উত্তরে অধ্যাপক জর্জ টমসন(১৩৮) বলেছেন, তা নিশ্চয়ই হয়ে যায়নি। যে-সব মানুষেরা আজো উৎপাদন-পদ্ধতির দিক থেকে ওই রকমের পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ে আটকে রয়েছে তাদের মানসিক পরিবর্তনও নিশ্চয়ই ঘটে চলেছে। কিন্তু এ-পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই ঘটেছে এবং সে-গণ্ডি নির্ভর করছে ঐ উৎপাদন-পদ্ধতির উপরই।
……the social institutions of these modern tribes have not remained stationary. They have continued to develop, but only the directions determined by the prevailing mode of production. This is the key to the problem. If, for example, we examine the Australian forms of tokenism, exogamy and initiation the Australian forms of totemism, exogamy, and initiation, and compare them with similar institutions elsewhere, we find that they are extraordinarily elaborate, pointing to a long period of development. But these are all institutions characteristic of a simple hunting economy. In other words, just as the economic development of these tribes is stunted, so their culture is ingrown. And consequently, while we cannot expert to find such institutions in Paleolithic Europe in the same form, we are likely to find them there in some form.
অর্থাৎ, এই সব আধুনিক উপজাতিগুলির সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেমে থাকে নি। সেগুলির বিকাশ ঘটে চলেছে, কিন্তু তা একান্তভাবেই প্রচলিত উৎপাদন-পদ্ধতিদ্বারা নিয়ন্ত্রিত অভিমুখেই। এই হলো সমস্যাটিকে বোঝবার মূল কথা। যেমন ধরুন, আমরা যদি টোটেম-বিশ্বাস, বহির্বিবাহ ও দীক্ষার অস্ট্রেলিয়ায় প্রচলিত রূপগুলিকে বিশ্লেষণ করি এবং তার সঙ্গে অন্যত্র প্রচলিত অনুরূপ অনুষ্ঠানের তুলনা করি তাহলে দেখবো অস্ট্রেলিয়ার অনুষ্ঠানগুলি অসাধারণ রকমের ফাঁপানো-ফোলানো—তার থেকেই দীর্ঘ যুগ ধরে বিকাশের নির্দেশ পাওয়া যায়। অর্থাৎ কিনা, এই উপজাতিগুলির অর্থনৈতিক উন্নতি যে-রকম খর্ব সেই রকমই তাদের সংস্কৃতির বিকাশও অন্তর্মুখি। তাই, পুরোনো-পাথর যুগের ইয়োরোপে যদিও আমরা এই অনুষ্ঠানগুলিকে এই রূপেই আশা করতে পারি না তবুও সেগুলিকে কোনো-একরূপে খুঁজে পাবার আশা করতে পারি।
তাই, অধ্যাপক জর্জ টমসনের কাছে প্রাচীন ইতিহাস রচনার কাজে আদিবাসী সংক্রান্ত আধুনিক গবেষণা,—বিশেষ করে মর্গানের গবেষণা—এতো মূল্যবান হয়েছে। লোকায়ত-দর্শনের আলোচনায় আমাদের প্রধান সমস্যা অবশ্যই পুরাতত্ত্বমূলক আবিষ্কারকে নৃতত্ত্বে আলোয় বোঝবার সমস্যা নয়, তার বদলে প্রাচীন সাহিত্যের কিছুকিছু আপাত-দুর্বোধ্য নিদর্শনের তাৎপর্য নির্ণয় করবার সমস্যা। তবু, এই নিদর্শনগুলিও যেহেতু বহু পুরোনো যুগের স্মারক সেইহেতুই অধ্যাপক জর্জ টমসনের পদ্ধতি আমাদের প্রচেষ্টার পক্ষেও অমূল্য। অবশ্যই, আজকের দিনে পণ্ডিতমহলে নৃতত্ত্ব নিয়ে উৎসাএর অভাব নেই। কিন্তু বিদগ্ধ মহলের একজন দিকপাল হয়েও অধ্যাপক জর্জ টমসনের পক্ষে এইভাবে প্রাচীন ইতিহাসের ক্ষেত্রে নৃতত্ত্বের প্রয়োগে বৈশিষ্ট্য আছে। বৈশিষ্ট্যটি হলো, তাঁর বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যার একটি পরিচয় হলো মর্গানের গবেষণাকে গ্রহণ করা। কেননা, সোভিএট ইউনিয়ন ও নয়া-গণতান্ত্রিক দেশগুলির বাইরে মার্কস-এর আবিষ্কারের মতোই মর্গানের আবিষ্কারও নিষিদ্ধ করা হয়ে রয়েছে(১৩৯)। মর্গানের বিরুদ্ধে এই প্রতিবন্ধের পরিচয় শুধু আজকের দিনেই নয়, তাঁর গ্রন্থ প্রকাশিত হবার অব্যবহিত পরেই তাঁর আবিষ্কারগুলি চেপে যাবার চেষ্টা করা হয়েছে(১৪০)। অধ্যাপক জর্জ টমসন দেখাচ্ছেন সমস্যাবিশেষের আলোচনায় মর্গানের আবিষ্কার অগ্রাহ্য করাই দরুনই রিভারস্, মেনিলাউস্কি প্রমুখের রচনায় নৃতত্ত্ব বিজ্ঞান কী ভাবে প্রায় অজ্ঞানের কোঠায় পৌঁছেছে(১৪১)।
মর্গানের বিরুদ্ধে এই প্রতিবন্ধের কারণ ভালো করে বিশ্লেষণ করা দরকার। কোনো একজন বৈজ্ঞানিক আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে প্রায় পুরো জীবনটা কাটিয়ে যদি তাদের সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে থাকেন। তাহলে আধুনিক বিদগ্ধ-সমাজ তাঁর প্রতি বিরূপ হবে কেন?
অবশ্যই, আদিবাসী-সংক্রান্ত তাঁর ওই গবেষণা শুধুমাত্র অসভ্য মানুষ সম্বন্ধেই আমাদের জ্ঞান দেয়নি, আমাদের নিজেদের অতীতটাকেও আমাদের চিনতে শিখিয়েছে। এবং আসল হ্যাঙ্গামাটা ঠিক এইখানেই : অতীতের উপর থেকে পর্দা সরালে শুধুমাত্র অতীতটুকুও চোখে পড়ে না—পাওয়া যায় এক ভবিষ্যতের নির্দেশও(১৪২)। কী ভাবে তাই দেখা যাক।
মর্গান আবিষ্কার করলেন, আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্ক, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা রাষ্ট্রব্যবস্থা—মানবজাতির পক্ষে এগুলির কোনোটাই অপরিহার্য নয়। কেননা, প্রত্যেক জাতির জীবনেই এমন একটা যুগ গিয়েছে যখন তাদের মধ্যে এ-সব কিছুরই পরিচয় ছিলো না। বস্তুত, আজকের দিনে ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রভাব যতো প্রচণ্ডই মনে হোক না কেন, পৃথিবীর বুকে মানবজাতির পুরো জীবনটার তুলনায় ব্যক্তিগত সম্পত্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের যুগটা চোখের পলকের মতো। তার প্রমাণ, মধ্য-বন্য-দশা থেকে শুরু করে মধ্য-বর্বর-দশা পর্যন্ত সমাজ-বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে যে-সব মানবদল এখনো টিকে রয়েছে তাদের জীবনে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মানবজীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হতে পারে না। অতীতে যদি তার প্রভাব ছাড়াও জীবনধারণ সম্ভবপর হয়ে থাকে তাহলে ভবিষ্যতেও মানুষের পক্ষে ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রভাব-মুক্ত হওয়া অসম্ভব কথা নয়। আর, ঠিক এই কথাটিই হলো মর্গানের গবেষণার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তিনি দেখলেন, বর্তমান যুগে এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির সর্বগ্রাসী প্রভাবে মানুষের জীবন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু সমাজ-বিকাশের বিভিন্ন প্রাচীন পর্যায় আলোচনা করে তাঁর মনে এ-বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিলো যে মানুষ এগিয়ে চলবে—মানুষ চিরকাল এগিয়ে চলেছে, এগিয়ে চলার ক্ষমতাই তাকে পশুর রাজ্য থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে এতো আশ্চর্য সভ্যতার আওতায়। তাই, ব্যক্তিগত সম্পত্তি আজ তার জীবনে যতো বাধাই সৃষ্টি করুক না কেন, সে-বাধা অলঙ্ঘনীয় নয়। অগ্রগতি অতীতের নিয়ম হয়েছে, অগ্রগতিই ভবিষ্যতের নিয়ম হবে। তাই মর্গান মানুষের সামনে যে-উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখতে পেলেন সেখানে ব্যক্তিগত-সম্পত্তির গ্লানি নেই—সবাই সমান, সবাই স্বাধীন, মানুষে-মানুষে সত্যিই ভাই-ভাই ভাব। আর মর্গান চিনতেও পারলেন : এ-যেন সেই প্রাচীন সমাজেরই পুনরাবর্তন—কিন্তু ওই প্রাচীন পর্যায়ে নয়, উন্নত ও সমৃদ্ধ এক নতুন পর্যায়ে। ভবিষ্যতের ওই ছবিটি মর্গানের কাছে দিবাস্বপ্ন নয়, অতীত-অনুসন্ধানের অনিবার্য অনুসিদ্ধান্ত।
