আর, অন্তত আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, গণেশকে তখন শুধুমাত্র দুর্বৃত্ত বলেই কল্পনা করা হয়নি,–তার বদলে রীতিমত রক্তকলুষ দুর্বৃত্তই। কেননা, গণেশের ওই যে হাতির মাথা জীববিজ্ঞানমতে তো তাতে দুটি গজদন্ত থাকবার কথা। শাস্ত্রমতে কিন্তু তা নয়। গণেশের দাঁত বলতে মাত্র একটি। গণেশের নামই হলো একদন্ত। এবং, এই যে মাত্র একটি দাঁত—এর রংটাও স্বাভাবিক হাতির দাঁতের মতো নয়। শাস্ত্রমতে একেবারে টকটকে লাল। ওরকম টকটকে লাল কেন? শাস্ত্রমতে, গণেশ ওই দাঁতের আঘাত বহু শত্রু বিনাশ করেছেন আর তাদেরই রক্তে স্নাত হয়ে দাঁতটার ওই চেহারা হয়েছে : দন্তাঘাতবিদারিতারিরুধিরৈঃ সিন্দুরশোভাকরং(৪৭)। কিন্তু, প্রশ্ন হলো, গণেশের অরি বা শত্রু বলতে ঠিক কে বা কারা? পুরাণে এ-প্রশ্নের রকমারি জবাব আছে। তার মধ্যে একটা জবাব আন্দাজ করা যায় গণেশের অপর দাঁতটি কী করে হারালো তারই কাহিনী থেকে। ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে(৪৮) এক রোমহর্ষক যুদ্ধের কাহিনী পাওয়া যায়—পরশুরামের সঙ্গে গণেশের যুদ্ধ। লড়াই করতে করতে পরশুরাম তাঁর হাতের কুঠারটা ছুঁড়ে মারলেন গণেশের দিকে। তারই আঘাতে গণেশের একটা দাঁত উড়ে গেলো। অবশ্যই, তাই বলে গণেশকে পরশুরামের তুলনায় দুর্বল মনে করা চলবে না। কেননা, ব্রহ্মাণ্ডপুরাণে(৪৯) বলা হয়েছে, ইচ্ছে করলে গণেশ ওই কুঠারাঘাতকে প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন। কিন্তু গণেশ দেখলেন, কুঠারটি তাঁর পিতার হাতের তৈরি, তাই কুঠারকে নিষ্ফল করলে পিতাকে অমর্যাদা দেখানো হয়। তাই পিতার মর্যাদা রক্ষা করবার জন্যেই গণেশ একটি দাঁত এগিয়ে দিয়ে কুঠারের আঘাতটা গ্রহণ করে নিলেন। অবশ্যই, এই হারজিতের কাহিনীই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক নয়। আমাদের কাছে তার চেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো এই পৌরাণিক কাহিনী থেকে গণেশের শত্রুকে চেনবার চেষ্টা। কার সঙ্গে গণেশের লড়াই? কে তাঁর ওই শত্রু ? পরশুরাম। পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে সামান্যমাত্র পরিচয় থাকলেই এই পরশুরামকে সনাক্ত করা সম্ভব। হিংসার ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের এমন জঙ্গী প্রবর্তকের কথা শাস্ত্রগ্রন্থে নিশ্চয়ই অদ্বিতীয়। এই প্রসঙ্গে ডক্টর ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের(৫০) গ্রন্থে পরশুরামের পৌরাণিক কাহিনীর সামাজিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা স্মরণীয়।
তার মানে কি এই যে, একটা বিশেষ যুগে গণেশের শত্রু বলতে ওই পুরোহিত-শ্রেণীকেই বুঝতে হবে? সে-যুগে রচিত পুরোহিত-শ্রেণীর সাহিত্যে গণেশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারও একই ইঙ্গিত দিতে চায়। কিন্তু খুব তাড়াহুড়ো করে কোনো একটা সিদ্ধন্তে পৌঁছবার তাগিদ নেই। কেননা, প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির আদালতে বিস্তর সাক্ষী-সাবুদ ভিড় করে আছে। ঐতিহাসিকেরা সবসময় তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন না, কেননা, তাহলে অপ্রিয় সিদ্ধান্তে পৌঁছবার ভয়। সে-আতঙ্ক উত্তীর্ণ হতে পারলে গণেশের পদচিহ্ন অনুসরণ করেই নানারকম আশ্চর্য সওয়াল আমরা শুনে আসতে পারবো।
আপাতত গণেশের বিরুদ্ধে সেকালের এই প্রকট ঘৃণার মনোভাবের আরো কিছুকিছু নমুনা দেখা যায়। অতুলচন্দ্র গুপ্ত(৫১) মহাশয় বলছেন, “এইজন্যেই গণেশের অনেক প্রাচীন পাথরের মূর্তিতে দেখা যায় যে, শিল্পী তাঁকে অতি ভয়ানক চেহারা দিয়ে গড়েছে”। আলফ্রেড ফুসে-ও(৫২) গণেশের কদাকার মূর্তির উল্লেখ করে শিল্পীদের মনে গণেশের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব অনুমান করতে চাইছেন। কিন্তু এমনও হতে পারে যে, গণেশের ওইসব বীভৎস চেহারার আসল তাৎপর্য অন্য। তবু এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে, ভারতীয় দেব-শিল্পের ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে গণেশের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছিলো—প্রতিমা-পরিকল্পনাতেই তার প্রকট প্রমাণ রয়েছে। কেননা, অনেক মূর্তিতেই দেখতে পাওয়া যায় গণেশ কোনো-না-কোনো আভিজাতিক দেবদেবীর পায়ের তলায় অবদলিত হয়েছেন।
বাংলা দেশেই(৫৩) পাথরের মূর্তি পাওয়া গিয়েছে যেখানে দেখা যায় গণেশ অবদলিত হয়েছেন ভ্রুকুটিতারা বা পর্ণশবরীর পায়ের তলায়। তবু তাঁর হাতে ঢাল-তলোয়ার দেখে অনায়াসেই অনুমান করা যায় বিনা যুদ্ধে তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। বিশেষ করে লক্ষ্য করা দরকার, এই মূর্তিতে গণেশের গজানন নেই—মুখটা কদাকার, কিন্তু মানুষেরই মুখ। তিব্বতে পাওয়া(৫৪) ব্রোঞ্জ-এর মূর্তিতে দেখি দেবতা মহাকাল গণেশকে পায়ের তলায় দলছে। মঞ্জুশ্রীর পায়ের তলায় অবদলিত অবস্থায় গণেশের মূর্তিও একান্ত দুর্লভ নয়। তার চেয়েও চিত্তাকর্ষক হলো আর এক রকম মূর্তি(৫৫) যেখানে গণেশকে দেখানো হয়েছে বিঘ্নহন্তা বলে এক দেবতার পায়ের তলায়। নামেই প্রমাণ, বিঘ্নকে জয় করবার কল্পনা থেকেই বিঘ্নহন্তার জন্ম—এই মূর্তিতে বিজিত গণেশ তাই সাক্ষাৎ বিঘ্নই। নেপালের উপকথায়(৫৬) এই বিঘ্নহন্তার যে বৃত্তান্ত পাওয়া যায় তা থেকেও প্রমাণিত হয় বিঘ্ন বলতে এখানে গণেশই।
আপত্তি উঠবে, উল্লেখিত দেবদেবীরা জাতে বৌদ্ধ। তাই মূর্তিগুলির সাক্ষ্য এই কথাই প্রমাণ করে যে, বৌদ্ধ ধর্মের কর্তারা এককালে বিষনজরে দেখেছিলেন। এবং, গণেশের প্রতি বৌদ্ধ দেবদেবীদের এই আচরণ হিন্দু-বৌদ্ধ সংঘাতের ইঙ্গিত হয়তো দিতে পারে, কিন্তু সাধারণভাবে গণেশের বিরুদ্ধে শাসক-সম্প্রদায়ের প্রতিবন্ধ কী করে প্রমাণ করবে?
