প্রথমেই মনে রাখা দরকার, গণেশ এক নয়, বহু। মহাভারতে(৩২) গণেশ বা গণপতি প্রসঙ্গে বহুবচনের প্রয়োগ দেখা যায় এবং স্যর ভাণ্ডারকর(৩৩) মনে করিয়ে দিচ্ছেন শতরুদ্রীয়-তে যেরকম বহু ক্ষেত্রে বিদ্যমান বহু রুদ্রের কথা রয়েছে মহাভারতেও তেমনি বহু ক্ষেত্রে বিদ্যমান বহু গণপতির কথাই বলা হয়েছে। এবং, শুধুই যে গণেশ বহু তাই নয়, তাঁর নামও বহু। আধুনিকপন্থী বা প্রাচীনপন্থী কোনো পণ্ডিতই অস্বীকার করবেন না যে, অথর্বশিরস-উপনিষদ(৩৪), মানবগৃহ্যসূত্র(৩৫), যাজ্ঞবল্ক্য-সংহিতা(৩৬) প্রভৃতি বইতে বিনায়ক বলে যাঁদের উল্লেখ করা হয়েছে তাঁরা ওই গণপতি ছাড়া আর কেউই নন। প্রশ্ন হলো, ওই পুঁথিপত্রগুলিতে এই গণপতিদের প্রতি কী রকম মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে?
মানবগৃহ্যসূত্র(৩৭) থেকেই শুরু করা যাক। আধুনিক পণ্ডিতদের হিসেবে(৩৮) যীশুখ্রীষ্ট জন্মাবার অন্তত চার শ’ বছর আগে এই পুঁথি রচিত হয়েছিলো। এবং, এই পুঁথিতে গ্রন্থকার গণেশদের এক অতি আতঙ্কজনক ছবি এঁকেছেন। গণেশদের বা বিনায়কদের দৃষ্টি পড়লে যে কতোরকম ভয়াবহ মানসিক অবস্থা সৃষ্ট হয় তারই ফর্দ দিয়ে তিনি আলোচনা শুরু করছেন। এই ফর্দের মধ্যে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন থেকে কঠিন উন্মাদরোগ পর্যন্ত কিছুই বাদ পড়েনি। কিন্তু শুধু ওই রকম মনোবিকার সৃষ্টি করেই গণেশরা ক্ষান্ত নন। তাঁদেরই প্রভাবে রাজার ছেলে রাজ্যলাভে উপযুক্ত হলেও রাজ্য পায় না, কুমারী বিবাহযোগ্যা হলেও তার বর জোটে না, সন্তানবতী হবার উপযুক্ত হলেও নারীর সন্তান হয় না, কিংবা, যার সন্তান আছে তার সন্তান-বিয়োগ ঘটে। বিদ্বান আচার্যের শিষ্য জোটে না, শিষ্যদের বিদ্যালাভ হয় না। কৃষি ও বানিজ্য উচ্ছন্নে যায়।
তখনকার কালের মানুষদের সুখসম্ভোগের সম্বাবনা যে-রকম সংকীর্ণ তার অনুপাতে সর্বনাশের তালিকাটা নিশ্চয়ই এর চেয়ে বড়ো হতে পারতো না। এবং, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, তখনকার কালে যাঁদের হাতে শাসনক্ষমতা তাঁদেরই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে এই গৃহ্যসূত্রগুলির(৩৯) মধ্যে। তার মানে, গণেশদের প্রতি উপরোক্ত মনোভাবকে সে-যুগের শাসকশ্রেণীর মনোভাবই বলতে হবে। এবং, এ-মনোভাব যে খুবই সাময়িক ছিলো না তারও প্রমাণ আছে। কেননা, মানবগৃহ্যসূত্রের বেশ কয়েক শ’ বছর পরে যাজ্ঞবল্ক্য আইনের যে-বই লিখলেন(৪০) তার মধ্যেও গণেশদের প্রতি হুবহু একই মনোভাবে :
বিনায়কঃ কর্মবিঘ্নসিদ্ধ্যররথং বিনিযোজিতঃ।
গণানামাধিপত্যে চ রুদ্রেণ ব্রহ্মণা তথা।।
তেনোপসৃষ্টো যন্তস্য লক্ষণানি নিবোধত।
স্বপ্নে ইবগাহতে ইত্যর্থং জলং মুণ্ডাংশ্চ পশ্যতি।।
কাষায়বাসসশ্চৈব ক্রব্যাদাংশ্চাধিরোহতি।
অন্ত্যজৈর্গর্দ্দভৈরুষ্ট্রৈঃ সহৈকত্রাবতিষ্ঠতে।।
ব্রজন্তঞ্চ তথাত্মানং মন্যতেহনুগতং পরৈঃ।
বিমনা বিফলারম্ভঃ সংসাদত্যনিমিত্ততঃ।।
তেনোপসৃষ্টৌ লভতে ন রাজ্যং রাজনন্দনঃ।
কুমারী ন চ ভর্ত্তারমপত্যং ন চ গর্ভিনী।।
আচার্যত্বং শ্রোত্রিয়শ্চ ন শিষ্যোহ-ধ্যয়নং তথা।
বণিগ্লাভং চাপ্নোতি কৃষিঞ্চৈব কৃষীবলঃ।।পঞ্চানন তর্করত্ন মহাশয়(৪১) তর্জমা করছেন : ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর, বিনায়ককে কর্মবিঘ্নের জন্য এবং গণদিগের আধিপত্যে নিযুক্ত করিয়াছেন। তিনি যাহার উপর উপসর্গ করেন তাহার লক্ষণ বলিতেছি, শ্রবণ কর। যে ব্যক্তি যেন জলে অবগাহণ করিতেছে, কাষায়বাস মুণ্ডিতমুণ্ড ব্যক্তিগণকে দেখিতেছে, আমমাংসাশী মৃগাদিতে আরোহণ করিতেছে, এবং চণ্ডালাদি অন্তজজাতি গর্দভ ও উষ্ট্রের সহিত একত্র অবস্থান করিতেছে, দৌড়িতে চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু ইচ্ছামতো দৌড়িতে না পারায় পশ্চাদনুগামী শত্রুর করকবলিত হইতেছে, এইসকল স্বপ্ন দেখিতে পায়। আর সর্বদাই অন্যমনস্ক থাকে, আরদ্ধ কোনো কার্যই সিদ্ধ হয় না এবং বিনা কারণে বিষন্ন হয়। তাঁহার (বিনায়কের) উপসর্গ হইলে রাজকুমার রাজ্যলাভ করিতে পারে না; কুমারী অভিলষিত স্বামী প্রাপ্ত হয় না; গর্ভবতী স্ত্রী অপত্যলাভে বঞ্চিত থাকে; ঋতুমতী স্ত্রীর গর্ভ হয় না। শ্রোত্রিয় আচার্যতা, শিষ্য অধ্যয়ন, বণিক লাভ এবং কর্ষক কৃষিফল প্রাপ্ত হয় না।
ভয়াবহ চিত্র, সন্দেহ নেই। “এবং”, অতুলচন্দ্র গুপ্ত(৪২) মনে করিয়ে দিচ্ছেন, “গণেশের যে-পূজা তা ছিলো এই ভয়ঙ্কর দেবতাটিকে শান্ত রাখার জন্য; তিনি কাজকর্মের উপর দৃষ্টি না দেন, সে-জন্য ঘুষের ব্যবস্থা”। এই ঘুষের ব্যবস্থাটি যে কতোখানি ফলাও তার পরিচয় যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি(৪৩) থেকেই পাওয়া যায়।
প্রাচীনকালের আইনের বইতে গণেশের প্রতি এই যে-মনোভাবটি প্রকাশ পেয়েছে তার কথা মনে না রাখলে গণেশের কয়েকটি পুরোনো নামের তাৎপর্য বুঝতে পারাই সম্ভব নয়। নানা রকম পুঁথিপত্রে(৪৪) এই নামগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। নমুনা : বিঘ্নেশ, বিঘ্নকৃৎ, বিঘ্নেশ্বর, বিঘ্নরাজ, ইত্যাদি। চলতি কথায়, ‘যতো নষ্টের গোড়া’—ট্রাবল-মেকার। দুর্বৃত্তদের পাণ্ডাও বলতে পারেন। অবশ্যই, পরের যুগের পরিবর্তিত আবহাওয়ায় গণেশ সম্বন্ধে অন্য রকম ধারণা দেখা দিলো। এবং, এই পরবর্তী ধারণার বশবর্তী হয়ে আধুনিক পণ্ডিতেরা ওই প্রাচীন নামগুলির ভুল ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করলেন। তাঁরা বলতে চাইলেন, বিঘ্ন দূর করবার ক্ষমতা গণেশের, বাধাবিঘ্নের শক্তি গণেশের কাছে নতজানু—তাই তিনি বিঘ্নের অধিপতি, বিঘ্নেশ। দুর্বৃত্ত বলে বিঘ্নরাজ নন, দুর্বৃত্তদের দমন করেন বলেই বিঘ্নরাজ। এই জাতীয় ব্যাখ্যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ মনিয়ার-উইলিয়ামস-এর(৪৫) রচনায় : বিঘ্ন দূর করতে পারেন বলেই গণেশের ওই রকম নাম আর তাইজন্যেই সমস্তরকম ক্রিয়াকর্মের শুরুতে নমো গণেশায় বিঘ্নেশ্বরায় বলে প্রণাম করবার প্রথা রয়েছে। কিন্তু মনিয়ার-উইলিয়ামস-এর এই ব্যাখ্যা যে মনগড় তার প্রমাণ আছে। বিঘ্নকৃত বলে নামটির তাৎপর্য বিঘ্ন দূর করা নয়, বিঘ্ন সৃষ্টি করাই। বৌধায়ন-ধর্মসূত্রে(৪৬) গণেশের কয়েকটি চিত্তাকর্ষক নামের মধ্যে একটি হলো বিঘ্ন এবং শুধু বিঘ্ন। এবং, আমরা একটু আগেই দেখেছি, যাজ্ঞবল্ক সরাসরি বলছেন যে, বিঘ্নসাধন করবার জন্যেই বিনায়কেরা নিযুক্ত আছেন। তাই মানতেই হবে যে, এককালে গণেশকে শুধু দুর্বৃত্ত বলেই দেখবার চেষ্টা করা হয়েছিলো, দুর্বৃত্ত-দলনের কথাটি অর্বাচীন।
