তাহলে? বুঝতে পারবার আশায় কোন পথ ধরে এগোবো?
ভেবে দেখতে হবে, পৃথিবীর আনাচে-কানাচে আজ যে-সব পেছিয়ে-পড়া মানুষের দল টিকে রয়েছে তাদের মধ্যে এ-ধরনের আচরণ সত্যিই দেখতে পাওয়া যায় কি না। যদি সত্যিই দেখতে পাওয়া যায় তাহলে প্রশ্ন তুলতে হবে, ঠিক কী ভেবে তারা এ-ধরনের আচরণ করছে? তাদের চেতনাতেও কি এ-আচরণ শুধু লাম্পট্য, না, এরই সাহায্যে তারা কোনো রকম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য সাধন করবার চেষ্টা করছে? হয়তো তাদের সে-চেষ্টাটা শুধুই কল্পনা, বাস্তব তথ্যের দিক থেকে হয়তো তার পুরোটাই ভুল। তবুও আসল প্রশ্ন তা নয়। প্রশ্ন হলো, তাদের ধারণাটা ঠিক কী? সে-ধারণার সঙ্গে আমাদের ধারণার মিল আছে কি?
প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির যে-সব কথার কোনো রকম মানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এইদিক থেকে এগোলে হয়তো তার মানে পাওয়া যেতে পারে। তার কারণ, পুঁথিগুলি প্রাচীন বলেই সেগুলির মধ্যে ওই পিছিয়ে-পড়া সমাজের মানুষদের চেতনার রেশ থেকে যাওয়া অসম্ভব নয়।
তাহলে প্রাচীন পুঁথির অর্থ অম্বেষণ করবার সময় শুধুমাত্র পুঁথির রাজ্যে আবদ্ধ থাকলেই চলবে না। পুঁথির রাজ্য ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হবে এই বাস্তব পৃথিবীতে—যে-পৃথিবীতে সব মানুষের সমান উন্নতি হয় নি, কেউ বা এগিয়ে গিয়েছে, উঠে এসেছে সভ্যতার হিমাদ্রিশিখরে, তাদের চেতনা থেকে অনেকাংশেই বিলুপ্ত হয়েছে নিজেদের অসভ্য অতীতের স্মৃতি; আর তাই, যারা পিছিয়ে পড়ে রয়েছে তাদের দিকে নজর করলে—ভালো করে নজর করলে—সভ্য মানুষদের এই ভুলে যাওয়া অতীতকে খুঁজে পাওয়া হয়তো অসম্ভব হবে না। আর এইদিক থেকে আলো পেয়েই আমরা হয়তো দেখতে পাবো আমাদের সুদূর পূর্বপুরুষেরা ঠিক কী ভেবে, কোন ধারণায় বিশ্বাস করে ওই জাতীয় কথাবার্তা লিখে গিয়েছেন।
কথাটা বিশেশ করে তুললাম, বৈদিক সাহিত্যে বামাচারের চিহ্নগুলি বোঝবার প্রসঙ্গে। কিন্তু, বৈদিক সাহত্যে আদিম চিন্তার স্বাক্ষর বলতে শুধু ওই বামাচার নয়। আরো নানা রকম চিহ্ন আছে। সেগুলিকেও বুঝতে হবে। তাই, কোন পদ্ধতিতে বোঝা সম্ভব এ-বিষয়েও একটা স্পষ্ট ধারণা পেতে হবে। আপাতত বামাচারী চেতনার উৎস নিয়েই অনুসন্ধান চালানো যাক। এ-অনুসন্ধান যদি সফল হয় তাহলে নিশ্চয়ই আশা করা ভুল হবে না যে, যে-পদ্ধতির অনুসরণে তা সফল হলো তারই সাহায্যে বৈদিক সাহিত্যে টিকে থাকা আদিম ধ্যানধারণার অন্যান্য চিহ্নই বুঝতে পারা যাবে। শুধু তাই নয়, মানবজাতির ক্রমোন্নতি-পথের ঠিক কোন স্তরের চেতনায় লোকায়তিক-বামাচারের উৎস সে-কথা নির্ণয় করা যদি সম্ভব হয় তাহলে হয়তো তারই সাহায্যে অনুমান করা যাবে, বৈদিক সাহিত্যের বামাচারের স্মারকগুলিও ঠিক কোন ধরনের সমাজবিকাশের পরিচায়ক। অর্থাৎ কিনা, বামাচারের ওই স্মারকগুলিই হয়ে দাঁড়াতে পারে একটি নির্দিষ্ট সমাজ-সংগঠনের সাক্ষ্য। তার মানে অবশ্যই এই নয় যে, বৈদিক বামাচার ও লোকায়তিক বামাচার হুবহু একই রকমের। দু’-এর মধ্যে তফাত আছে : বৈদিক বামাচার মূলতই পুরুষপ্রধান—ঝোঁকটা শুধুই পুরুষের উপর, যা কিছু ভাবা হচ্ছে বা বলা হচ্ছে তা পুরুষের তরফ থেকে। যেমন ধরুন, ছান্দোগ্যের ঋষি বলছেন : কোনো স্ত্রীলোককেই পরিহার করবে না। বৃহদারণ্যকের ঋষি আরো এক-পা এগিয়ে যাচ্ছেন; বলছেন, নারী যদি মৈথুনে রাজী না হয় তাহলে কিলঘুঁষি এমনকি লাঠি মেরে তাকে রাজী করাতে হবে। উপনিষদ থেকেই এই পুরুষ-প্রাধান্যের আরো অনেক নজির তোলা যায়। এর তুলনায়, লোকায়তিক বামাচার মূলতই স্ত্রী-প্রধান। স্ত্রীই শক্তি, শক্তিই সব। এই তফাতের কারণ কী?—সে বিষয়ে পরে দীর্ঘতর আলোচনা তুলতে হবে।
আপাতত, বামাচারী চেতনার উৎস-সন্ধানেই অগ্রসর হওয়া যাক। অগ্রসর হবার একটা সূত্র পাওয়া গিয়েছে : গুণরত্ন-বর্ণিত লোকায়তিকদের রতি-উৎসব(২৮)।
সে-বর্ণনাকে ঠিকমতো বুঝতে হলে, নিছক পুঁথিপত্রের বেড়াজালের মধ্যে আবদ্ধ থাকা চলবে না। তাহলে, পুঁথির গণ্ডি পিছনে ফেলে বাস্তব পৃথিবীতেই বেরিয়ে পড়া যাক। দেখা যাক, গুণরত্ন-বর্ণিত ওই লোকায়তিক আচরণের সঙ্গে হুবহু মিল আছে—এমন কোনো দৃশ্য সত্যিই চোখে পড়ে কি না।
পড়ে। আপনি যদি সত্যিই বেরিয়ে পড়তে রাজী হন তাহলে স্বচক্ষে দেখতে আসতে পারবেন। খুব বেশি দূরও যেতে হবে না। বাংলা দেশের সাঁওতাল-অঞ্চল পর্যন্ত গেলেই হবে। পৌষ মাসে যাবেন। ওই সময়টাতেই সাঁওতালদের ওই রকমের উৎসব। কিন্তু মজা হলো, উৎসবটার নামের সঙ্গে আষাঢ় মাসের যোগাযোগ রয়েছে। তার কারণ, উৎসবটা বুঝি আগেকার কালে আষাঢ় মাসেই হতো। সাঁওতালদের স্মৃতিতে আজো সে-কথা টিকে রয়েছে। এই সময়-বদলটা অবশ্যই অহেতুক নয়। আধুনিক গবেষক অনুমান করছেন, এর সঙ্গে চাষবাসের উন্নতির সম্পর্ক আছে(২৯)। অর্থাৎ কিনা, আগেকার কালে তাদের কাছে আউশই ছিলো একমাত্র ফসল। বর্ষার সেই ফলস উপলক্ষেই তাদের উৎসবটা ছিলো বর্ষাকালে। তারপর, আমন বা হৈমন্তিক ফসল ফলাতে শেখবার পরে উৎসবের সময়টা বর্ষা বদলে হেমন্ত হলো।
ছোটোনাগপুরের(৩০) দিকেও যেতে পারেন। এ-ধরনের উৎসব শুধুমাত্র সাঁওতালদের মধ্যেই টিকে নেই। ছোটোনাগপুরের দিকে দেখবেন মুণ্ডা, হো প্রভৃতিদের মধ্যেও এ-উৎসব আজো কী ভাবে বর্তমান। তবে, ওদের উৎসবটা যদি দেখতে চান তাহলে আষাঢ় মাসে বরাবরই যেতে হবে। তার কারণ কি এই যে ওরা এখনো আমন-ফসলটাকে বড়ো ফসল মনে করতে শেখে নি?
