উত্তরে বলবো, ভাস্কর্যের ভাষায় এই যে গণেশ-দলন কাহিনী পাওয়া যাচ্ছে তার নায়ক-নায়িকারা হিন্দুস্বর্গের বাসিন্দাই হোন আর বৌদ্ধস্বর্গের বাসিন্দা হোন, আমাদের মূল যুক্তির পক্ষে তাতে খুব বড়ো তফাত হয় না। কেননা, মর্তের প্রতিবিম্ব হিসেবে এঁদের সকলের জাত একই। অর্থাৎ, হিন্দু দেবতাদের মতো এঁরাও হলেন মানবসমাজের আভিজাতিক-শ্রেণীর প্রতিনিধি। মহাকালের কথাটাই ভেবে দেখা যাক। দেবলোকের বাসিন্দা হলেও মরলোকের আভিজাতিক-শ্রেণীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে এতোটুকুও সন্দেহের অবকাশ নেই। শান্তি আর শৃঙ্খলার রক্ষক হিসেবেই তাঁর পরিচয়(৫৭)। তাছাড়া, নজর করলেই দেখা যায় তাঁর হাতে একটি মোহরের থলি রয়েছে : চৈনিক পর্যটক ঈ-সীন(৫৮) বলছেন, ভারতবর্ষে অধিকাংশ মঠের দোরগোড়ায় তিনি এক দেবমূর্তি দেখে গিয়েছেন, তাঁর হাতে স্বর্ণমুদ্রার থলি আর তাঁরই নাম হলো মহাকাল। ভারতবর্ষের বাইরেও আভিজাতিক-শ্রেণীর সঙ্গে মহাকালের সম্পর্কটা অস্পষ্ট নয় : মঙ্গোলিয়ার শাসক আল্টন খাঁ হুকুম জারি করেছিলেন, মহাকালই হবেন দেশের এক এবং অদ্বিতীয় দেবতা, তাঁরই খাতিরে বাকি সব দেবমূর্তি পুড়িয়ে ফেলতে হবে(৫৯)। তাই বৌদ্ধস্বর্গের বাসিন্দা এই মহাকাল যখন গণেশকে পদদলন করছেন তখন তাঁর সঙ্গে হিন্দুসমাজের আইনকর্তা যাজ্ঞবল্ক্যের দৃষ্টিভঙ্গির খুব বেশি তফাত খুঁজতে যাওয়াটা ভুল হবে। আইনকর্তাদের কথাটা যখন উঠলোই তখন তা শেষ করে নেওয়াই ভালো। মনু নাকি বলেছেন, গণেশ ব্রাহ্মণদের দেবতা নন, ক্ষত্রিয়দের দেবতা নন, এমনকি বৈশ্যদেরও দেবতা নন—তার বদলে শুধুমাত্র শূদ্রদের দেবতাই :
বিপ্রাণাং দৈবতং শম্ভুঃ ক্ষত্রিয়াণাং তু মাধবঃ।
বৈশ্যানাং তু ভবেৎ ব্রহ্মা শূদ্রানাং গণনায়কঃ।।
–অর্থাৎ, ব্রাহ্মণদের দেবতা হলেন শম্ভু, ক্ষত্রিয়দের মাধব, বৈশ্যদের ব্রহ্মা আর শূদ্রদের গণনায়ক। অবশ্যই এই শ্লোকটি মনুস্মৃতিতে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু উইলসন থেকে অক্ষয়কুমার দত্ত(৬০) পর্যন্ত দেশ-বিদেশের পণ্ডিতেরা একবাক্যে বললেন, দেশের ঐতিহ্য অনুসারে শ্লোকটি মনুরই রচনা।
প্রশ্ন হলো, শূদ্র মানে কী? যাদের চোখে জল(৬১), শ্রমের দায়িত্ব যাদের উপর,—অর্থাৎ, শঙ্করাচার্যের ভাষায় যারা হলো ওই প্রাকৃতজনাঃ বা পণ্ডিত জবাহরলাল নেহেরুর ভাষায় যারা হলো কিনা ‘unthinking masses’—তারাই শূদ্র। এরা এলো কোথা থেকে—সে প্রশ্ন নিয়ে ডক্টর ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত(৬২) সুদীর্ঘ আলোচনা করেছেন। কিন্তু আমাদের যুক্তির বর্তমান পর্যায়ে বিশেষভাবে জরুরী প্রশ্ন হলো, মনু ওই গণনায়ককে যাদের দেবতা বলেছেন তাদের প্রতি শাসকসমাজের মনোভাবটা কী রকম? অতুলচন্দ্র গুপ্ত(৬৩) বলছেন :
‘বাংলা ছিলো সোনার বাংলা, তা তো বটেই। কিন্তু বলে ছিলো? কলকারখানা ম্যাঞ্চেস্টারের কাপড় আসবার পূর্ব পর্যন্ত কি? সেই সময়েই তো ছিয়াত্তুরের মন্বন্তর। তাতে নাকি সোনার বাংলার একপোয়া লোকের উপর না খেয়ে মরেছিলো! মোগল পাঠানের আমলে বোধ হয়? বিদেশীদের বর্ণনা, আবুল ফজলের গেজেটিয়ার, মুকুন্দরামের কবিতা রয়েছে। গোলায় ধান, গোয়ালে গরু, অবশ্যই ছিলো—এখনও আছে। কিন্তু এখনকার মতো তখনো সে গোলা আর গোয়ালের মালিক অল্প ক’জনাই ছিলো।…তবে হিন্দুযুগে নিশ্চয়। কিন্তু সে যুগেও কি এখনকার মতো দেশে শূদ্রই ছিলো বেশি? তাদের standard of living তো মনু বেঁধে দিয়েছেন :
উচ্ছিষ্টমন্নং দাতব্য জীর্ণানি বসনানি চ।
পুলাকাশ্চৈব ধান্যানাং জীর্ণাশ্চৈব পরিচ্ছদাঃ।।ঋষি গৌতমেরও ঐ ব্যবস্থা : জীর্ণান্যুপানচ্ছত্রবাসাঃ—কূর্চ্চান্যুচ্ছিষ্টাশনং। পুরোনো জুতো, ভাঙা ছাতা, জীর্ণ কাপড় তাদের পোষাক পরিচ্ছদ, ছেঁড়া মাদুর তাদের আসন, উচ্ছিষ্ট অন্ন তাদের আহার। ‘পুলাক’ কথাটার অর্থ ধানের আগড়া; টীকাকারদের ভাষায় ‘অসার ধান’। দেশে গোলাভরা ধান থাকলেও দেশবাসীর বেশির ভাগের কপালে খুদকূঁড়ো জুটতে কোনও আটক নেই।
মনে রাখা দরকার, মনুর মতে এ-হেন শূদ্রদের সঙ্গেই গণেশের সম্পর্ক। ঐহিত্যনির্ণীত মনুর ওই উক্তিটি মনে না রাখলে মনুস্মৃতিরই অন্য উক্তি বুঝতে অসুবিধে হবে। মনুস্মৃতিতে(৬৪) লেখা আছ, যারা গণযাগ করে শ্রাদ্ধবাড়িতে তাদের প্রবেশ নিষেধ :
স্বক্রীড়ী শ্যেনজীবী চ কন্যাদূষক এব চ।
হিংস্রো বৃষলবৃত্তিশ্চ গণাগাংশ্চৈব যাজকঃ।।
আধুনিক পণ্ডিতেরা এই ‘গণানাংশ্চৈব যাজকঃ’ কথাটা নিয়ে রীতিমতো অসুবিধেয় পড়েন। অসুবিধের কারণ এই নয় যে, টীকাকারেরা ও-কথার তাৎপর্য নির্ণয়ে সত্যিই ঔদাসীন্যের পরিচয় দিয়েছেন। মেধাতিথি বলছেন, গণানাং দেবানাঞ্চ যাজকঃ—গণযাজাঃ প্রসিদ্ধাঃ। কুল্লুকভট্ট আরো পরিষ্কার করে বলছেন, বিনায়কাদি-গনযাগকৃৎ। সোজা কথায়, গাণপত্য বা গণেশ-সম্প্রদায়ের লোক। অথচ, আজকের আবহাওয়ায় সমস্ত রকম পূজা-পার্বণের বেলায় গণেশকেই সর্বপ্রথম পূজো পেতে দেখে মনুর এই সহজ কথাটিকে সহজ অর্থে গ্রহণ করা কঠিন। অথচ মনুস্মৃতি থেকেই প্রমাণ যে, এককালে গণযাজকদের স্বক্রীড়ী, শ্যেনজীবী আর কন্যাদূষকদের সমান নিন্দনীয় মনে করা হতো।
——————
৩১. শিক্ষা ও সভ্যতা ১৪৪।
৩২. R. G. Bhandakar VS 147.
৩৩. Ibid.
৩৪. Ibid.
৩৫. মানবগৃহ্য সূত্র ২.১৪।
৩৬. cf. R. G. Bhandakar VS 145.
৩৭. মানবগৃহ্য সূত্র ২.১৪।
৩৮. P. V. Kane HD 2:xi.
৩৯. P. V. Kane প্রভৃতি গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।
৪০. যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি ১.২৭১-৬।
৪১. পঞ্চানন তর্করত্ন : ঊনবিংশসংহিতা ১৫৭।
৪২. শিক্ষা ও সভ্যতা ১৪৪।
৪৩. যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি ১.২৯৩ ইত্যাদি।
৪৪. বিশ্বকোষ ৫:২০২।
৪৫. M. Monier-Williams op. cit. 343.
৪৬. বৌধায়ন ২.৫.৮৩-৯০ ।। SBE 14:254. cf. P. V. Kane op. cit 2:213.
৪৭. বিশ্বকোষ ৫:২০২।
৪৮. ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ : গণেশখণ্ড।।
৪৯. T. A. G. Rao EHI 1:60.
৫০. B. N. Datta SISP 13.
৫১. শিক্ষা ও সভ্যতা ১৪৪।
৫২. Introduction to A. Getty G xv.
৫৩. A Getty G Plates xix & xxiii (a) & (b).
৫৪. Ibid 43.
৫৫. Ibid Plates xviii (a) & (d).
৫৬. Ibid 43.
৫৭. A. Getty GNB 160-1.
৫৮. Ibid.
৫৯. Ibid.
৬০. H. H. Wilson RSH.
৬১. B. N. Datta SISP 28. “It is said that the words Sudra means ‘one who grieves’”…
৬২. Ibid 28ff.
৬৩. শিক্ষা ও সভ্যতা ১৪০।-১।
৬৪. মনু ৩.১৬৪।
০৭. বিঘ্নরাজ থেকে সিদ্ধিদাতা
শাসকসম্প্রদায়ের মুখপাত্ররা এককালে গণেশের প্রতি যে-বিদ্বেষ প্রকাশ করেছিলেন তার আরো কিছু নমুনা সংগ্রহ করা অসম্ভব নয়। কিন্তু গণেশের অভিজ্ঞাওতাতেই তার চেয়েও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটতে দেখা গিয়েছে। কেননা, এককালে যিনি ছিলেন ওই রক্তকলুষিত বিঘ্নরাজ আর এককালে তিনিই খোদ সিদ্ধিদাতা সেজে বসলেন, সমাজের সদরমহল এককালে যাঁর ভয়ে আতঙ্কিত ছিলো আর এককালে দেখা গেলো তাঁকেই বরণ করে নিচ্ছে আভিজাতিক দেবদেবীদের জমকালো সভায়।
