বাজসনেয়ী সংহিতায়(৯১) দেখা যায় অশ্বমেধযজ্ঞ প্রসঙ্গে মেয়েরা দল বেঁধে গাইছে :
গণানাং ত্বাং গণপতিং হবামহে।।
প্রিয়ানাং ত্বাং প্রিয়পতিং হবাহমে।।
নিধীনাং ত্বাং নিধিপতিং হবামহে।।
অর্থাৎ,
গণদের মধ্যে তুমি গণপতি, আমরা তোমার যজ্ঞ করি। প্রিয়দের মধ্যে তুমি প্রিয়পতি, আমরা তোমার যজ্ঞ করি। নিধিদের মধ্যে তুমি নিধিপতি, আমরা তোমার যজ্ঞ করি।
ওই গানে নিধি শব্দটির প্রতি দৃষ্টি আবদ্ধ রাখলে সন্দেহ করা যেতে পারে যে, এখানে প্রাগ-বিভক্ত সমাজের,—ব্যক্তিগত সম্পত্তি দেখা দেবার আগেকার পর্যায়ের—স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। মনিয়ার উইলিয়ামস(৯২) বলছেন, সংহিতা সাহিত্যে নিধি শব্দ store, hoard, treasure, ইত্যাদি বুঝিয়েছে; ‘ধা’ ধাতু (to deposit) থেকে শব্দটির নিষ্পত্তি। নিধি বলতে তাই এক জায়গায় জমা করা ধনসম্পত্তি বোঝায়। কিন্তু কার ধনসম্পত্তি? উত্তরযুগের পৌরাণিক সাহিত্য আর আইনের বই থেকে সন্দেহ হয় এ হলো এমন ধনসম্পত্তি যার উপর কারুর ব্যক্তিগত মালিকানা নেই। পৌরাণিক সাহিত্যে(৯৩) সাধারণত ন’জন (কখনো আটজন) নিধির উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের নামগুলিতেই টোটেম-বিশ্বাসের—অতএব আদিম সমাজের—চিহ্ন টিকে রয়েছে : পদ্ম, মহাপদ্ম, শঙ্খ, মকর, কচ্ছপ, ইত্যাদি, ইত্যাদি। পৌরাণিক সাহিত্যে যদিও এই নিধিদের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে কুবের বা লক্ষ্মীর অনুচর হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে তবুও অনুমিত হয় এ-কল্পনার পিছনে কোনো-না-কোনো বাস্তব সমাজ-পরিবেশ এককালে ছিলো। কিন্তু তার চেয়েও চিত্তাকর্ষক হলো আইনের পুঁথিগুলির সাক্ষ্য। কেননা, আইনের বই(৯৪) থেকে এটুকু নিঃসন্দেহে প্রমাণ হয় যে, নিধি হলে এমন ধনরত্ন যার উপর কারুর ব্যক্তিগত স্বামিত্ব নেই। অবশ্যই, এ-যুগে আমরা যাকে চিরপ্রনষ্ট স্বামীক (গুপ্তধন?) বলি, মিতাক্ষরা প্রভৃতি অপেক্ষাকৃত একালের আইনের বইতে নিধি বলতে হয়তো তাই-ই বুঝিয়েছে; কিন্তু এ-কথা কল্পনা করা সত্যিই কঠিন যে, বাজসনেয়ী সংহিতার যুগেও এ-ধরনের গুপ্তধনের বাস্তব সম্ভাবনা ছিলো(৯৫)। তাই, সেকালের স্বামীবিহীন সম্পদকে প্রাচীন সমাজের যৌথ-সম্পদ মনে করবার অবকাশ আছে—উত্তরকালের আইনকর্তাদের রচনাতেও নিধি শব্দ থেকে ব্যক্তিগত মালিকানার অভাবসূচক তাৎপর্যটা মুছে যায়নি। কিন্তু তাঁদের সমাজে এ-হেন সম্পত্তি বলতে যৌথ-সম্পদ নয়—মালিকহীন সম্পত্তি বলতে শুধুমাত্র প্রনষ্টস্বামীক সম্পদ।
সংহিতার এই দুটি উদ্ধৃতিতে আমরা বিশেষ করে দুটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করলাম : প্রথমটিতে প্রাগ-অধ্যাত্মবাদী চেতনার স্মৃতি; দ্বিতীয়টিতে প্রাগ-ব্যক্তিগত-সম্পত্তির পর্যায়ের স্মৃতি। আমাদের মূল যুক্তি অনুসারে দু’-এর মধ্যে যোগাযোগ আছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশ এবং অধ্যাত্মবাদী চেতনার বিকাশ সম্পর্কহীন নয়। এবং আমাদের কাছেও গণেশ সত্যিই যেন সিদ্ধিদাতা : তাঁর ইতিহাস অনুসন্ধান করতে করতে আমরা সমাজ-বিকাশের এমন এক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে যাই যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়নি এবং সেই সঙ্গেই আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি, অধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী ধ্যানধারণারও নয়!
তাই, গণপতির প্রসঙ্গ ছেড়ে যাওয়া চলবে না। তাঁরই কথায় ফিরে আসা যাক।
ভারতবর্ষের ইতিহাস একটি আশ্চর্য ঘটনা বারবার চোখে পড়ে। যে-কোনো কারণেই হোক, এদেশে রাষ্ট্রশক্তির অধিনায়কেরা বৈদিক ঐতিহ্যের গরিমা চেয়েছিলেন। এমনকি, অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কালেও শূদ্র শিবাজী রাষ্ট্রশক্তি লাভ করবার পর কাশী থেকে গার্গভট্ট বলে জনৈক পণ্ডিতকে আনিতে তাঁর সাহায্যে নিজেকে ক্ষত্রিয় বলে ঘোষণা করবার ব্যবস্থা করলেন(৯৬)।
এবং বৈদিক-গরিমা-লোপুপ রাষ্ট্রশক্তির এই অধিনায়কেরাই গণ-সমাজ সম্বন্ধে বিদ্বেষ ও বিতৃষ্ণায় মুখর হয়েছিলেন।
ফলে, ঐ বৈদিক মানুষদেরও যে একটা অতীত ছিলো,—তাঁরাও যে এককালে গণ-সমাজেই বাস করতেন,—এ-কথা আমরা আজকের দিনে প্রায়ই ভুলে যাই। অথচ, তারই স্মৃতি টিকে রয়েছে সংহিতার উদ্ধৃতি দুটির মধ্যে। তাই, আমরা আগে যে যুক্তির উল্লেখ করেছি এখানে তারই পুনরুল্লেখ করা প্রয়োজন : আর্য-অনার্য মতবাদের সাহায্যে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির ব্যাখ্যা করবার চেষ্টায় একটা বিপদ হলো, ওই আর্যদেরই অতীত ইতিহাসটাকে ভুলে যাবার বা ভুল বোঝবার সম্ভাবনা থাকে। কেননা, আর্যদের রচনায় সেই অতীতের যে-কোনো স্মৃতিচিহ্ন দেখলেই তা অনার্যদের কাছ থেকে গৃহীত হয়েছিলো বলে ব্যাখ্যা করবার ঝোঁক এসে যায়। গণপতির ক্ষেত্রেই ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়ের রচনা এই ঝোঁকের একটি দৃষ্টান্ত : এদেশের অনার্য অধিবাসীদের যেন খুশি করবার জন্যেই বৈদিক আর্যরা অনার্য গণপতিটিকে গ্রহণ করেছিলেন। আমাদের যুক্তি হলো, তা না হতেও পারে। এককালে তাঁরা নিজেদেরই খুশি করবার জন্যে গণপতি নিয়ে গান রচনা করেছিলেন। কেননা, পৃথিবীর বাকি সব মানুষের মতোই এই আর্যরাও এককালে গন-সমাজেই বাস করতেন—তার চিহ্ন বৈদিক সাহিত্য থেকে বিলুপ্ত হয়নি।
সংক্ষেপে : গণপতির ইতিহাসে মোটের উপর তিনটি পর্যায় দেখতে পাওয়া যায়। এক : প্রাগ-বিভক্ত সমাজের স্মৃতি বহন করে এককালে বৈদিক মানুষেরাই গণপতিকে নিয়ে গান রচনা করেছিলেন। দুই : শ্রেণী-বিভক্ত সমাজের রাষ্ট্রশক্তির প্রতিনিধি হিসেবে রাজনীতির গ্রন্থে কৌটিল্য ওই গণ-সমাজের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করলেন এবং আইনের গ্রন্থে যাজ্ঞবল্ক্য প্রমুখ গণপতিকে দেখলেন বিষনজরে—কেননা, সারা ভারতবর্ষ জুড়ে সামাজিক পরিবর্তন একতালে ঘটেনি, শ্রেণীসমাজের আশপাশেই বেঁচে ছিলো প্রাক-বিভক্ত গণসমাজ। তিন : বহু বিনায়কের মধ্যে গজাননধারী একটি নির্দিষ্ট বিনায়ক সিদ্ধিদাতা দেবতা হিসেবে ঘোষিত হলেন এবং বহুভাবে তাঁর এই নব রূপটির প্রচার করা হলো। গণপতির ইতিহাসের এই তিনটি পর্যায়ের সঙ্গে আদিম সাম্যসমাজ থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি পর্যন্ত সুদীর্ঘ সমাজ-ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে। শুধু তাই নয়। সম্পর্ক রয়েছে লোকায়তিক চেতনার স্তর থেকে অধ্যাত্মবাদের বিকাশ পর্যন্ত ধ্যানধারণার ইতিহাসেরও।
