এইখানে আমরা আমাদের মূল যুক্তির আভাস দিয়ে রাখতে পারি।
আমাদের মূল যুক্তি হলো, অন্যান্য দেশের মতোই ভারতবর্ষেও রাষ্ট্রশক্তি ও শ্রেণীবিভক্ত সমাজের কাহিনী অনাদি নয়। প্রাগ-বিভক্ত সমাজের ধ্বংসস্তূপের উপরই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু সারা ভারতবর্ষ জুড়ে একসঙ্গে তা ঘটেনি। শ্রেণী-বিভক্ত সমাজের পাশেই থেকেছে প্রাগ-বিভক্ত প্রাচীন সমাজ। এমনকি, প্রাগ-বিভক্ত সমাজ যেখানে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে সেখানেও তার সমস্ত চিহ্ন নির্মূল হয়ে যায়নি।
আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো, ভারতীয় সাহিত্য ওই প্রাগ-বিভক্ত সমাজেরই নাম হলো গণ। ইংরেজী পরিভাষা অনুসারে ট্রাইব। অবশ্যই, দুর্ভাগ্যবশত এই ট্রাইব শব্দটিকে প্রায়ই এলোমেলোভাবে ব্যবহার করা হয়—মর্গান-এর আলোচনা অনুসরণ করে ওই ট্রাইব্যাল-সমাজ বা গণ-সমাজকে স্পষ্টভাবে চেনবার চেষ্টা করা হয়নি। তার বদলে সাধারণত একরকম আধো-অস্পষ্ট আদিম জীবনের চিত্রই উল্লেখ করা হয়। মর্গান-এর গবেষণা অনুসরণ করলে দেখা যায় এই গণ-সমাজের চিত্রটিকে অস্পষ্ট বা অনির্দিষ্ট মনে করবার কারণ নেই। তার বদলে এখানে সমাজসংগঠনের একটি নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট রূপ রয়েছে। শুধু তাই নয়। ওই গণ-সমাজেরও একটা ইতিহাসও আছে, বিকাশ আছে : মর্গান-এর পরিভাষা অনুসারে মধ্য-বন্য-দশা থেকে মধ্য-বর্বর-দশা পর্যন্ত। মধ্য-বর্বর-দশার পর থেকেই ওই গণ-সমাজের গড়নে ভাঙন দেখা দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই ধ্বংসস্তূপের উপরেই গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রশক্তি। এই গণ-সমাজকে আমরা প্রাগ-বিভক্ত সমাজ বলছি, কেননা, যতোদিন পর্যন্ত এই গণ-সমাজে ভাঙন দেখা দেয়নি ততোদিন পর্যন্ত শ্রেণীবিভাগেরও পরিচয় নেই—পরিচয় নেই ব্যক্তিগত সম্পত্তির, আধুনিক স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের (পরিবারের) এবং রাষ্ট্রশক্তির।
নামেই প্রমাণ, ওই গণ-সমাজের সঙ্গেই গণপতির সম্পর্ক।
কিন্তু ভারতবর্ষে রাষ্ট্রশক্তির পাশাপাশিই ওই গণ-সমাজও টিকে থেকেছে,—সারা ভারতবর্ষ জুড়ে সমাজ-পরিবর্তন একতালে ঘটেনি। রাষ্ট্রশক্তির দেখা দেবার পর তার অধিনায়কেরা আশেপাশের গণ-সমাজকে কীরকম বিষনজরে দেখেহচিলেন তার নমুনা মহাভারত এবং অর্থশাস্ত্র থেকে উদ্ধৃত করবো। আর, তাঁদের এই মনোভাবে থেকেই মূলসূত্র পাওয়া যাবে গণেশ সম্বন্ধে এককালের ওই বিদ্বেষ-বিতৃষ্ণাকে বোঝবার : যাজ্ঞবল্ক্যের বিনায়ক-আতঙ্ক আর কৌটিল্যের সংঘবৃত্ত হয়তো সম্পর্কহীন হয়। অবশ্য, এই বিঘ্নরাজ বিনায়কই যে শেষ পর্যন্ত কী করে সিদ্ধিদাতার সম্মান পেলেন সে-সমস্যা স্বতন্ত্র। গণচিত্তকে তুষ্ট করবার উদ্দেশ্যেই এই গণদেবতাকে গ্রহণ করা হয়েছিলো—এমনতরো সমাধান সহজ হলেও সন্তোষজনক নয়। কেননা, বিনায়ক এক ছিলেন না, বহু। কখনো তাঁর চেহারায় হাতির চিহ্ন, কখনো তাঁর নামে সাপের চিহ্ন, ষাঁড়ের চিহ্ন, কিংবা হয়তো আরো অন্যরকম। উদ্দেশ্যটা যদি গনচিত্তকে তোষণ করাই হয়—যদিও অবশ্য একথার অর্থ খুব স্পষ্ট নয়,—তাহলে ওই বহুবিনায়কের মধ্যে এক-বিনায়ককে কেন বেছে নেওয়া হলো সে-প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায় না। তাছাড়া, বিঘ্নরাজ বিনায়ক এবং সিদ্ধিদাতা গণেশের মধ্যে যে-মৌকিক প্রভেদ আছে তাও এই মতবাদ ঠিকমতো গ্রাহ্য করে না। তাই, গণনায়কের পক্ষে সিদ্ধিদাতা গণেশ হয়ে যাওয়ার সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন। আজকের দিনেই হয়তো এ-সমস্যার সমাধান করা যাবে না; কিন্তু তার থেকেই প্রমাণ হবে না যে, আগামীকালের উন্নততর গবেষণার ভিত্তিতেও সে-সমাধান সুদূরপরাহত থেকে যাবে। আমরা শুধু এইটুকুই দেখাবার চেষ্টা করবো যে, এই সমস্যার সঙ্গে প্রাচীন ভারতে রাষ্ট্রশক্তির অভ্যুত্থান কাহিনীর সম্পর্ক রয়েছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রাগ-বিভক্ত সমাজ ভেঙে রাষ্ট্রশক্তির অভ্যুত্থান কী করে হলো ঠিক এই বিষয়ে গবেষণা এখনো হয়নি। আজই হোক বা আগামীকালই হোক, আমাদের ঐতিহাসিকদের এ-বিষয়ে মনোনিয়োগ করতে হবে।
কিন্তু আপাতত যে-বিষয়টির দিকে বিশেষ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই : গণপতির ইতিহাসে ওই বিঘ্নরাজ-চরিতের চেয়েও পুরোনো একটি পরিচ্ছেদ আছে। তার প্রমাণ ঋগ্বেদে, তার প্রমাণ যজুর্ব্বেদ—মানবগৃহ্যসূত্র যা যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতির চেয়েও অনেক আগেকার সাহিত্য।
ঋগ্বেদের দ্বিতীয় মণ্ডলে(৯০),—অর্থাৎ, আধুনিক পণ্ডিতদের হিসেবে ঋগ্বেদের প্রাচীনতম অংশে,—দেখতে পাওয়া যায় গৃৎসমদ ঋষি গান রচনা করেছেন :
গণানাং ত্বা গণপতিং হবামহে
কবিং কবীনামুপমশ্রবস্তমম্।
জ্যেষ্ঠরাজং ব্রহ্মণাং ব্রহ্মণস্পতে
আ নঃ শ্রৃণ্বন্নূতিভিঃ সীদসাদনম্।।
অর্থাৎ,
হে ব্রহ্মণস্পতি, তুমি গণগুলির মধ্যে গণপতি, কবিগণের মধ্যে কবি, সমস্ত অন্নের উপমাস্বরূপ অন্ন যাঁদের আছে তুমি তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, জ্যেষ্ঠদের মধ্যে তুমি বিরাজমান, তুমি মন্ত্রসমূহের স্বামী। তুমি আমাদের আহ্বান শ্রবণ করে আশ্রয় প্রদানার্থ যজ্ঞস্থানে উপবেশন কর।
প্রসঙ্গক্রমে বলা যেতে পারে এই গান ছান্দোগ্যের সেই কুকুরগুলির গান মনে পড়িয়ে দেয়। কেননা, এখানেও অধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী ধ্যানধারণার পরিচয় নেই, তার বদলে এ-গানের মূলে রয়েছে অন্নকামনাই : শ্রব মানে অন্ন এবং সায়ন বলেছেন ব্রহ্মণস্পতি শব্দে ওই ব্রহ্মণ্ বলে কথাটি অন্নবাচকই : ব্রহ্মণঃ অন্নস্য পরিবৃঢ়স্য কর্মণো বা পতে পালয়িতঃ। অবশ্যই, ব্রহ্মণস্পতির অর্থ নিয়ে আমাদের পক্ষে পরে দীর্ঘতর আলোচনা তোলবার দরকার পড়বে, কেননা, দেশের ঐতিহ্য অনুসারে এই ব্রহ্মণস্পতি বা বৃহস্পতিই হলেন লোকায়ত-দর্শনের আদিগুরু। তাই, আমরা এই নামটির আলোচনায় পরে ফিরবো। আপাতত বৈদিক সাহিত্যেই গণপতির আদি-রূপটির দিকেই দৃষ্টি রাখা যাক।
