সমস্যা যে ওঠে এবং সমস্যা যে বহু রকমের, ভারতীয় দর্শনের সাধারণ ইতিহাসে সে-কথার স্বীকৃতি নেই। মহামহোপাধ্যায়ের রচনা অনুসরণ করে দেখাবার চেষ্টা করলাম সমস্যাগুলিকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে এবং সেগুলির সমাধান খোঁজ করা দরকার। এবং সমাধান খোঁজ করবার পদ্ধতিটি কী রকম হতে পারে তারও কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া গেলো সমস্যাগুলির সূত্র ধরে এগোতে-এগোতে : পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষের ধ্যানধারণা থেকে প্রাচীন পুঁথিপত্রের অনেক কথা এবং অনুন্নত মানুষদের অনেক ক্রিয়াকর্মকে বোঝবার সুযোগ হতে পারে।
এ-পদ্ধতি খুবই মূল্যবান।
এ-পদ্ধতি অনুসরণ শুধু যে লোকায়ত-দর্শন প্রসঙ্গেই প্রয়োজন তাই নয়, প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের অনেক অন্ধকার গুহা, প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের অনেক জটিল সমস্যা, প্রাচীন পুঁথিপত্রে লেখা অনেক দুর্বোধ্য কথা—এ-পদ্ধতির সাহায্যে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে।
শুরুতে তাই পদ্ধতির সম্যক পরিচয় প্রয়োজন।
কিন্তু পদ্ধতিটিকে বোঝবার ব্যাপার সুবিধে হবে এটির কোনো মূর্ত প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করলে। উপনিষদেরই একটি দুর্বোধ্য পরিচ্ছেদের উপর প্রয়োগ করে পদ্ধতিটির পরিচয় পাবার চেষ্টা করা যাক। লোকায়ত-দর্শনের দিক থেকেও উপনিষদের এই পরিচ্ছেদটি অবান্তর হবে না। কেননা, তার মধ্যে যে-দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে তাকে বস্তুবাদী বা লোকায়তিকই বলতে হবে
০৯. অথ কুকুরস-সম্বন্ধী সামগান
ছান্দোগ্য-উপনিষদের প্রথম অধ্যায়ের একাদশ খণ্ডে একটি অদ্ভুত, ও আপাতঃ- অর্থহীন, বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের ধারণায় এর অর্থনির্ণয় করা সম্ভব, কিন্তু তার জন্যে নতুন প্রদ্ধতির প্রয়োজন। সে-পদ্ধতির পরিচয় হিসেবে উপনিষদের এই অংশটুকুর উপর পদ্ধতিটির প্রয়োগ করবার চেষ্টা করা যাক। ছান্দ্যোগ্য লেখা আছে :
অতএব এখন কুকুর সম্বন্ধীয় সামগান (উদগীথ)। তখন বক দালত্য, ওরফে অতৃপ্ত (গ্লাব) মৈত্রেয়, স্বাধ্যায়ে (=বেদজ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে) বেরিয়েছিলেন।।১।১২।১।।
তাঁর কাছে শ্বেতবর্ণ কুকুর আবির্ভূত হলেন। অন্য কুকুরেরা তাঁর (=সেই শ্বেতবর্ণ কুকুরের) কাছে গিয়ে বললো, “ভগবান, আমাদের অন্নের জন্য গান করুন। আমরা ভোজন করতে চাই।।১।১২।২।।
সেই সাদা কুকুর অন্য কুকুরদের বললেন, “ভোর বেলায় এইখানে আমার কাছে সমাগত হয়ো।” বক দালভ্য, ওরফে অতৃপ্ত মৈত্রেয়, অপেক্ষা করে রইলেন।।১।১২।৩।।
বহিষ্পবমানের সাহায্যে স্তোষ্যমান অবস্থায় যেমন পরস্পরের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে সর্পিল গতিতে নড়াচড়া করা হয় (সর্পন্তি), তারা (=সেই কুকুরেরা) তেমনি গতিতে ঘুরলো (আসসৃপু)। তারপর তারা (=সেই কুকুরেরা) একত্রিত হলে ও হিং (হিংকার) করলো।।১।১২।৪।।
(তারা গান করতে লাগলো) “ওম, আমরা ভোজন করি। ওম্ আমরা পান করি। ওম্ দেবতা বরুণ, প্রজাপতি, সবিতা এইখানে অন্ন আহরণ করিতেছিলেন। হে অন্নপতি, এইখানে অন্ন আহরণ করো। ওম্।” ইতি।।১।১২।৫।।
শব্দার্থের দিক থেকে কয়েকটা কথা গোড়ায় বলে নেওয়া দরকার।
সামগানের পাঁচ ভাগে বা পাঁচ স্তরে ভাগ করা হয় : হিংকার, প্রস্তাব, উদগীথ, প্রতিহার ও নিধন। অধ্যাপক আর. ই. হিউমের(৪১) তর্জমা অনুসারে : হিংকার=preliminary vocalizing, প্রস্তাব=introductory praise, উদগীথ=loud chant, প্রতিহার=response, নিধন=conclusion।
বহিষ্পবমান স্তোত্র। প্রথমত, স্তোত্র : “যাহা গান করা যায় তাহার নাম স্তোত্র।”(৪২) দ্বিতীয়ত, বহিষ্পবমান : যজ্ঞবিশেষে ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলের একাদশ সূক্তটি গান করবার সময়, পাঁচজন ঋত্বিক (অধ্বষ্যু, প্রস্তোতা, প্রতিহর্তা, উদগাতা ও ব্রহ্মা) ও তারপরে যজমান হাত ধরাধরি করে চত্তাল অভিমুখে প্রসর্পণ করেন, সকলে উপবেশন করলে পর হোতা তাঁদের অনুমন্তন করেন।
স্বাধ্যায়। এ-কথার চলতি মানে হলো প্রাথমিক বেদজ্ঞান। সু+আ=অধ্যায়ম্। কিন্তু অন্য ভাবেও এই শব্দ নিষ্পন্ন হতে পারে : স্ব+অধ্যায়ম্, অর্থাৎ, নিজে নিজে অধ্যয়ন।
বক দালভ্য, ওরফে, গ্লাব মৈত্রেয়। বক মানে বক, যদিও কিনা মানুষের নাম যে কি করে বক হতে পারে এ-নিয়ে আধুনিক পণ্ডিতেরা কিছুটা মুস্কিলে পড়েছেন। তাই, তর্জমা করবার সময় মক্ষমুলার(৪৩) করছেন Vaka, “বাক”। অধ্যাপক হিউম(৪৪) করছেন Baka। কিন্তু যাঁরা উপনিষদ লিখেছিলেন তাঁরা Vakaও লেখেন নি, Bakaও লেখেন নি; শুধু “বক”ই লিখেছেন। দালভ্য : এ-নামটার শব্দার্থ যাই হোক না কেন, মহৎ পাণ্ডিত্যের সঙ্গে এর যোগাযোগ আছে। কেননা, ছান্দোগ্য-উপনিষদেই(৪৫) একটু আগে লেখা হয়েছে : মাত্র তিনজন উদগীথ-বিদ্যায় কুশল ছিলেন—শালাবত্য শিলক, দালভ্য চৈকিতায়ন এবং প্রবাহন জৈবলি। অবশ্যই, দালব্য বক এবং দালব্য চৈকিতায়ন—দু’-এর মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিলো কিনা সে-কথা উপনিষদে লেখা নেই। কিন্তু, তাহলেও, বক দালভ্যও খুব কম পণ্ডিত ছিলেন না। ছান্দোগ্য-উপনিষদের অন্যত্র সে-কথা লেখা আছে(৪৬)। গ্লাব মানে অতৃপ্ত—এই মানেটাই মনে রাখা ভালো। অতৃপ্ত বলেই তিনি স্বাধ্যায়ে বেরিয়েছিলেন।
এইবার শব্দার্থের কথা ছেড়ে পুরো বর্ণনাটুকুর তাৎপর্য সন্ধান করা যাক। মনে রাখবেন, এটি হলো ছান্দোগ্য-উপনিষদের প্রথম অধ্যাএর একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ খণ্ড এবং উপনিষদে এই পরমাশ্চর্য দৃশ্যটির কথা যেমনি খাপছাড়া ভাবে অবতারণা করা হলো তেমনি খাপছাড়া ভাবেই তা শেষ হয়ে গেলো।
