আরো নানান দিকে যাওয়া যায়। জয়পুরের দিকে গেলে পাঞ্জাবের মধ্যে এই উৎসব দেখা যায়, নিলগিরির দিকে গেলে দেখা যায় কোটারদের মধ্যে(৩১)। বিদেশ যেতে যদি রাজী হন তাহলে মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া বা ওই রকম আরো নানা জায়গায় এই উৎসবটাই আপনার চোখে পড়বে(৩২)। কিন্তু স্বদেশেই দেখুন আর বিদেশেই দেখুন, একটা ব্যাপার দেখে অবাক হতেই হবে : নির্বিচার মৈথুনের এই যে উৎসব, এর সঙ্গে ফসলের সম্পর্কটা সর্বত্রই ঘনিষ্ঠ।
সাঁওতালরাই সবচেয়ে কাছাকাছি রয়েছে। সাঁওতালদের মধ্যে এ-উৎসব কী ভাবে টিকে আছে তাই দেখা যাক :
Five days are spent in dancing, drinking and debauching. It is significant that at the commencement the village-headman gives a talk to the village people, in which he says that they may act as they like sexually, only being careful not to touch certain women : otherwise they may amuse themselves. The village people reply that they are putting twelve balls of cotton in their ears and will not pay any heed to, nor hear or see, anything. This festival is in many ways a disgrace to this people(৩৬).
অর্থাৎ নাচ, মদ্যপান ও ব্যাভিচারে কাটে পাঁচ দিন। লক্ষ্য করা দরকার যে, শুরুতে গ্রামের মোড়ল গ্রামের সবাইকে ডেকে একটি বক্তৃতায় বলে, মৈথুন ব্যাপারে যা খুসি তাই করতে পারো, কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি নারীকে স্পর্শ করা চলবে না, তাছাড়া মনের সুখে মজা করো। উত্তরে গ্রামের সবাই বলে যে, তারা কানের মধ্যে বারো গোলা তুলো পুরছে,–কোনো দিকে নজর দেবে না, কিছুই শুনবে না, কিছুই দেখবে না—কিছুই নয়। এ-উৎসব ওদের পক্ষে এক কলঙ্ক!
উদ্বৃতির শেষ কথাটি নজর করবেন : আধুনিক কালের লাম্পট্য-ব্যবহারের কাছ থেকে আলো পেয়ে ওদের আচরণটাকে বুঝতে গেলে এ-ধরনের একটা মন্তব্য করা ছাড়া উপায় নেই। ওদের শুধোন, একেবারে অন্য জবাব পাবেন। ডাল্টন(৩৪) সাহেব অনেককাল আগেই সে-জবাব সংগ্রহ করে গিয়েছেন : ফসলের এই সময়টায় ওরা অনুভব করে নিজেদের মধ্যে বীজের ভার। ক্ষেত্রে বীজ ছড়ানো আর নারীর মধ্যে সন্তানের বীজ স্থাপন করা—ওদের চেতনায় দুটো কথা সম্বন্ধহীন নয়।
বাজসনেয়ী সংহিতার মন্ত্রগুলিতেও কি সেই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়? উদ্গাতা বাবাতাকে অভিমেথন করবার সময় ওই বীজবপনের কথাটাই ভাবছে : যেমন কৃষক বায়ুতে ধান্য শুষ্ক করিতে করিতে অকস্মাৎ গ্রহণ এবং বপন করে!
তাহলে সমাজ-বিকাশের প্রাচীন স্তরে আটকে পড়ে-থাকা মানুষদের দিকে চেয়ে দেখলে প্রাচীন সাহিত্যের বামাচারকে বোঝবার সূত্র খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়।
এ-বিষয়ে রাশি রাশি তথ্য সংগ্রহ করেছেন স্যর জেম্স্ ফ্রেসার এবং তারই ভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্ত করছেন :
…the profligacy which notoriously attended these ceremonies was at one time not an accidental excess but an essential part of the rites, and that in the opinion of those who performed them the marriage of trees and plants could not be fertile without the real union of the human sexes. At the present day it might perhaps be vain to look in civilised Europe for customs of this sort observed for the explicit purpose of promoting the growth of vegetation. But ruder races in other parts of the world have consciously employed the intercourse of the sexes as a means to ensure the fruitfulness of the earth; and some rites which are still, or were till lately, kept up in Europe can be reasonably explained only as stunted relics of a similar practice(৩৫).
মোদ্দা কথায়, পিছিয়ে-পড়া মানুষদের কল্পনা অনুসারে প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ করবার কৌশল হলো নরনারীর মৈথুন : মানুষ যদি ফলপ্রসূ হয় তাহলে প্রকৃতিও তাকে অনুকরণ করতে বাধ্য হবে।
বলাই বাহুল্য, আমাদের আজকালকার জ্ঞানের দিক থেকে পিছিয়ে-পড়া মানুষদের ওই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। আমরা আজ অনেক বেশি জেনেছি, অনেক ভালো করে বুঝতে পেরেছি প্রকৃতিকে বাস্তবিকই ফলপ্রসূ করবার প্রকৃত কৌশল কী। কিন্তু যারা পিছিয়ে পড়ে রয়েছে তাদের বেলায় একেবারে আলাদা কথা। আমাদের তুলনায় প্রকৃতির উপর তাদের দখলটা নেহাতই নগণ্য—বাস্তবভাবে তারা আর প্রকৃতিকে কতটুকুই বা জয় করতে শিখেছে? তাই বাস্তব জয়ের দিক থেকে প্রকাণ্ড অভাবটাকে একরকমের কাল্পনিক উপায়ে তারা মেটাতে চায়।
আকাশে বৃষ্টি চাইতে হলে তারা দলবেঁধে নাচতে নাচতে আকাশের দিকে জলের ছিটে ছোঁড়ে। কেন ছোঁড়ে? ওরা ভাবে, এইভাবে আকাশে বৃষ্টির একটা নকল তুললেই আসল বৃষ্টি ডেকে আনা যাবে।
আদিম মানুষের এ-জাতীয় বিশ্বাসকেই বলে ‘ম্যাজিক’ বা যাদুবিশ্বাস। মৈথুন সম্বন্ধে তার ধারণাটাও বুঝতে হবে এই যাদুবিশ্বাসের দিক থেকেই। স্যর জেম্স্ ফ্রেসার যেমন বলছেন : যে-পদ্ধতি অনুসারে মানুষ সন্তান উৎপাদন করে, আর, যে-পদ্ধতি অনুসারে গাছপালারাও ওই একই কাজ করে—আদিম মানুষ যেন এই দু’রকম পদ্ধতিকে গুলিয়ে ফেলছে, আর ভাবছে প্রথমটিকে যে নিজে সম্পাদন করে দ্বিতীয়টিকেও সম্পাদিত হবার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে(৩৬)।
স্যর জেম্স্ ফ্রেসারকে অনুসরণ করেই(৩৭) কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেখা যাক :
মধ্য-আমেরিকার পিপিলে বলে আদিবাসীদের কথা : বীজ বোনবার আগের রাতটিতে কামনাকে প্রচণ্ড ভাবে চরিতার্থ করা যায়। এমনকি, যে-মুহূর্তে জমিতে প্রথম বীজ বোনা হবে সেই মুহূর্তে মৈথুন করবার জন্যে কয়েকজনকে বিশেষ করে নিযুক্ত রাখা হয়। পুরোহিতদের নির্দেশ অনুসারে প্রত্যেকেই এই উপলক্ষে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হতে বাধ্য; এমনকি, উক্ত অনুশাসন না মেনে বীজ বুনতে যাওয়াটাকে আইন-গর্হিত মনে করা হয়।
জাভা-দ্বীপের কোনো কোনো গ্রামে ধান পাকবার সময়টিতে কৃষাণ-কৃষাণীরা রাত্রিবেলায় ক্ষেতে যায় ও ক্ষেতের উপরই সহবাস করে।
অস্ট্রেলিয়া আর নিউগিনির মাঝামাঝি দ্বীপপুঞ্জগুলিতে এই জাতীয় বিশ্বাসের সামান্য রকমফের দেখা যায়। ওখানের মানুষদের বিশ্বাস, সূর্য হলো পুরুষ, ধরিত্রী নারী। বছরে একবার করে, বর্ষার মুখে, সূর্য নাকি আকাশ থেকে নেমে আসে ধরণীকে গর্ভবতী করবার জন্যে। আর পুরো পৃথিবী জুড়ে উৎপাদনের যখন এ-রকম মহোৎসব তখন মানুষেরাও মেতে ওঠে ওই একই উৎসবে : নরনারীর মধ্যে অবাধ মিলন চলতে থাকে। ওদের ধারণায়, উৎসবটির উদ্দেশ্য হলো পিতামহ সূর্যের কাছ থেকে বহুল পরিমাণে বৃষ্টি, অন্ন, পশু ও প্রজা পাওয়া। ফ্রেসার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, এই ধরনের অবারিত যৌন-মিলনকে অসংযত যৌনক্ষুধার বিকাশমাত্র মনে করলে ভুল করা হবে। এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে পুরো উৎসবটিকে তারা সযত্নে ও রীতিমতো ভক্তিভরেই সম্পাদন করে, কেননা, তাদের ধারণায় এরই উপর নির্ভর করছে জমির উর্বরতা আর মানুষের মঙ্গল।
