মিসিসিপি নদীর পূব-কিনারায় রেড-ইণ্ডিয়ানরা ছিলো নিম্ন-বর্বর-দশায়।
নিউ মেক্সিকো, মেক্সিকো, মধ্য-আমেরিকা ও পেরুর নানা উপজাতিদের দেখা গেলো মধ্য-বর্বর-দশায়(১৩৪)।
এরপর উচ্চ-বর্বর-দশার কথা। মর্গান বলছেন, সে-দশার পরিচয় পাওয়া যায় হোমারের যুগের গ্রীকদের মধ্যে, রোম স্থাপিত হবে মুখোমুখি সময়কার লাতিন জাতিগুলির মধ্যে এবং সিজারের সময়কার জার্মানদের মধ্যে। এই উচ্চ-বর্বর-দশার আওতা পেরিয়েই সভ্যতার শুরু। অতএব মর্গান সিদ্ধান্ত করছেন :
Commencing, then, with Australians and Polynesians following with the American Indian tribes, and concluding with the Roman and Grecian, who afford the highest exemplifications respectively of the six great stages of human progress, the sum of their united experiences may be supposed fairly to represent that of the human family from the Middle Status of savagery to the end of ancient civilization. Consequently, the Aryan nations will find the type of the condition of their remote ancestors, when in the Lower Status of barbarism, in that of the partially village Indians of America; and when in the Middle Status, in that of the Village Indians with which their own experience in the Upper Status directly connects. So essentially identical are the arts, institutions and mode of life in the same status, upon all the continents, that the archaic form of the principal domestic institutions of the Greeks and Romans must even now be sought in the corresponding institutions of the American aborigines,……
In studying the condition of tribes and nations in these several ethnical periods we dealing, substantially, with the ancient history and condition of our own remote ancestors.(১৩৫)
অর্থাৎ, মানুষের অগ্রগতির ছ’টি প্রধান স্তরের প্রকৃষ্টতম নিদর্শন পাওয়া যায় অস্ট্রেলিয় ও পলিনেশিয়দের থেকে শুরু করে আমেরিকার রেড ইণ্ডিয়ানদের অনুসরণ করে রোমান ও গ্রীকদের কথায় শেষ করলে; এদের মিলিত অভিজ্ঞতাকে মধ্য-বন্য-দশা থেকে শুরু করে প্রাচীন সভ্যতার শেষ পর্যন্ত মানবগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার পরিচায়ক বলা যায়। অতএব আর্যজাতিগুলি তাদের সুদূর পূর্বপুরুষদের বন্য-দশার অবস্থাটা দেখতে পাবে আমেরিকার আংশিকভাবে গ্রামবাসী রেড-ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে; মধ্য-বর্বর-দশার অবস্থাটা দেখতে পাবে গ্রামবাসী রেড-ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে—এদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আর্যজাতিগুলির উচ্চ-বর্বর-দশার অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। সমপর্যায়ের মানুষদের মধ্যে শিল্প, সমাজ-সংগঠন ও জীবন-যাপন পদ্ধতি সমস্ত মহাদেশের বেলাতেই এমন মৌলিকভাবে অভিন্ন যে, গ্রীক ও রোমানদের গার্হস্থ্য-ব্যবস্থার আদিম রূপটিকে এখনো খুঁজতে হবে আমেরিকার আদিবাসীদের অনুরূপ ব্যবস্থার মধ্যে…
নৃতত্ত্বমূলক এই বিভিন্ন পর্যায়গুলিতে যে-সব বিভিন্ন জাতি-উপজাতি রয়েছে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে আমরা নিজেদের পূর্বপুরুষদের প্রাচীন ইতিহাস এবং অবস্থার কথাও পর্যালোচনা করবো।
তাই, আদিবাসী-সংগ্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য আহরণের কাজে নিজের প্রায় পুরো জীবনটিকে উৎসর্গ করে হেনরি লুইস মর্গান প্রাচীন সাহিত্যের তোরণদ্বার খোলবার চাবিকাঠি আমাদের হাতে দিয়ে গিয়েছেন।
মর্গানের এই মূল সিদ্ধান্তগুলি মরে রেখে প্রাচীন যুগের ইতিহাস-রচনা সংক্রান্ত সাধারণ সমস্যার আলোচনায় ফিরে আসা যাক।
পিছিয়ে-পড়া মানুষদের দিকে এইভাবে চেয়ে দেখলে যদি সত্যিই এগিয়ে-যাওয়া মানুষদের অতীত ইতিহাসটাকে প্রত্যক্ষভাবে জানতে পারা সম্ভবপর হয় তাহলে প্রাচীন ইতিহাস-সংক্রান্ত প্রত্নতত্ত্বমূলক ও সাহিত্যমূলক পরোক্ষ উপাদানগুলিকে এই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের আলোয় যাচাই করে নিলে নিশ্চয়ই আমাদের সিদ্ধান্ত অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হবে।
অধ্যাপক জর্জ টমসন(১৩৬) তাই বলছেন, পুরাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্ব—বিজ্ঞানের এই দুটি শাখার মধ্যে সমন্বয় আনতে হবে। নৃতত্ত্বের সাহায্য পুরাতত্ত্বের আবিষ্কারকে কী ভাবে বুঝতে পারা সহজসাধ্য হয় তিনি তার একটি নমুনা দিচ্ছেন। পুরাতত্ত্ববিদেরা মাটি খুঁড়ে প্রাচীন ড্যানিউব-সংস্কৃতি সম্বন্ধে একটি তথ্য আবিষ্কার করলেন : দেখা গেলো সে-সংস্কৃতির মানুষেরা অনেকখানি এলাকা জুড়ে একের পর এক বাসস্থান গড়ে তুলেছিলো, কিন্তু কোনো বাসস্থানেই তারা বেশিদিন ধরে একটানা বাস করে নি। ঘটনাটির ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে আফ্রিকার নানা জায়গায় আজো যে-সব আদিবাসীরা রয়েছে তাদের কাছ থেকে। তারা আবাদী জমির পাশে বাসস্থান গড়ে এবং যতোদিন পর্যন্ত না জমির উর্বরতা একেবারে উজোড় হয়ে যায় ততোদিন তারা সেইখানেই চাষবাস করে। তারপর তারা সেই বাসস্থান পরিত্যাগ করে চলে যায়; অন্যত্র নতুন বাসস্থান গড়ে তোলে।
অবশ্যই, গর্ডন চাইল্ড(১৩৭) প্রমুখ কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, পুরাতত্ত্বের সঙ্গে এইভাবে নৃতত্ত্বের সমন্বয় ঘটিয়া প্রাচীন মানুষদের সমাজ-জীবন ও ধ্যানধারণার কথা অনুমান করবার চেষ্টা সঙ্গত নয়। সমস্যাটা কী, এবং এঁদের আপত্তিটা ঠিক কেন প্রথমে তাই দেখা যাক। ধরুন, পুরাতত্ত্বের গাঁইতি এক জায়গায় দশ হাজার বহচর আগেকার কোনো একদল মানুষ সম্বন্ধে এমন চিহ্ন আবিষ্কার করলো যা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় তাদের জীবন-যাপন নির্ভর করতো শিকারের উপর। এদিক, নৃতত্ত্ববিদ সংবাদ দিলেন শিকারজীবী মানুষের দল আজো পৃথিবীর এখানে-ওখানে টিকে রয়েছে এবং তাদের সমাজ-সংগঠন ও ধ্যানধারণা সংক্রান্ত তথ্য প্রত্যক্ষভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু, তাই বলে কি এ-কথা দাবি করা সঙ্গত হবে যে, ওই দশ হাজার বছর আগেকার মানুষদের সমাজ-জীবন ও ধ্যানধারণা আজকের এই মানুষদের অনুরূপই ছিলো? গর্ডন চাইল্ড বলেছিলেন, এ-জাতীয় অনুমান সঙ্গত নয়। কেননা, আজকের ওই শিকারজীবীরা যদিও উৎপাদন-পদ্ধতির দিক থেকে অতোখানি পেছিয়ে পড়ে রয়েছে তবুও তাই বলে এ-কথা নিশ্চয়ই প্রমাণ হয় না যে, তাদের মানসিক বিকাশও ওই দশ হাজার বছর আগেকার মানুষদের মনোবিকাশের পর্যায়েই একেবারে নিশ্চল হয়ে গিয়েছে।
