————————-
৫১. ছান্দোগ্য উপনিষদের শঙ্করভাষ্য দ্রষ্টব্য।
৫২. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী) ২৩৫।
৫৩. দুর্গাদাস লাহিড়ী : ঋগ্বেদ সংহিতা ২৯।
৫৪. ঐ ৩১।
৫৫. M. Monier-Williams SED.
৫৬. অর্থশাস্ত্র (রাধাগোবিন্দ বসাক) ২:২০৯।
৫৭. হরিবংশ ৩৮ অধ্যায়।
৫৮. মহাভারত (কালীপ্রসন্ন সিংহ) ২১৫।
৫৯. ঐ ৭৫৬।
৬০. ঐ ২৩৮।
৬১. H. H. Risley PI 793.
৬২. A. K. Iyer MTC 1:248.
৬৩. E. Thurston and Rangacari CTSI 1:‘Bholia’
১১. জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে মানুষের নাম
উপনিষদের ওই সামগায়কগুলিকে সম্যকভাবে চিনতে হলে দেশের প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির ওপর ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিতে হবে।
পুরানো পুঁথিপত্রগুলিতে দেখবেন, পশুপাখি বা গাছগাছড়ার নামে মানুষের আত্মপরিচয় দেবার উদাহরণ কী রকম প্রচুর! মূল বইগুলি উল্টে দেখবারও দরকার নেই, কেননা আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অনেকেই ইতিপূর্বে ওই পুঁথিপত্রগুলি থেকে এ-জাতীয় দৃষ্টান্তের দীর্ঘ তালিকা তৈরী করেছেন। অন্তত, ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়ের ‘জাতিভেদ’ বলে বইটি উল্টে দেখুন, দেখবেন, তাঁর তৈরি তালিকাটি প্রায় দশ পাতা জুড়ে রয়েছে।
ঋগ্বেদে একদল মানুষের(৬৫) উল্লেখ রয়েছে যাদের পরিচয় হলো অজ। অজ মানে ছাগল। আর একদল(৬৬) মানুষের খবর পাওয়া যাচ্ছে যাদের নাম হলো শিগ্রু বা সজনে। আবার একদলের(৬৭) নাম হলো মৎস্য। এ-হেন মাছ-নামধারী মানুষ নিশ্চয়ই ভারতবর্ষের নানান জায়গায় এবং নানান যুগে বাস করতো। কেননা, শতপথ ব্রাহ্মণে(৬৮) তাদের দেখতে পাওয়া যায়, তাদের দেখতে পাওয়া যায় কৌষীতকি ব্রাহ্মণে(৬৯), গোপথ ব্রাহ্মণে(৭০), মহাভারতে(৭১) ও নানা পুরাণে(৭২)। পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণে(৭৩) পারাবত (পায়রা) জাতির কথা আছে। শতপথ ব্রাহ্মণে(৭৫) ব্রহ্মাপ্রজাপতির কূর্মরূপের কথা আছে। ওই কাছিমই আবার কশ্যপ নামে ঋগ্বেদ(৭৫), অথর্ব্ববেদ(৭৬) থেকে শুরু করে পুরোনো যুগের নানান পুঁথিপত্র(৭৭) আলো করেছে।
হনুমান বা জাম্বুবানের সত্যিই লেজ ছিলো কিনা জানা নেই। কিন্তু ক্ষিতিমোহন সেন(৭৮) মহাশয় আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন “কাঠিয়াওয়ারের পোরবন্দর যা সুদামাপুরীর রাজারা হনুমানের বংশ।” তাছাড়াম ব্যাস-বাল্মিকীর রচনা পড়লে মনে হয় হেন জন্তু-জানোয়ার বা গাছাগাছড়ার নাম বুঝি আমাদের জানা নেই যার পরিচয়ে সেকালের কোনো না কোনো দল নিজেদের পরিচয় দিতে দ্বিধা করেছে। ক্ষিতিমোহন সেন(৭৯) মশায়ের বই পড়লে দেখবেন কতো রকমারি মানুষদের নাম তিনি মহাভারত থেকে সংগ্রহ করেছেন। নমুনা হিসেবে মাত্র দু’চারটের উল্লেখ করা যাক : প্যাঁচা, বিছে, কাক, আখ, বেল, শেয়াল, গাধা, গোসাপ, মুরগি, হাতি, ভেড়া, শূয়োর, বাঘ, পঙ্গপাল, হাঁস, মাগুরমাছ, খরগোস, ঘোড়া, তাল, শাল, বাঁশ, জাফ্রান—আরো কতো!
এতোসব দেখবার পর এ-কথা শুনে নিশ্চয়ই আর মন খারাপ হবে না যে বহুদিন ধরে আমাদের হিন্দুসমাজে যে-নামগুলিকে পরম পবিত্র মনে করা হয়েছিলো তার মধ্যে অনেক নামই খোদ জন্তু-জানোয়ার থেকে পাওয়া। ম্যাকডোন্যাল-এর(৮০) ‘বেদিক মাইথোলজি’ থেকেই কয়েকটা নমুনা দেখা যায়। বৈদিক সাহিত্যে প্রসিদ্ধ কয়েকটি ঋষি-নাম হলো : কৌশিক, মাণ্ডক্যেয়, গোতম, বৎস, শুনক, ইত্যাদি। কৌশিক মানে প্যাঁচা, মাণ্ডক্যেয় মানে ব্যাঙের বাচ্চা (ব্যাঙাচি?), গোতম মানে ষাঁড়, বৎস মানে বাছুর।
আর শুনক?
ঋষি-নাম হিসেবে ‘শুনক’ দেখে সত্যিই আর অবাক হবার অবকাশ নেই। কেননা, ছান্দ্যোগ্য-উপনিষদে আপনি এই নামেরই মানুষদের সামগান গাইতে দেখেছেন। শুনক মানে কুকুর। শুনক ঋষির লেক ছিলো এ-কথা কোনো শাস্ত্রগ্রন্থে লেখা নেই, যদিও অবশ্য কুকুরের লেজ থেকে ঋষির নামকরণ হয়েছিলো এ-কথা শাস্ত্রে লেখা আছে। শুনঃশেপ ঋষির কাহিনী আমরা পরে বড়ো করে আলোচনা করবো। ঋগ্বেদে তাঁর রচনা পাওয়া যায়, ঐতরেয় ব্রাহ্মণে তাঁর সুদীর্ঘ কাহিনী পাওয়া যায়। শুনঃশেপ মানে কুকুরের লেজ। কুকুরের লেজ থেকে যদি কোনো ঋষির নামকরণ সম্ভবপর হয় তাহলে কুকুরদের সামগান শুনে তাদের লেজ কল্পনা করবার দরকার কি?
—————
৬৪. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৯৮-১০৭।
৬৫. ঋগ্বেদ : ৭.১৮.১৯।
৬৬. ঐ।
৬৭. ঋগ্বেদ : ৭.১৮.৬।
৬৮. শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.৫.৪.৯।
৬৯. কৌষীতকী ব্রাহ্মণ ৪.১।
৭০. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৯৮।
৭১. ঐ।
৭২. ঐ।
৭৩. ঐ ৯৯।
৭৪. ঐ।
৭৫. ঋগ্বেদ : ৯.১১৪.২।
৭৬. A. A. Macdonnel VM 153.
৭৭. Ibid.
৭৮. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৯৯।
৭৯. ঐ ৯৯-১০১।
৮০. A. A. Macdonnel op. cit. 153.
১২. টোটেম বিশ্বাস
জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে মানবদলের নামকরণ করবার এই প্রথাটি আমাদের দেশে টিকে রয়েছে শুধুমাত্র প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির মধ্যে নয়, দেশের পিছিয়ে-পড়ে অঞ্চলের বাস্তব সমাজ-ব্যবস্থার মধ্যেও। আপনি যদি থার্স্টন, রিসলী, রাসেল, কুক, আয়ার ইত্যাদির বই থেকে এ-বিষয়ে একটি তালিকা প্রস্তুত করতে রাজী হন তাহলে হয়তো দেখবেন কোনো রকম পরিচিত পোকামাকড়, গাছগাছড়া বা জন্তু-জানোয়ারের নামই বাদ পড়ছে না!
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যাপারটা কী? এই ভাবে পোকামাকড়, গাছগাছড়া আর জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে মানবদলের নামকরণ করবার ব্যবস্থা কেন? এ কি শুধুই আমাদের দেশের মানুষদের একটা বৈশিষ্ট্য নাকি? আসল তা নয়। এ হলো মানবজাতিরই সমাজ-সংগঠনের এক আদিম পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য। মর্গান(৮১) লক্ষ্য করেছিলেন যে, আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে সর্বত্র প্রথা হলো জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে গোষ্ঠীর নামকরণ করা। কিন্তু এই প্রথাটিকে যদি আদি ও অকৃত্রিম অবস্থায় দেখতে চান তাহলে আপনাকে অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে। কেননা, সে-দেশের আদিবাসীদের মধ্যেই কোনো কোনো দল আজো খুবই আদিম পর্যায়ে পড়ে রয়েছে এবং তাদের মধ্যে থেকে এই প্রথার একেবারে আদিম রূপটি আজো লুপ্ত হয়নি।
