স্যার জেম্স্ ফ্রেসার আরো অজস্র দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আরো দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না—জায়গায় কুলোবে না। উদ্ধৃত করতে পারলে দেখা যেতো এ-জাতীয় বিশ্বাস পৃথিবীর শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি জায়গায় আবদ্ধ নয়; যেখানেই আজো মানুষ পিছিয়ে-পড়া দশায় আটকে রয়েছে সেখানেই টিকে আছে এই ধরনের বিশ্বাস। অর্থাৎ, আদিম মানুষের পক্ষে এ-বিশ্বাস সার্বভৌম : কিংবা, যা হয়তো একই কথা, মানুষের আদিম অবস্থার কোনো এক স্তরে এ-বিশ্বাস অনিবার্যও। কেন, তা পরের পরিচ্ছেদে আলোচনা করবো।
আর যদি তাই হয় তাহলে নিশ্চয়ই অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে, আমাদের পূর্বপুরুষেরাও যখন সবেমাত্র ওই রকম কোনো অবস্থা পিছনে ফেলে এগিয়ে এসেছেন তখন তাঁদের ধ্যানধারণা থেকে এ-জাতীয় বিশ্বাসের চিহ্ন সম্পূর্ণ ভাবে মুছে যায় নি। আর যেহেতু তাঁরা নিজেদের ধ্যানধারণাগুলিকে অমর করে রেখে গিয়েছেন পুঁথির পাতায় বা মন্দিরের ভাস্কর্যে সেইহেতুই আমরা আজো সেগুলির স্পষ্ট স্বাক্ষর স্বচক্ষে দেখতে পাই। কেবল ভুলে যাই, তাঁদের উদ্দেশ্য আর আমাদের উদ্দেশ্য এক হবার কথা নয়।
তাই, বেদের মন্ত্র শুনলে পরের যুগে প্রায়শ্চিত্ত করবার কথা ওঠে।
তাই, মন্দিরের গায়ে ভাস্কর্য(৩৮) দেখতে গিয়ে আজ চোখ নামিয়ে নিতে হয়।
একাল আর সেকালের তফাতটা তো সত্যিই বড়ো কম নয়! বলাই বাহুল্য, প্রাচীন বলেই সেকালের ধারণাকে নির্বিচারে শ্রদ্ধা করবার কথা উঠছে না। কিন্তু এ-কথাও মনে রাখা উচিত যে, একালের মনোভাব নিয়ে সেকালকে বিচার করলে প্রাচীনদের প্রতি অবিচার করা হবে।
বাজসনেয়ী সংহিতার বা উপনিষদের ঋষিরা যা বলেছেন তা ঠিক না ভুল সে-আলোচনা স্বতন্ত্র। আমরা শুধু এইটুকুই বলতে চাই যে, তাঁরা যা ভাবেন নি, সে-ভাবনাটা তাঁদের রচনায় আরোপ করাটা ভুল।
তাঁরা অশ্লীল সাহিত্য রচনা করেন নি। তাঁরা লাম্পট্য বর্ণনা করেন নি। তাঁরা নিজেদের জ্ঞান অনুসারে যা উদ্দেশ্যমূলক মনে করেছেন তাই লিখে গিয়েছেন। মৈথুন তাঁদের ধারণায় যজ্ঞের সমান, সামগানের সমান, একমাত্র ব্রতের সমান। কেননা, তাঁদের ধারণায় এরই উপর নির্ভর করছে শুধুমাত্র সন্তান পাবার সম্ভাবনা নয়, সব কিছুই : মিথুনাম্মিথুনাৎ প্রজায়তে সর্ব্বমায়ুরেতি জ্যোগ্ জীবতি মহান্ প্রজয়া পশুভির্ভিবতি মহান্ কীর্ত্ত্যা…
———————-
২৭. এই গ্রন্থের তৃতীয় পরিচ্ছেদের “লোকায়ত-প্রসঙ্গে সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত” শিরোনামের পর্ব।
২৮. ঐ।
২৯. JAS (s) XIX-1953 No. 1, Page 7.
৩০. E. T. Dalton DEB 196.
৩১. E. Westermarck HHM 30.
৩২. Ibid cf. J. Frazer GB ch. Xi.
৩৩. JAS (s) XIX-1953 No. 1, Page 7.
৩৪. E. T. Dalton op. cit. 196.
৩৫. J. Frazer GB 135-6.
৩৬. Ibid. cb. Xi.
৩৭. Ibid.
৩৮. এই গ্রন্থের তৃতীয় পরিচ্ছেদের “তন্ত্রের দেহতত্ত্ব” শিরোনামের পর্ব।
০৭. লোকায়ত, বৈষ্ণব, সহজিয়া
অবশ্যই, লোকায়ত নিয়ে সমস্যাটা শুধুমাত্র প্রাচীন ইতিহাসের সমস্যা নয়। কেননা, খুব পুরোনো কালের লেখায় লোকায়তিকদের উল্লেখ পাওয়া গেলেও, লোকায়ত বলতে শুধুমাত্র প্রাচীন কালের কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ বোঝা উচিত নয়।
এ-বিষয়ে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মন্তব্য উল্লেখ করেছি। তিনি দেখাচ্ছেন, আজো ভারতবর্ষের নানান জায়গায় নানান রকম নামের আড়ালে ওই লোকায়ত আর কাপালিক মতবাদ টিকে রয়েছে। বিশেষ করে তিনি দুটি সম্প্রদায়ের কথা তুলছেন, বৈষ্ণব আর সহজিয়া। এই যে বৈষ্ণব সম্প্রদায়, এ-হলো নামেই বৈষ্ণব—কেননা, বিষ্ণু কিংবা কৃষ্ণ অবতারের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই নেই। তার বদলে, এ-জাতীয় সম্প্রদায়গুলির কাছে দেহতত্ত্বই হলো চরমতত্ত্ব, সাধনা বলতে সবটুকুই কামসাধনা।
অতএব, মহামহোপাধ্যায় বলছেন, এ-জাতীয় সম্প্রদায়গুলিকে লোকায়তিক আখ্যাই দিতে হবে।
কিন্তু যে-লোকায়ত চিন্তাধারা দেহতত্ত্বের গানে, সহজিয়া, তন্ত্র বা ওই ধরনের অজস্র নামের আড়ালে, দেশের পিছিয়ে-পড়া অঞ্চলে এবং সামাজিক মর্যাদাহীন নিচু স্তরের মানুষদের মধ্যে আজো এ-ভাবে টিক রয়েছে তার সঙ্গে মাধবাচার্য বর্ণিত ওই ধারালো, মার্জিত দার্শনিক মতবাদটির সম্পর্ক ঠিক কী?
সম্পর্কের একটা নমুনা দেখুন :
এ ব্রাহ্মণ বুঝি নদীতে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি ভরে জল নিয়ে তর্পণ করছিলো। তাই দেখে সহজিয়ারা গান(৩৯) গেয়ে বলছে : ওগো বামুন, এতো সহজেই যদি সুদূর পরলোক পর্যন্ত জল পাঠাতে পারো তাহলে কাছে পিঠে ওই যে চাষের ক্ষেত সেখানে জল পৌঁছে দেবার জন্যে আর হাঙ্গামা করা কেন?
যাগযজ্ঞ সম্বন্ধে লোকায়তিকদের যে-সব তীব্র বিদ্রুপের বর্ণনা মাধবাচার্য দিয়েছেন সহজিয়াদের এই গান প্রায় হুবহু সেই রকমের নয় কি? মাধবাচার্য(৪০) লিখেছেন, লোকায়তিকেরা বলে শ্রাদ্ধপিণ্ড যদি পরলোকে কারুর ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করতে পারে তাহলে গ্রামান্তরে যাবার সময় চিঁড়েমুড়ির পোঁটলাটাকে সঙ্গে নিয়ে যাবার দরকার কি?
কিন্তু শুধু সহজিয়াই নয়। দেহবাদী নানান সম্প্রদায় আজো আমাদের দেশে বেঁচে রয়েছে। লোকায়ত-দর্শন বুঝতে হলে এগুলিকেও ঠিকমতো বুঝতে হবে।
—————-
৩৯. H. P. Shastri op. cit, 4.
৪০. সর্বদর্শনসংগ্রহ ৫।
০৮. পদ্ধতির পরিচয়
শুরুতেই বলেছি, লোকায়ত দর্শন নিয়ে যতো রকমের সমস্যা ওঠে তা সবই সমাধান করা আমাদের যোগ্যতায় নেই। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস সংক্রান্ত গবেষণার বর্তমান অবস্থায় তা কতোখানি সম্ভব তাও হয়তো অনেকটাই সন্দেহের কথা।
