—————
১১৬. G. Thomas SAGS ch. 14.
১১৭. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী) ৫৬।
১১৮. ঐ ২৩৮-৪০ এবং ৪৫০-৫১।
১১৯. ঐ শুনঃশেপের উপাখ্যান। এই গ্রন্থের চতুর্থ পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।
১২০. S. A. Dange IPCS ch. 2.
১২১. G. Thomas SAGS ch. 14
১২২. সুভাষ মুখোপাধ্যায় : জানবার কথা ৮:৫৮
১২৩. ঐ : ৮:৬৩-৬৪।
১২৪. Moncalm OTS.
১২৫. G. Thomas SAGS 451.
২১. কামগান মানে কী?
আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, ছান্দোগ্যের ঋষি বলছেন…‘সেইজন্য এইরূপ জ্ঞানসম্পন্ন উদ্গতা বলবেন, তোমার কোন কাম্যবস্তু লাভের জন্য গান করবো? যিনি এই প্রকার জেনে সামগান করেন তিনি গানের দ্বারা কাম্যবস্তু লাভ করতে সমর্থ হন।’
প্রাচীন পুঁথিতে লেখা রয়েছে, কামম্ আগায়ানি।
প্রাচীন পুঁথিতে লেখা রয়েছে, কামগানস্য।
প্রাচীন সমাজের কোন লক্ষণ থেকে এই কথাগুলির তাৎপর্য উদ্ধার করা সম্ভব? এই জাতীয় উক্তি সমাজ-বিকাশের প্রাচীন পর্যায়ের কোন ধরনের স্মৃতি বহন করছে?
আজো পৃথিবীর নানা জায়গায় যে-সব মানুষের দল সমাজ-বিকাশের প্রাচীন পর্যায়ে পড়ে রয়েছে তাদের লক্ষ্য করলে এ-প্রশ্নের জবাব পাওয়া যেতে পারে। এবং তাদের দৃষ্টান্ত আলোচনা করে আধুনিক গবেষক বলছেন, প্রাচীন সমাজে নাচগানের মূলে ছিলো যাদুবিশ্বাস : মানুষ যে-কামনাকে সফল করতে চেয়েছে নাচের মধ্যে গানের ভাষায় তারই সফলতার ছবি ফুটিয়ে তোলবার চেষ্টা করেছে। মাওরি মেয়েদের আলু-নাচের সময় তাই পুবহাওয়ার আর ফুলফোটার আর ফসলফলার অনুকরণ; ফসল যাতে এলোচুলের মতো গোছাগোছা হয় সেই আশায় মেক্সিকোর মেয়েরা কোজাগর পূর্ণিমায় তাই এলোকেশী হয়। এই যাদুবিশ্বাসটির বর্ণনা হিসেবে অধ্যাপক জর্জ টমসন(১২৬) বলছেন :
The desired reality is described as though already present.
অর্থাৎ, এক কথায়, কামনা সফল হবার ছবিটি ফুটিয়ে তোলবার চেষ্টা।
প্রাচীন মানুষদের এই যাদুবিশ্বাসকেই মূলসূত্র হিসেবে গ্রহণ করে প্রাচীন সাহিত্যের ‘কামগান’ কথাটিকে বুঝতে হবে : প্রাচীন সমাজে কামনা ছাড়া গান হয় না, কেননা, ওই কামনাকে সফল করে তোলবার কল্পনাই হলো প্রাচীন সংগীতের প্রাণবস্তু।
ছান্দোগ্য-উপনিষদে কুকুরদের সামগান এই বিষয়টিরই মূর্ত উদাহরণ। তাদের ক্ষিদে পেয়েছিলো, তারা তাই অন্নের আশায় গান চেয়েছিলো। তাই, তাদের গানটিও হলো : ওম্ অদাম, ওম্ পিবাম…। আমরা ভোজন করি, আমরা পান করি…।
আজকালকার গানের মতো এ-গান একজনে গাইবে আর দশজনে শুনবে—তা নয়। দশজনে এক হয়ে একসঙ্গে গাইবে। কেননা, বাংলার প্রাচীন ব্রতগুলির মতোই এ-গানেরও মূল কথা হলো একটি কামনা এবং ‘একের কামনা দশের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে একটা অনুষ্ঠান হয়ে’ ওঠা।
———————-
১২৬. G. Thomas SAGS 453.
২২. আর্যদের আদিপর্ব
ছান্দোগ্যের ওই কুকুরগুলি সত্যিই বড়ো আশ্চর্য মানুষ! সমাজ-বিকাশের আদি-পর্যায় সম্বন্ধে ওরা আমাদের নানান তথ্য দিলো। শুধু তাই নয়। ওরাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, বৈদিক মানুষদেরও একটা আরো অতীত ইতিহাস আছে। সেই আদি-পর্যায়ের সঙ্গে উত্তর-পর্যায়ের আকাশ-পাতাল তফাত। কেননা, অন্নলাভার্থে তারা যে-গান জুড়ে দিলো তারই মধ্যে অতীতকালের স্মৃতিকে উদ্বুদ্ধ করবার আয়োজন রয়েছে আর সে আয়োজনের সাহায্যের আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে অতীতকালটা কতোই না অন্যরকম!
প্রাচীন ভারতের ঐতিহাসিক কান পেতে শুনুন :
দেবঃ বরুণঃ প্রজাপতিঃ সবিতা অন্নম্ ইহ আহরৎ
–দেবতা বরুণ, প্রজাপতি, সবিতা এইখানে অন্ন আহরণ করেছিলেন (বা, বৈদিক প্রয়োগ অনুসারে, আহরৎ=আহরতু, আহরণ করুন)।
উত্তরযুগে সংহিতায় প্রসিদ্ধ এই দেবতাগুলির মাহাত্ম্য যেভাবে বোঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে তার সঙ্গে এই দৃশ্যের কোনো মিল নেই। কেননা, বেদের দেবতাগুলিকে এখানে দেখছি অন্ন-আহরণে নিযুক্ত; অথচ উত্তরকালে এঁদের সম্বন্ধে যে-ধারণা প্রচারিত হয়েছে তার সঙ্গে আর যাই হোক অন্ন-আহরণ প্রচেষ্টার কোনো সংশ্রব নেই! কিন্তু কুকুরদের গান থেকেই প্রমাণ হয় যে, এককালে তা ছিলো। মানবশ্রম দিয়ে সৃষ্ট অন্নের অংশ গ্রহণ করবার বদলে দেবতারাই অন্ন-আহরণ কাজে অংশ গ্রহণ করতেন! তার মানে, উত্তরকালে শুধুই যজ্ঞ ছন্দ আর সামগানের অর্থই বদলায়নি, বদলে গিয়েছে শ্রমের প্রতি মনোভাব আর তারই অঙ্গ হিসেবে দেবতা নামের তাৎপর্যও। ভবিষ্যতে এ-বিষয়ে দীর্ঘতর আলোচনার অবকাশ পাবো, এবং তখনই আমরা দেখবো উক্ত পরিবর্তন অকারণ নয়। কেননা, এর মূলে রয়েছে মানবসমাজে শ্রেণীবিভাগের বিকাশ।
কিন্তু শ্রেণীবিভাগের আগে, কোনো এক আদিম যুগে, বৈদিক মানুষেরাই যে প্রাগ-বিভক্ত সমাজে জীবন-যাপন করতো তার স্মৃতি বৈদিক সাহিত্যের অনেক তথ্যই অর্থহীন হয়ে থাকবে। উদাহরণ হিসেবে আমরা ছান্দোগ্য-উপনিষদের একটি অংশের উল্লেখ করলাম। আধুনিক কালের ধ্যানধারণাকে যদি একমাত্র সম্বল মনে করা যায় তাহলে এই অংশটির কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়াই সম্ভব নয়, কিংবা, বড় জোর এর উপর একটি কাল্পনিক অর্থ আরোপ করে পাণ্ডিত্যের নামে আত্মপ্রবঞ্চনা করা যায়। অথচ, সমাজ বিকাশের আদিম পর্যায়ের কথা মনে রেখে এবং সে-পর্যায়ের মানুষদের জীবন ধারণ প্রণালী ও ধ্যানধারণা সম্বন্ধে সাধারণভাবে যা জানা গিয়েছে তার উপর নির্ভর করে এই অংশটির অর্থ অনুসন্ধান করলে এর পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ব্যাখায় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। তাই, আমরা এই পরিচ্ছেদে সামগাননিরত কুকুরগুলির কথা দীর্ঘভাবে আলোচনা করলাম এবং দেখাবার চেষ্টা করলাম এমন এক পদ্ধতি সত্যিই পাওয়া যাচ্ছে যার সাহায্যে প্রাচীন পুঁথিপত্রের অনেক আপাত-অর্থহীন অংশেরও অর্থ নির্ণয় করা অসম্ভব নয়। এবং এই পদ্ধতির উপর নির্ভর করে অগ্রসর হয়েই আমরা মানতে বাধ্য হলাম, উত্তরকালে বেদপন্থী ও বেদনিন্দুকদের মধ্যে মতাদর্শগত প্রভেদ যতো প্রকটই হোক না কেন বৈদিক সাহিত্যের অনেক স্মারকের সাহায্যে লোকায়তিক ধ্যানধারণা বুঝতে পারা অসম্ভব নয়। কেননা, বৈদিকই হোক আর লোকায়তিকই হোক, কোনো ধ্যানধারণাই মানবনিরপেক্ষ নয়—মানুষের জীবনযাপন প্রণালীর উপরই ধ্যানধারণাগুলি নির্ভর করে। এবং বৈদিকই হোক, আর অবৈদিকই হোক, মানবজাতির সমস্ত শাখাই সভ্যতার দিকে অগ্রসর হবে পথে একের পর এক কয়েকটি নির্দিষ্ট পর্যায় পেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। এই পর্যায়গুলির মধ্যে কোনো এক পিছিয়ে-পড়া পর্যায়েই হলো লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস—বৈদিক ঐতিহ্যের বাহকেরা উত্তরযুগে সে-পর্যায়ের ধ্যানধারণাকে যতোই ঘৃণা করতে শিখুন না কেন তাঁদেরই পূর্বপুরুষেরা এককালে সেই পর্যায়েই জীবনধারণ করতেন আর তাই তাঁদের পরবর্তী কালের রচনাতেও সে-পর্যায়ের ধ্যানধারণার কিছুকিছু স্মারক থেকে গিয়েছে।
