আর, এই কথাটি মনে রেখে আধুনিক পণ্ডিতদের যুক্তিটাকে বিচার করে দেখুন : ছান্দোগ্যের ঋষি যে-হেতু আলোচ্য দৃশ্যটিকে কুকুর-সম্বন্ধীয় সামগান বলে বর্ণনা করছেন সেই হেতু উদ্দেশ্যটা ঠাট্টা-তামাসা ছাড়া আর কী হতে পারে? এ-যুক্তি নেহাতই অচল এবং মূলে রয়েছে সেকালের রচনাতেও একালের মনোভাব কল্পনা করার চেষ্টা। কিন্তু সেকালের রচনায় একালের মনোভাব যে কল্পনা করা চলবে না তার প্রমাণ হলো, সেকালের ঋষিরা যে-গ্রন্থগুলিতে নিজেদের চূড়ান্ত জ্ঞান প্রকাশ করেছেন সেইগুলিরই নামকারণ করবার সময় সাপ, ব্যাঙ, বাঘ, ছাগল, তিতির, খচ্চোর ইত্যাদি নানান রকমের জানোয়ারেরই শরণাপন্ন হয়েছিলেন। এবং তার জন্যে যে তাঁদের কোনো রকম কুণ্ঠা ছিলো সে-কথা পুরোনো পুঁথির কোথাও লেখা নেই।
তাই, আধুনিক পণ্ডিতদের ওই যুক্তিটিকে যদি সত্যই গুরুত্ব দিতে হয় তাহলে মানতেই হবে, বৈদিক ঋষিরা নিজেদের যে কীর্তিগুলিকে সবচেয়ে মহান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন সেগুলি সম্বন্ধেই তাঁরা বিদ্রুপ-পরিহাসে মুখর হয়ে উঠেছিলেন!
তাহলে, ছান্দোগ্য-উপনিষদের ওই অংশটিতে কতকগুলি মানুষকে যে কুকুর বলে উল্লেখ করা হয়েছে তার কারণ বিদ্রুপ বা পরিহাস নয়। আর বিদ্রুপ বা পরিহাস যদি নাই হয় তাহলে বর্ণনাটিকে সহজ ও স্বাভাবিক বলেই স্বীকার করতে হবে। তার মানে, স্বাধ্যায়ের আশায় বেরিয়ে গ্লাব মৈত্রেয়, ওরফে, বক দালভ্য নামের বিদ্বান ব্যক্তিটি যাদের সামগান শুনে এলেন তাদের সহজ ও স্বাভাবিক পরিচয় হলো : কুকুর।
কিন্তু সত্যিই কি কোনো মানবদলের সহজ ও স্বাভাবিক পরিচয় কুকুর হওয়া সম্ভব?
নিশ্চয়ই সম্ভব, যদিও অবশ্যই আমাদের আধুনিক সমাজে নয়,–প্রাচীন সমাজে।
আমাদের এই ভারতবর্ষেই এমন অনেক মানবদলের খবর পাওয়া যায় যাদের নাম কুকুর এবং শুধুই কুকুর।
সেকালের লেখা পুঁথিপত্রে এ-জাতীয় খবর পাওয়া যায়। এমন কি একালেও যারা পিছিয়ে-পড়া বা সেকেলে অবস্থায় আটকে রয়েছে তাদের যদি স্বচক্ষে দেখেন তো দেখবেন তাদের মধ্যেও এই নামটি একেবারেই দুর্লভ নয়।
প্রথমে দেখা যাক প্রাচীন পুঁথিতে কী লেখা আছে।
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে(৫৬) খুবই সোজাসুজি কুকুর নামের মানুষদের কথা বলা হয়েছে : কৌটিল্য বলছেন, ‘রাজশব্দোপজীবী’ সংঘগুলির মধ্যে একটির নাম কুকুর। হরিবংশের(৫৭) অষ্টত্রিংশ অধ্যায়ের নামই হলো কুকুরবংশবর্ণন। মহাভারতের সভাপর্বে লেখা আছে, যাবদগণের একটি শাখার নাম কুকুর : “এইরূপে কুকুর, অন্ধক ও বৃষ্ণিগণ ‘দুর্বল ব্যক্তি বলবানের সহিত স্পর্ধা করিবে না’ এই নীতিবাক্যের অনুসরণ ক্রমে মহাবীর জরাসন্ধকে তৎকালে উপেক্ষা করিয়াছিলেন”(৫৮)। ভীষ্মপর্বের নবন অধ্যায়ে(৫৯) ধৃতরাষ্ট্রের কাছে ভারতবর্ষের নানারকম মানুষের বর্ণনা দিতে দিতে সঞ্জয় কুকুর নামের একদল মানুষের উল্লেখ করছেন। সভাপর্বে(৬০), যুধিষ্ঠিরের কাছে যারা উপহার বহন করে আনছে বলে বর্ণিত হয়েছে তাদের মধ্যে একদল মানুষকে স্বাভাবিক ভাবেই কুকুর বলা হয়েছে। তাহলে, প্রাচীন পুঁথিপত্রেই দেখা যায় মানবদলের নামও কুকুর হওয়া অসম্ভব নয়, এবং উল্লেখিত দৃষ্টান্তের কোথাও লোকগুলিকে হেয় প্রতিপন্ন করবার জন্যে ইচ্ছে করেই, গাল দিয়ে, কুকুর বলা হয়েছে—এমন নজির নিশ্চয়ই নেই। সর্বত্রই একদল মানুষের সহজ স্বাভাবিক পরিচয় হিসেবেই কুকুর শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
কিন্তু মানবদয়ের পরিচয় যে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই কুকুর হওয়া সম্ভবপর এ-কথার প্রমাণ হিসেবে শুধুমাত্র প্রাচীন পুঁথিপত্রের নজিরই আমাদের একমাত্র সম্বল নয়। আজো আমাদের দেশের নানা জায়গায় যে-সব মানুষের দল সমাজ-বিকাশের প্রাচীন স্তরে আটকা পড়ে রয়েছে তাদের দিকে দেখুন, দেখবেন কুকুর নামের কী রকম ছড়াছড়ি! এখানে মাত্র কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করলেই হবে।
রিসলী(৬১) বলছেন, ওরাওঁদের মধ্যে একদল মানুষের পরিচয় হলো খোয়েপা, খোয়েপা মানে বন্য কুকুর। অনন্তকৃষ্ণ আয়ার(৬২) বলছেন, আজো মহীশূর অঞ্চলে একাধিক দলের মানুষের পরিচয় কুকুর নাম দিয়েই। থার্স্টন(৬৩) দক্ষিণ ভারতের নানারকম মানুষের পরিচয়-প্রসঙ্গে বলছেন, একদলের নাম হলো ভোলিয়া, ভোলিয়া মানে বন্য কুকুর।
আরো অনেক দৃষ্টান্ত দেখানো যায়। আজো ভারতবর্ষের কতো জায়গায় কতো রকমের মানুষ যে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই কুকুর হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয় তার পূর্ণ তালিকা খুবই দীর্ঘ হবে।
এই ভাবে কুকুর বলে জীবন্ত মানুষগুলিকে দেখবার পর পুরোনো পুঁথির দিকে ফিরে যাওয়া যায়।
ছান্দোগ্য-উপনিষদে ওই যে যারা সামগান গাইলো ওরা কারা?
ওদের সত্যিকারের কুকুর মনে করে এবং সত্যিকারের কুকুরের ন্যায্য মর্যাদা দেবার জন্যে শঙ্করাচার্যের মতো লেজ সৃষ্টি করে উপনিষদের পিছনে জুড়ে দেবার দরকার নেই।
কিংবা, রাধাকৃষ্ণণ প্রমুখ আধুনিক বিদ্বানদের মতো এ-কথা কল্পনা করবারও কোনো দরকার নেই যে, উপনিষদের ঋষিরা যজ্ঞীয় ঋত্বিকদের বিদ্রুপ করে বা ঘৃণাভরে ওই রকম সাজিয়েছিলেন।
তার বদলে, এখানে একদল সত্যিকারের মানুষেরই বর্ণনা। সেই মানুষগুলির সহজ ও স্বাভাবিক পরিচয় হলো : কুকুর। যেমন সহজ স্বাভাবিক ভাবেই বেদের শাখাগুলিকে সাপ, ব্যাঙ, ছাগল ইত্যাদি নাম দেওয়া হয়েছিলো, কিংবা উপনিষদের কোনোটির নাম নেওয়া হয়েছে ব্যাঙ থেকে, কোনোটির খচ্চোর থেকে!
