পৌরাণিক সাহিত্যে এই কাহিনী বা এই জাতীয় কাহিনী একাধিকবার পাওয়া গেলেও এর মধ্যে বাস্তবের প্রতিবিম্ব যে উল্টো হয়ে পড়েছে সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। গণেশ-সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য থেকেই তা বুঝতে পারা যায়। আমরা আগেই দেখেছি, মনুর মতে গণেশ হলেন শূদ্রদের দেবতা। পরে, উচ্ছিষ্টগণপতির আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা দেখতে পাবো, গাণপত্য সম্প্রদায়ের একটু মূল কথা হলো নারীজাতির সাম্য ও স্বাধীনতা। তাই এই গণেশই যে স্ত্রী-শূদ্রের বিরুদ্ধে বিঘ্ন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা সরাসরি স্বীকার করতে দ্বিধা হয়। ফলে, উক্ত পৌরাণিক কাহিনীর তাৎপর্য বুঝতে হলে মনে রাখা দরকার, শাসক-শ্রেণীর চেতনায় বাস্তবের প্রতিবিম্ব উল্টো হয়ে পড়ে(৮৬)। অর্থাৎ, এককালে বিঘ্ন সৃষ্টিই হলো গণেশের কাজ—কিন্তু সে-বিঘ্ন স্ত্রী-শূদ্রের বিরুদ্ধে নয়। যাজ্ঞবল্ক্যের বিনায়ক-বর্ণনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বুঝা যায় বিঘ্নটা আসলে কাদের বিরুদ্ধে।
এই প্রসঙ্গেই মনে রাখা দরকার, গণেশের বহু নামের মধ্যে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক নাম হলো, দ্বিদেহক(৮৭)। অর্থাৎ, গণেশের দুটি স্বতন্ত্র দেহ। আর সত্যিই তাই। গণেশের সত্যিই দুটি দেহ—দুটি স্বতন্ত্র জন্ম, দুটি স্বতন্ত্র সত্তা। এক, বিঘ্নরাজ। দুই, সিদ্ধিদাতা। বিঘ্নরাজটা আগেকার। সিদ্ধিদাতাটা পরের যুগের।
———————-
৭৫. Introduction to A. Getty G xxi.
৭৬. Kennedy HM 353f.
৭৭. T. G. N. Rao EHI Vol. I Part I.
৭৮. বরাহপুরাণ। cf. H. Mitra in VQ-May 1935, 105.
৭৯. শিবপুরাণ, মৎসপুরাণ ও স্কন্দপুরাণ। cf. H. Mitra op. cit. cf. A. Getty G 5.
৮০. ERE 2:808.
৮১. বিশ্বকোষ ৫:২০২।
৮২. H. Mitra op. cit. 105. cf. A. Getty G 7; T. G. N. Rao EHI Vol. I. Part I.
৮৩. মৎস্যপুরাণ, স্কন্দপুরাণ ইত্যাদি।
৮৪. ERE 2:808.
৮৫. A. Getty G 5.
৮৬. F. Engels AD 470-2.
৮৭. A. Getty G xxiv.
০৯. বিঘ্নরাজেরও আগে
গণপতির ইতিহাসে এই চিত্তাকর্ষক পরিবর্তনটি আধুনিক বিদ্বানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁরা এই পরিবর্তনের একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সে-ব্যাখ্যার মূল কথা হলো, আদিতে গণপতি ছিলেন স্থানীয় অনার্যদের দেবতা। তাই আর্যরা বা বৈদিক ঐতিহ্যের অনুগামীরা, শুরুতে এই দেবতাটিকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করেন। কিন্তু কালক্রমে তাঁরা গণেশকে গ্রহণ করে নেন। সেই কারণেই গণপতির রূপান্তর ঘটে।
এই সিদ্ধান্তের দৃষ্টান্ত হিসেবে শ্রদ্ধেয় ক্ষিতিমোহন সেন(৮৮) মহাশয়ের রচনা উদ্ধ্বৃত করা যায় : “অনার্য অনেক দবেওতাকে আর্যেরা স্বীকার না করিয়া পারেন নাই। চারিদিকের প্রভাবকে দীর্ঘকাল ঠেকাইয়া রাখা অসম্ভব। তাহার পরে গণচিত্তকে প্রসন্ন না করিলে মানুষকে যে অতিষ্ঠ হইতে হয় এই কথা প্রাচীন আর্যেরাও বুঝিতে পারিয়াছিলেন। তাই গণদেবতা গণপতির পূজা সকল যজ্ঞের অগ্রে অনুষ্ঠান করা হইত।” শ্রদ্ধেয় হরিদাস মিত্র(৮৯) মহাশয় অবশ্য গণেশকে অনার্য-উপাসিত দেবতা বলছেন না,
As Ganesa was perhaps originally the special deity of the ‘Ganas’—wild Aryan tribes, inhabiting desert wastes, mountains and forests,—he was probably in later times affiliated to ‘Pasupati’ (Sankara) and ‘Bhutapati’ (Siva); and when he was admitted to the highter Aryan pantheon, various descriptions of his origin were given in the Purans, as necessity arose. These explanations might have taken centuries to grow.
যেহেতু গণেশ আদিতে সম্ভবত বিশেষ করে গণগুলিরই—অর্থাৎ, মরুভূমি, পর্বত ও বনজঙ্গলের বুনো আর্য উপজাতিগুলিরই—দেবতা ছিলেন সেই হেতু খুব সম্ভব উত্তরযুগে তাঁকে পশুপতি (শঙ্কর) ও ভূতপতির (শিব) সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়; এবং তাঁকে যখন উচ্চতর আর্য দেবলোকে গ্রহণ করা হলো তখন প্রয়োজনের খাতিরে পুরাণে তাঁর জন্ম-সংক্রান্ত নানারকম উপাখ্যান রচনা করা দরকার হলো। এই ব্যাখ্যাগুলি গড়ে উঠবার জন্যে সম্ভবত অনেক শতাব্দী সময় লেগেছিলো।
আমাদের মন্তব্য হলো, এ-জাতীয় ব্যাখ্যায় দেবলোকের ইতিহাসকে মরলোকের ইতিহাসের প্রতিবিম্ব বলে দেখবার চেষ্টা নেই। তাই, আধুনিক বিদ্বানদের এ-জাতীয় গবেষণা দুর্মূল্য হলেও পূর্ণাঙ্গ হতে পারেনি। প্রথমত, গণেশ বলতে এককালে নির্দিষ্ট একজনকে বোঝাতো না—প্রাচীন পুঁথিপত্র থেকে প্রমাণ হয় বিনায়ক ছিলেন বহু। গণেশের নানাবিধ নামের মধ্যে দ্বিজিহ্বক, বৃষকেতন প্রভৃতি নাম দেখে সন্দেহ হয় প্রাণীজগতের মধ্যে শুধুমাত্র হাতির সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক ছিলো না, সাপ ষাঁড় প্রভৃতির সঙ্গেও সম্পর্ক ছিলো। যাঁরা গণেশকে এ-জাতীয় নামে চিনতেন যাঁরা গণেশের মূর্তি রচনা করলে আজকের দিনে আমাদের পক্ষে সেই মূর্তিগুলিকে গণেশ বলে চেনাই হয়তো দুঃসাধ্য হতো। তাই, উন্নততর আর্যেরা অনার্যদের কাছ থেকে, বা অনুন্নত আর্য উপজাতিদের কাছ থেকেই, এই গণেশকে গ্রহণ করেছিলেন—এ-জাতীয় মতবাদ স্বীকার করলেও অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়। কেন গ্রহণ করলেন? এবং, তারচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বহু বিনায়কের মধ্যে, কিংবা, বিনায়কের বহু রূপের মধ্যে ওই একটিমাত্র নির্দিষ্ট রূপই কেন গৃহীত হলো? আমরা একটু পরেই দেখতে পাবো, এই দ্বিতীয় প্রশ্নটির জবাব হয়তো আজ স্পষ্টভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, এমন হতে পারে যে, এই প্রশ্নকে অনুসরণ করেই ভারতবর্ষে রাষ্ট্রের উৎপত্তিসংক্রান্ত অমীমাংসিত সময়ার মীমাংসা অন্বেষণ করা যেতে পারে।
