালের মনোভাবটির একালের সামাজিক-পরিস্থিতির প্রভাব নিরপেক্ষ হওয়া কঠিন। কারণ, সেকাল নিয়ে গবেষণা করলেও একালের ঐতিহাসিক হাজার হোক একালেরই মানুষ। এবং, একালের মানুষ হিসেবে তাঁর মনে একালের প্রয়োজন নানারকম সংস্কার সৃষ্টি করতে বাধ্য। তাই, আধুনিক ঐতিহাসিকের লেখনী পুরোনো দলিলপত্রের ব্যাখ্যা দেবার সময় সেগুলিকে আধুনিক যুগের আশা-আকাঙ্খার রঞ্জিত করবার প্রলোভনে পড়তে পারে। এ-ক্ষেত্রে নৈর্ব্যক্তিক হবার একমাত্র পথ হলো, আধুনিক যুগের আশা-আকাঙ্খাগুলিকে সচেতনভাবে সমালোচনা করবার প্রবেষ্টা(৯৮)।
কথাটা বিশেষ করে কেন উঠলো তাই বলি। আধুনিক ঐতিহাসিকেরা গণ নিয়ে গবেষণা বড়ো কম করেননি। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক কাশীপ্রসাদ জয়সয়ালের “হিন্দু পলিটি” এবং অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদারের “কর্পোরেট লাইফ ইন এন্সেণ্ট ইণ্ডিয়া”,–বিশেষ করে প্রথম বইটির নাম—উল্লেখ না করলেই নয়। এই বই দুটিতে তাঁরা প্রাচীনদের কাছ থেকে পাওয়া গণ-সংক্রান্ত বহু তথ্য একত্রিত করেছেন—বস্তুত, তাঁদের ওই পরিশ্রমই আমাদের পক্ষে গণ নিয়ে আলোচনার পথ সুগম করেছে। তবুও তাঁরা যে-সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চেয়েছেন তা আমাদের কাছে স্বীকারযোগ্য মনে হয়নি। তার কারণ, তাঁদের ঐতিহাসিক দক্ষতার অভাব নয়, তাঁদের মনের উপর আধুনিক যুগের এক নির্দিষ্ট আশা-আকাঙ্খার প্রভাব। কেননা, তাঁদের গবেষণার পিছনে স্পষ্ট প্রেরণা হলো একটি নির্দিষ্ট যুগের একটি নির্দিষ্ট রাজনীতির। এই রাজনীতির সাময়িকতা ও সংকীর্ণতা তাঁদের সিদ্ধান্তকেও সাময়িক মূল্য দিয়েছে ও সংকীর্ন করেছে।
কথাটা এমনি শুনলে হয়তো সন্দেহজনক মনে হবে। অথচ, তথ্যের দিক থেকে তাঁদের গবেষণার পিছনে তাঁদের সময়কার রাজনীতির দাবিটা সত্যিই অস্পষ্ট নয়।
প্রথমত, জয়সওয়াল আর মজুমদারের আগেও অনেক বড়ো বড়ো বিদ্বান প্রাচীন ভারতের ইতিহাস নিয়ে অনেক বড়ো বড়ো বই রচনা করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই বইগুলিতে গণ-এর তাৎপর্য-বিচারের চেষ্টা নেই বললেই চলে। জয়সওয়াল ও মজুমদারের রচনাই সর্বপ্রথম বলিষ্ঠভাবে ঘোষণা করলো, প্রাচীন ভারতের ইতিহাসকে সম্যকভাবে বুঝতে হলে গণ-এর তাৎপর্য বিচার করবার প্রয়োজন আছে। এ-ঘটনা উল্লেখযোগ্য। কারণ, আগেই বলেছি, প্রাচীন পুঁথিপত্রে গণ-সংক্রান্ত যে-মালমশলা মজুত আছে তার পরিমাণ বড়ো কম নয়। তাই, আগেকার স্বনামধন্য ঐতিহাসিকদের পক্ষে সেগুলিকে উপেক্ষা করাও তুচ্ছ ঘটনা নয়। গণ-এর প্রতি তাঁদের নজর না পড়বার কারণ হলো তাঁদের পক্ষে গণকে বোঝবার তাদিগই ছিলো না। অথচ, গণ-এর প্রতি আলোচ্য ঐতিহাসিক দু’জনের দৃষ্টি পড়লো, কেননা, দৃষ্টি পড়বার স্পষ্ট তাগিদ ছিলো। তাগিদটি ঠিক কী রকম তা বোঝবার জন্যে আমাদের জাতীয়-সংগ্রামের ইতিহাসের একটি পর্যায়ের কথা মনে রাখতে হবে।
বই দুইটি রচনাকাল কী? অধ্যাপক জয়সওরালের বই প্রকাশিত হয়েছে ১৯২৪-এ। কিন্তু লেখা কয়েক বছর আগেকার। প্রকাশিত হতে দেরি হবার অপ্রীতিকর কারণ লেখক ভূমিকায় ব্যাখ্যা করেছেন। অধ্যাপক মজুমদারের বইটির রচনাকালও আনুমানিক একই রকম, ১৯১৯-এর কিছু আগে হবে।
এই সময়টা বরাবর ভারবর্ষের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অবস্থাটা ভেবে দেখা যাক। জাতীয় কংগ্রেসের কণ্ঠে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৯১৯-এর প্রস্তাবে(৯৯) ঘোষণা করা হলো, স্বায়ত্বশাসনের ভিত্তিতে দেশে সাধারণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র চাই। অবশ্যই, এ-দাবির প্রতিষেধক হিসেবে ইংরেজ শাসকেরা পাইক-পেয়াদা থেকে অর্ডিন্যান্স-গোয়েন্দা পর্যন্ত কোনো অনুষ্ঠানেরই ত্রুটি করেননি।
