—————–
৬৫. ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ এবং স্কন্দপুরাণের গণেশখণ্ড।
৬৬. বিশ্বকোষ ৫:২০২।
৬৭. ঐ : “গণপতিতত্ত্ব নামক গ্রন্থের মতে গণেশই পরব্রহ্ম”…।
৬৮. A. Getty G 5.
৬৯. Ibid—Quotations in Title pages.
৭০. A. Coomarswamy BBMFA 26 (1928) 30—“the figure of Ganesa appears suddenly and not rarely in the Gupta period.” cf. P. V. Kane HD 2:215 & 725.
৭১. JRAS April, 1898. cf. A. Coomarswamy. BBMFA 26 (1928)—30; A. Getty G. 3.
৭২. ERE 6:175.
৭৩. M. Monier-Williams SED 343: “and to denote his sagacity, has the head of an elephant.”
৭৪. R. G. Bhandarkar VS 149.
০৮. অতিকথার বিড়ম্বনা
বিঘ্নরাজকে সিদ্ধিদাতা সাজাতে হলে তাঁর একটা জমকালো জন্মকথার দরকার পড়ে। এ-চাহিদা মেটাতে গিয়ে পুরাণকারেরা রীতিমতো হিমশিম খেয়ে গিয়েছেন। তাই, আলফ্রেড ফুসে(৭৫) বলছেন, এবং ঠিকই বলছেন, গণেশের জন্মবৃত্তান্তগুলির মধ্যে অসঙ্গতি এবং বিশেষ করে অসংলগ্ন থেকেই প্রমাণ হয় এগুলি উত্তরযুগের নতুন পরিস্থিতির চাহিদা মেটাবার জন্যেই উদ্ভাবিত হয়েছে—যাঁরা উদ্ভাবন করেছিলেন তাঁরা সামান্য ব্যক্তি ছিলেন না।
উপাখ্যানগুলির মধ্যে অসঙ্গতি এবং অসংলগ্ন যে কতোদূর তা কেনেডির(৭৬) ‘হিন্দু মাইথোলজি’ বা গোপীনাথ রাও-এর(৭৭) ‘হিন্দু আইকনোগ্রাফি’ দেখলেই বুঝতে পারা যাবে,—এঁরা উভয়েই বিভিন্ন পুরাণ থেকে এ-জাতীয় বহু উপাখ্যান সংকলিত করেছেন। আমাদের যুক্তির পক্ষে মাত্র কয়েকটি নমুনা উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট হবে।
কোনো পুরাণে(৭৮) লেখা আছে, একা শিব থেকেই গণেশের জন্ম। কোনো পুরাণে(৭৯) আবার লেখা আছে, একা পার্বতী থেকেই গণেশের জন্ম। অথচ এমন নয় যে, স্ত্রী-পুরুষে মিলন বাদ দিয়ে প্রজনন-সম্ভাবনাকে পুরাণকারেরা সত্যিই স্বাভাবিক মনে করতেন। তাই, এ-জাতীয় কাহিনী থেকেই প্রমাণ হয় যে, আভিজাতিক দেবলোকে গণেশের আবির্ভাব আর যাই হোক সহজ যা স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।
ওই অস্বাভাবিক ঘটনাটিকে স্বাভাবিক বলে প্রতিপন্ন করবার একটা মস্ত অন্তরায় ছিলো গণেশের গজাননটি। তাই, গণেশের মাথা নিয়ে পুরাণকারদের মাথাব্যাথাও খুব কম নয়। এ-নিয়েও অনেক রকম অসংলগ্ন ও এলোমেলো কাহিনী পাওয়া যায়। ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণের গণেশখণ্ডে(৮০) লেখা আছে জন্মাবার পর শনির দৃষ্টিতে গণেশের মাথা উড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বিষ্ণু একটি হাতির মাথা কেটে এনে নবজাতকের কাঁধের উপর এঁটে দেন। আবার স্কন্দপুরাণের গণেশখণ্ডে(৮১) লেখা আছে, সিন্দুর বলে এক দৈত্য পার্বতীর গর্ভে অষ্টম মাসের সময় প্রবেশ করে গণেশের মাথাটি কেটে দেয় এবং শিরহীন অবস্থায় জন্মার পর নারদের অনুরোধে গণেশ গজাসুরের মাথাটি কেটে নিজের স্কন্ধে যোজনা করেন—তার মানে, গণেশের গজাননটি তাঁর নিজস্ব নয়, গজাসুরের কাছ থেকে ধার করা। কিন্তু এ-বিষয়ে সবচেয়ে আশ্চর্য পৌরাণিক কাহিনী(৮২) হলো, শিব ও পার্বতী একবার হাতির রূপে মৈথুন করেছিলেন—তাই ওই রকম গজানন সন্তানের জন্ম হয়।
কিন্তু এতোভাবে গণেশের জন্মকাহিনী রচনা করেও পুরাণকারেরা যেন কিছুতেই ভুলতে পারেন না যে, তাঁর জন্মের সঙ্গে একটা নোংরা কিছুর সম্পর্ক রয়েছে। তাই, তাঁকে পার্বতী-তনয় বলে মেনে নেওয়া সত্ত্বেও এ-কথাও বলতে যেন দ্বিধা হচ্ছে যে, পার্বতীর গর্ভে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জন্ম হয়েছিলো। পুরাণকারেরা বারবার(৮৩) বলছেন, নিজের গায়ের নোংরা নিয়ে খেলা করতে করতে পার্বতী একটি কিম্ভুত-কিমাকার শিশুমূর্তি গড়ে তোলেন এবং শেষ পর্যন্ত তারই মধ্যে প্রাণসঞ্চার করে গণেশকে সৃষ্টি করেন।
আর একটি পুরাণ(৮৪) যেন আরো এক-পা এগিয়ে যেতে চায় এবং ওই আভিজাতিক দেবলোকে গণেশের আসল আবির্ভাব-কাহিনীকে প্রকাশ করে দেবার উপক্রম। এই কাহিনী অনুসারে পার্বতী বুঝি একবার স্নানের সময় গায়ে-মাখা তেলের সঙ্গে নিজের শরীরের নোংরা মেশান এবং মালিনী বলে গঙ্গাতীরবর্তী এক গজাননা রাক্ষসীকে এই উপাদেয় বস্তুটি খাওয়ান। তারই ফলে মালিনীর গর্ভে গণেশের জন্ম হয়। তারপর পার্বতী তাঁকে গ্রহণ করেন। এই উপাখ্যানটি চিত্তাকর্ষক। কেননা, এখানে স্পষ্টই বলে দেওয়া হচ্ছে যে, গণেশের জন্মটা আসলে দেবতাদের ঘরে নয়। দেবলোকে তাঁর স্থান পোষ্য-সন্তান হিসেবেই। কেবল এই উপাখ্যানে বলে দেওয়া হয়নি যে, পোষ্য-গ্রহণের আগে সংস্কার করবার দরকার হয়েছিলো—সেই সংস্কারের ফলেই রাক্ষসকুলজাত বিঘ্নরাজ দেবলোক-লালিত সিদ্ধিদাতায় পর্যবসিত হন।
গণেশ-সংক্রান্ত পৌরাণিক কাহিনীগুলির মধ্যে আর এক রকম কাহিনীতে(৮৫) ওই বিঘ্ন-বিপর্যয়ের স্মৃতিটা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি, যদিও সে-স্মৃতি টিকে রয়েছে উল্টো হয়ে। কাহিনীটা হলো, ইন্দ্র প্রভৃতি আভিজাতিক দেবতারা একবার খুবই বিপদে পড়েছিলেন। তার কারণ, নারী ও শূদ্ররা দলে দলে সোমনাথ পাহাড়ে শিবের কাছে যাত্রা করেছিলো। এই নিকৃষ্টদের মিছিল দেখে দেবতারা বিশেষ শঙ্কিত হন। তাঁরা শিবের কাছে গিয়ে বললেন—প্রভু, ওদের এই মিছিল বন্ধ করবার জন্যে যা হোক একটা ব্যবস্থা করুন। শিব তাতে রাজি হলেন না। তাই, ইন্দ্রাদি দেবতারা গিয়ে পড়লেন পার্বতীর কাছে। পার্বতী নাকি এই মানবেতরদের মিছিলে বিঘ্ন সৃষ্টি করবার জন্যেই বিঘ্নেশ্বরকে সৃষ্টি করলেন।
