এই রকমেরই একটা যুক্তি দেখিয়ে সেকালে অধিকার-ভেদের(১৩২) কথা বলা হতো। আর আমাদের বলবার কথাটিও শুরু ঠিক এইখান থেকেই। এবং ওই কথাটি পাড়বার আশাতেই আমরা ছান্দোগ্য-উপনিষদের একটি আপাত-অর্থহীন অংশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করেছি। সে-অংশের ভাষা অপেক্ষাকৃত সরল। কিন্তু শব্দার্থ পাবার পরও অংশটি অনেকাংশে দুর্বোধ্য বা অবোধ্য থেকে যায়।
কেননা, আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রাচীনদের এই রচনাটি বোঝবার কোনো উপায় নেই। বুঝতে হলে প্রাচীনদের দৃষ্টিভঙ্গিটা গ্রহণ করবার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা আধুনিক যুগে জন্মগ্রহণ করেছি, আধুনিক ধ্যানধারণায় লালিত হয়েছি—তার প্রভাব মুক্ত হয়ে প্রাচীনদের দৃষ্টিকোণটা গ্রহণ করবো কেমনে করে?
এই সমস্যারও সমাধান আছে। সমাধানটা বোঝবার জন্যে প্রধানত দুটি কথা মনে রাখা দরকার।
এক : মানুষের ধ্যানধারণা আকাশ থেকে জন্মায় না; সেগুলির উৎসে রয়েছে মানুষের বাস্তব সমাজ-জীবন। তাই প্রাচীনদের দৃষ্টিকোণটা বোঝবার ব্যাপার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথনির্দেশ পাওয়া যাবে প্রাচীন সমাজ-জীবন সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা থেকেই।
দুই : কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রাচীনকালের ঐ সমাজ-জীবন সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে কেমন করে? বহু শতাব্দী আগেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছেন। তাই, তাঁরা ঠিক কী ভাবে বাঁচতেন তা তো আর আমাদের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে জানা সম্ভবপর নয়। এ-বিষয়ে বড়ো জোর কিছুকিছু পরোক্ষজ্ঞান পাওয়া যায়। বহু শতাব্দীর সঞ্চিত ধুলো সরিয়ে তাঁদের কীর্তির কিছুকিছু চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এবং এই চিহ্নগুলি থেকে তাঁদের জীবনযাপন সম্বন্ধে কিছু কথা অনুমান করতে পারা অসম্ভব নয়। তাছাড়া, প্রাচীনেরা যে-সব সাহিত্যাদি রচনা করে গিয়েছেন সেগুলি থেকেও তাঁদের সমাজ-জীবনের কিছুটা চিত্র খুঁজে পাওয়া নিশ্চয়ই সম্ভবপর।
কিন্তু প্রত্নতত্ত্বমূলক উপাদানই হোক আর সাহিত্যিক উপাদানই হোক—শেষ পর্যন্ত তা পরোক্ষ। তাই, প্রত্যক্ষভাবে প্রাচীন সমাজকে চেনবার যদি কোনো পথ থাকতো তাহলে এই পরোক্ষ উপাদানগুলিকে তারই আলোয় আরো স্পষ্টভাবে, আরো নির্ভুল ও নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করবার উপায় পাওয়া যেতো।
এবং ঠিক এইখানেই হেনরি লুইস মর্গানের গবেষণা সত্যিই যুগান্তকারী। মর্গানের আবিষ্কারের একটা কথা হলো, আমাদের পক্ষে আজো ওই প্রাচীন সমাজকে স্বচক্ষে দেখতে পাওয়া সম্ভব। অনেক শতাব্দী আগেও আমাদের পূর্বপুরুষেরা ঠিক কী ভাবে জীবন-যাপন করতেন তা আজকের দিনেও আমাদের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে জানবার একটা উপায় রয়েছে। আর, মর্গানের এই দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে এই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের সাহায্যেই প্রত্নতত্ত্বমূলক বা সাহিত্যমূলক ওই পরোক্ষ দলিলগুলিকে আরো নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করবার অবকাশ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। তাই, মর্গানের মূল দাবিটিকে ভালো করে বোঝা দরকার।
সারা পৃথিবীর বুক জুড়ে সমস্ত মানুষের উন্নতিই সমান তালে হয়নি। কোথাও বা মানুষ এগিয়ে গিয়েছে অনেক দূরে, কোথাও বা মানুষ পড়ে রয়েছে অনেকখানি পিছনে। এবং মর্গান দাবি করলেন, ওই পিছিয়ে-পড়া মানুষদের বাস্তব অবস্থাকে পরীক্ষা করলে এগিয়ে-যাওয়া মানুষদের অতীত ইতিহাসটিকেও দেখতে পাওয়া যাবে। তার কারণ, মানুষের পক্ষে এগিয়ে চলবার পথে একের পর এক যে-সব পর্যায় সেগুলির মধ্যে স্বাভাবিক ও অনিবার্য পারস্পর্য রয়েছে। মর্গানের ভাষায়, natural as well as necessary sequence of progress(১৩৩)। যেন একের পর এক কয়েকটি নির্দিষ্ট ও অনিবার্য ধাপ বেয়ে এগোবার চেষ্টা—যেখানেই মানুষ এগিয়েছে সেখানেই এই ধাপগুলি ভেঙে এগোতে হয়েছে, যেখানে এগোতে পারে নি সেখানে ওই ধাপগুলির কোনো-না-কোনো একটি ধাপে আটকে রয়েছে আর সেই জন্যেই যারা এগোতে পারে নি তাদের দিকে চেয়ে দেখলেই বোঝা যায় যারা এগিয়ে গিয়েছে তারা ঠিক কোন কোন ধাপ ভেঙে এগিয়েছে।
এই ধাপগুলি ঠিক কী কী? কোন পথে এগিয়ে, ঠিক কোন কোন পর্যায় পার হয়ে, মানুষ শেষ পর্যন্ত সভ্যতার স্তরে উঠে এলো? মর্গানের পরিভাষা অনুসারে সভ্যতার স্তরে পৌঁছবার আগে পর্যন্ত মানুষের অবস্থাকে মোটের উপর দুটি অংশে ভাগ করা যায় : বন্য-দশা (savagery) ও বর্বর-দশা (barbarism)। এই দুটি দশারই আবার স্তরবিভাগ রয়েছে : নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ। অর্থাৎ মানুষ শুরু করেছে নিম্ন-বন্য-দশা থেকে, তারপর এগিয়ে এসেছে মধ্য-বন্য-দশায়, তারপর উচ্চ-বন্য-দশায়। তারপর মানুষ বন্য-দশা ছেড়ে বর্বর-দশায় উঠে এসেছে : প্রথমে নিম্ন-বর্বর-দশা, তারপর মধ্য-বর্বর-দশা, তারপর উচ্চ-বর্বর-দশা। আর, তারপর মানুষ বর্বর-দশা ছেড়ে সভ্যতার আওতায় এসে পৌঁছেছে।
এই সব বিভিন্ন পর্যায়ের পরিচয় কী কী রকম সে-আলোচনায় পরে ফিরতে হবে। আপাতত মর্গানের মূল যুক্তিটির অনুসরণ করা যাক। মর্গান বলছেন, আজকের পৃথিবীতে এমন কোনো মানবদলের পরিচয় অবশ্যই পাওয়া যায় না যারা একেবারে নিম্ন-বন্য-দশায় পড়ে রয়েছে। কিন্তু মধ্য-বন্য-দশায় নানা দলকে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
আবিষ্কৃত হবার সময় পলিনেশিয়া আর অস্ট্রেলিয়ার উপজাতিরা ছিলো মধ্য-বন্য-দশায়।
আমেরিকার ‘হাডসন-বে টেরিটরি’ ও ‘কলম্বিয়া উপত্যকা’র নানান উপজাতিরা ছিলো উচ্চ-বন্য-দশায়।
