এবং মানুষ হলেও তাদের কুকুর বলে উল্লেখ করবার পেছনে কোনো রকম ঠাট্টা-বিদ্রুপের উদ্দেশ্য নেই।
কিন্তু তাও কি সম্ভব? মানুষকে নিছক জন্তু-জানোয়ার মনে করা হচ্ছে, অথচ তা স্বাভাবিক ভাবেই! তার মূলে কোনো রকম বিদ্রুপ-বিতৃষ্ণার লক্ষণ নেই?
আজকের দিনে অবশ্যই তা সম্ভব নয়। কিন্তু উপনিষদের এ-অংশ তো আজকের দিনের লেখা নয়। উপনিষদের এই অংশে যাদের উল্লেখ করা হচ্ছে তারাও কেউ আধুনিক কালের মানুষ নয়। অপরপক্ষে, বৈদিক সাহিত্যের দিকে ভালো করে নজর করুন। দেখবেন, জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে কতো স্বাভাবিক ভাবেই একান্ত মানবীয় ব্যাপারগুলির নামকরণ করবার নমুনা পাওয়া যাচ্ছে। তাই, আধুনিক মনোভাবটাকেই আপনি যদি একমাত্র মনোভাব মনে করেন তাহলে প্রাচীনদের ওই ব্যবহারটির কোনো অর্থ খুঁজে পাবেন না।
কয়েকটা নমুনা দেখা যাক।
সাদা খচ্চোর : আজকের দিন আমি-আপনি নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তি বা কোনো বস্তু সম্বন্ধে সমীহ দেখাবার মনোভাব নিয়ে এমনতরো নাম ব্যবহার করবো না। কিন্তু একটা বই-এর নাম যদি তাই দেওয়া হয়? তাহলে আজকের দিনে নিশ্চয়ই সরাসরি বলে দেওয়া যাবে, বইটার বিরুদ্ধে বিদ্রুপমূলক মনোভাবের বিকাশ হিসেবেই এ-রকম নাম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রাচীন কালের ব্যাপারই আলাদা। একটি উপনিষদের নাম সত্যিই সাদা খচ্চোর : শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ। অথচ ঠাট্টা নয়, বিদ্রুপ নয়,–নামকরণের মধ্যে কোনো রকম বিরূপ ভাবের প্রকাশই নেই।
আর শুধু খচ্চোরই বা কেন। প্রাণীজগতের আরো সব অদ্ভুত অদ্ভুত বাসিন্দাদের খুঁজে পাবেন বৈদিক-সাহিত্যের রকমারি নামের মধ্যে। অপর একটি উপনিষদের নাম গ্রহণ করা হয়েছে ব্যাঙ থেকে : মাণ্ডুক্য উপনিষদ। কিন্তু এই নামের জন্যে উপনিষদ-সাহিত্যে তার মর্যাদা এতোটুকুও কম নয়। শঙ্করাচার্যের গুরু গৌড়পাদ এরই কারিকা রচনা করে অমর হয়েছেন।
উপনিষদ থেকে আরো এক-পা পিছু হটে যদি সংহিতার রাজ্যে প্রবেশ করেন তাহলে আপনার মনে হতে পারে নামজগতের এক অদ্ভুত চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করেছেন বুঝি! নমুনা দেখুন :
সংহিতাগুলির নানান শাখা-উপশাখার নাম পাওয়া যায়, যদিও অবশ্য অনেক শাখাই আজ বিপুপ্ত হয়েছে এবং যে-সব নাম টিকে রয়েছে তার মধ্যে অনেক নামেরই কোনো রকম মানে খুঁজে পাওয়া জা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একটা ব্যাপার দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই : এতো সব নামের মধ্যে যে-গুলির মানে ঠাহর করা আজো সম্ভবপর সেগুলির প্রায় প্রত্যেকটির পশুজগৎ বা উদ্ভিদ-জগৎ থেকে পাওয়া।
ঋগ্বেদের যে-একমাত্র শাখা আজো বিলুপ্ত হয় নি তার নাম হলো শাকল। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে(৫২) লেখা আছে, শাকল হলো এক রকম সাপের সেকেলে নাম। শৌনক প্রণীত প্রাতিশাখ্য(৫৩) অনুসারে, এ-ছাড়াও ঋগ্বেদের আরো চারটি শাখা ছিলো : বাস্কল, আশ্বলায়ন, সাঙ্খ্যায়ন ও মাণ্ডুক। এর মধ্যে মাণ্ডুক নামটিকে বুঝতে অসুবিধে হয় না। বেদজ্ঞরা ভেবে দেখতে পারেন, দুটি শাখার নামের যে-মানে পাওয়া যায় তারই আলোয় বাকি তিনটির কোনো মানে উদ্ধার করা সম্ভব কিনা।
পুরাণে(৫৫) আছে, এককালে সামবেদের সহস্রাধিক শাখা ছিলো। ইন্দ্র বজ্রাঘাতে সেই শাখাগুলি বিনষ্ট করেন। ইন্দ্রের এই অদ্ভুত আচরণের তাৎপর্য খোঁজা আপাতত আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তার বদলে দেখা যাক, ইন্দ্রের বজ্রাঘাত সত্ত্বেও যে-সাতটি শাখা টিকে থাকলো বলে বলা হয়েছে সেগুলির নাম কী রকম : কৌথুমী (বা কৌথুম), রাণ্যায়ণীয় (বা রাণ্যায়ণ), শাট্যমুগ্র, কাপোল, মহাকাপোল, লাঙ্গলিক, শার্দূলীয়। এই সপ্তম নামটি যে বাঘ থেকেই এসেছে তা বোঝবার জন্যে স্যর মনিয়ার-উইলিয়ম্স্-এর অভিধান ঘাঁটতে হবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাঁর ওই মহামূল্যবান অভিধানটিকে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও এক লাঙ্গলিক ছাড়া আর কোনো নামের শব্দার্থ পাওয়া যায় না। কিন্তু এ-নামটির যে-অর্থ পাওয়া যায় তা চিত্তাকর্ষক : লাঙ্গলিক মানে নাকি একরকম ভেষজ(৫৫)।
কৃষ্ণ-যজুর্ব্বেদের একটি শাখার নাম তৈত্তিরীয় সংহিতা। এ-নাম যে তিতির পাখি থেকে এসেছে সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শুক্ল-যজুর্ব্বেদের যে-শাখার নাম বাজসনেয়ী সংহিতা তা বাজ বা তেজি ঘোড়া থেকে এসেছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। কৃষ্ণ-যজুর্ব্বেদের অপর শাখার নাম মৈত্রায়ণী সংহিতা, তার কয়েকটি উপশাখার নাম খুবই চিত্তাকর্ষক : মানব, বরাহ, ছাগলেয়, হারদ্রবীয়, দুন্দুভ, শ্যামায়ণীয়।
অথর্ব্ববেদের কয়েকটি শাখার নাম : পৈপ্পল, শৌনকীয়, তোত্তায়ন, ব্রহ্মপালাশ। এগুলির মধ্যে পৈপ্পল নামটি যে পিপুল গাছ থেকে এসেছে সে-বিষয়ে কোনো রকমই সন্দেহের অবকাশ নেই। বাকিগুলির কোনোটি কোনো জন্তু-জানোয়ারের বা কোনো গাছগাছড়ার কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে কিনা ভালো করে ভেবে দেখা দরকার।
আমরা বলতে চাই, পাঁচটা দৃষ্টান্তের মধ্যে যদি একটাকেও স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায় আর বাকি ক’টাকে বোঝা না যায় তাহলে যেটা বোঝা যাচ্ছে তারই সাহায্যে যে-ক’টাকে বোঝা না সেই ক’টাকে বোঝবার চেষ্টা করতে হবে। কিংবা, অন্তত এটুকু তো নিশ্চয়ই দাবী করা যায় যে, যা-অস্পষ্ট তার সাক্ষ্য যা-স্পষ্ট তার সাক্ষ্যকে উড়িয়ে দিতে পারে না। সংহিতা-সাহিত্যের অন্তত কয়েকটি দৃষ্টান্তের বেলায় আমরা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি যে, নামগুলি সরাসরি জন্তু-জানোয়ার, কিংবা, গাছগাছড়া থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। বাকিগুলির অর্থ যদি এমন বোঝা না-ও যায় তাহলেও কি সেগুলির পক্ষে একই রকম উৎপত্তি হওয়া স্বাভাবিক নয়?
