ছান্দোগ্য-উপনিষদের আলোচিত অংশটির কথাই ভেবে দেখুন। এর মধ্যে অধ্যাত্মবাদের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাবেন না। পরম পুরুষার্থ হিসেবে এখানে যেটুকুর উল্লেখ তা ভক্ষ্য অন্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই, এখানের ধ্যানধারণাটা লোকায়তিক। কিংবা, চর্বণ বা খাওয়াদাওয়ার উৎসাহ থেকেই যদি চার্বাক নাম এসে থাকে(১২৭) তাহলে যারা ‘ওম্ অদাম, ওম্ পিবাম’ বলে গান জুড়ে দিলো তাদেরও চার্বাক ছাড়া আর কী নাম দেওয়া যায়? এবং আরো বিস্ময়কর কথা হলো, এরা শুধু নিজেরাই চার্বাক নয়—সংহিতায় প্রসিদ্ধ দেবতাদেরও নিজেদের দলে টানছে। বরুণ। প্রজাপতি। সবিতা। তার মানে, এককালে ওই দেবতাগুলিও লোকায়তিক ছিলেন নাকি? কিংবা, ঘুরিয়ে বললে বলা যায়, সমাজ-বিকাশের এমন কোনো পর্যায়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিলো যে-পর্যায়ে অধ্যাত্মবাদের উৎপত্তি হয়নি। এই সূত্রেই মনে রাখা দরকার, বৈদিক দেবতাদের সঙ্গে প্রাগ্-অধ্যাত্মবাদী বা লোকায়তিক ধ্যানধারণার সম্পর্ক দেখে আজকের দিনে আমরা যতোই বিস্মিত হই না কেন, প্রাচীনদের কাছে ঘটনাটি সত্যিই তেমন বিস্ময়কর নয়। কেননা, দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে বৃহস্পতিই হলেন লোকায়ত-দর্শনের আদিগুরু।
———————-
১২৭. চার্বাক নামের গুণরত্ন প্রদত্ত ব্যাখায় এই গ্রন্থের ৪৩৬ পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য।
২৩. মার্কসবাদ ও দৃষ্টিদান
এতোক্ষণে আমরা অধ্যাপক জর্জ টমসনের পদ্ধতির মোটামুটি পরিচয় পেলাম।
অধ্যাপক জর্জ টমসন মার্ক্স্বাদী। অধ্যাপক-জীবনের প্রথমার্ধে প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যে বিশেষজ্ঞ হবার গৌরব পেলেও তিনি কেমনভাবে অধ্যাপক-জীবনের দ্বিতীয়ার্ধে গ্রীক সাহিত্য বোধবার প্রকৃত পথ খুঁজে পেলেন সে-অভিজ্ঞতার কথা আগেই উল্লেখ করেছি।
এই পথই হলো মার্কসবাদের পথ। গ্রীক সাহিত্য বিচারে তিনি যে-পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন সে-পদ্ধতি হলো প্রাচীন দলিলগুলির উপর মার্কসীয় মূলসূত্রের প্রয়োগ। অবশ্যই, অধ্যাপক জর্জ টমসন আমেরিকার নৃতত্ত্ববিদ হেনরি লুইস মর্গানের গবেষণার উপরও নির্ভরশীল। এবং মর্গানকে নিশ্চয়ই কার্ল মার্কস-এর অনুগামী বলা চলে না, কেননা, সমসাময়িক হলেও মার্কস-এর রচনাবলীর সঙ্গে মর্গানের পরিচয় ছিলো না(১২৮)। তবুও মর্গান তাঁর নিজের পথে অগ্রসর হয়েও, এবং তাঁর নিজের গবেষণার সংকীর্ণ ক্ষেত্রটিতে স্বতন্ত্রভাবে, যে-সব সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন তার সঙ্গে মার্কস-এর সিদ্ধান্তের বিরোধ তো নেই-ই, এমনকি আশ্চর্য মিল থেকে গিয়েছে! তাই এঙ্গেল্স্(১২৯) বলছেন :
Morgan rediscovered in America, in his own way, the materialist conception of history that had been discovered by Marx forty years ago, and in his comparison of barbarism and civilization was led by this conception to the same conclusions, in the main points, as Marx had arrived at.
অর্থাৎ, চল্লিশ বছর আগে মার্ক্স্ ইতিহাসের যে-বস্তুবাদী ব্যাখ্যা আবিষ্কার করেন, মর্গানও তাঁর নিজের পথে আমেরিকায় তার পুনরাবিষ্কার করেছিলেন। এবং বর্বরতার সঙ্গে সভ্যতার তুলনা করবার সময় এই ধারণার সাহায্যে তিনি যে-সব সিদ্ধান্তে উপনীত হন সেগুলি মূলত মার্ক্স্-এর সিদ্ধান্তও।
অবশ্যই, মার্কসবাদেরই একটি মূল কথা হলো, চরম সত্য বা শেষ সত্য বলে কিছুই বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভবপর নয়,(১৩০) কেননা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা দিনের পর দিন নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ করে সত্যকে সম্বৃদ্ধ করে তোলে। ফলে, অধ্যাপক জর্জ টমসনের পক্ষে মর্গানের মূল সিদ্ধান্তগুলিকে গ্রহণ করাও যে-রকম তাঁর মার্ক্স্বাদেরই পরিচয় তেমনিই মর্গানের কোনো কোনো সিদ্ধান্তকে পরবর্তী যুগের গবেষণা-লব্ধ তথ্য সমৃদ্ধ ও সংশোধিত(১৩১) করবার চেষ্টাতেও মার্কসবাদ-বিরোধের কোনো পরিচয় নেই।
তাই, অধ্যাপক জর্জ টমসনের পদ্ধতি বলতে প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির উপর মার্কসবাএর প্রয়োগ ছাড়া আর কিছুই বোঝা উচিত নয়। এইভাবে প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের উপর মার্কসবাদের মূল সিদ্ধান্তগুলির প্রয়োগ করে অধ্যাপক জর্জ টমসন মার্কসীয় বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধতর করেছেন। কেননা, মূর্ত প্রয়োগের সাহায্যেই মার্কসীয় মূল সিদ্ধান্তগুলির সমৃদ্ধি সম্ভবপর। মার্কসবাদ অনুসারে প্রয়োগ-নিরপেক্ষ জ্ঞান অর্থহীন ও অবান্তর।
অধ্যাপক টমসনের গবেষণা থেকে প্রেরণা পেয়ে আমরাও যে ভারতীয় দর্শনের একটি সমস্যার আলোচনা করবার চেষ্টা করেছি তার কারণ আমাদের ধারণাতেও মার্কসবাদের সাহায্য ছাড়া প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির সাক্ষ্য সম্যকভাবে বুঝতে পারবার আর কোনো উপায় নেই। কেননা, পুরোনো পুঁথির তাৎপর্য স্পষ্ট হলেও অনেক সময় তা আমাদের চোখে পড়ে না। তার কারণ, আমাদেরই এক রকম অন্ধতা। একমাত্র মার্কসবাদের সাহায্যেই সে-অন্ধতা দূর করা সম্ভব।
এই কথাটা একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার।
প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলি প্রায়ই আমাদের কাছে দুর্বোধ্য বলে প্রতীয়মান হয়। সে-দুর্বোধ্যতার নানা কারণ আছে। তার মধ্যে ভাষাগত কারণ নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভাষাগত কারণ ছাড়াও আরো গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে, কেননা, প্রাচীন-পুঁথিগুলি শুধুই যে প্রাচীন ভাষায় লেখা তাই নয়, এগুলির অন্তর্গত ধ্যানধারণাও প্রাচীন। এবং এইজাতীয় প্রাচীন ধারণার সঙ্গে আমাদের আধুনিক ধারণার অনেক সময় মৌলিক তফাত। ফলে, ভাষাগত সমস্যার সমাধান হবার পরও, ওই প্রাচীনকালের ধারণাকে সামনে পেয়ে আধুনিক বিদ্বানের পক্ষে তার তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করবার সমস্যাটা বাকি থেকে যেতে পারে। এই কারণেই, প্রাচীন পুঁথি বোঝবার ব্যাপারে ভাষাতত্ত্বগত-ব্যুৎপত্তিই পর্যাপ্ত নয়।
