অবশ্যই মানি, বৈদিক সাহিত্যে বামাচারের বা কামাচারের স্মারককে সূত্র হিসেবে অবলম্বন করে লোকায়তিকদের কথা বোঝবার চেষ্টা করলে রাশি রাশি প্রশ্ন উঠবে। কেননা, বেদনিন্দুক বা নাস্তিক বলেই যাদের প্রধান পরিচয় বেদমন্ত্রের সাহায্যে তাদের কথা বুঝতে পারবার দাবিটা সরাসরি অসম্ভব মনে হবারই কথা। বিশেষত, আর্য-অনার্য মতবাদ রয়েছে—পণ্ডিত মহলে অনেকেরই ধারণা বৈদিক সাহিত্যে যে রকম বিশুদ্ধ আর্য-সাহিত্য বামাচারাদি তেমনিই বিশুদ্ধ অনার্য-ব্যাপার। তাই, এই সাহায্যে ওকে বোঝবার চেষ্টা একান্তই অসম্ভব।
আমরা কিন্তু বলতে চাই, তা নয়। শুধুই যে কিছুকিছু বেদমন্ত্রের সাহায্যে বেদনিন্দুকদের কথা বুঝতে পারা যায় তাই নয়, বেদনিন্দুকদের কিছুকিছু কথা বিচার করেও বৈদিক সাহিত্যকে বোঝবার অবকাশ রয়েছে। তার কারণ আমরা প্রথম পরিচ্ছেদেই আলোচনা করেছি : বৈদিক বা অ-বৈদিক যে-কোনো ধ্যানধারণাই হোক না কেন, প্রত্যেকটিরই উৎসে রয়েছে সমাজ-বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের কথা। এবং সমাজ-বিকাশের যে পর্যায়টির মধ্যে লোকায়তিক চেতনার উৎস বৈদিক মানুষেরাও এককালে সেই পর্যায়েই বাস করতেন, ফলে তাঁদের রচনায় সেই পর্যায়ের স্মারক টিকে থাকা নিশ্চয়ই অসম্ভব নয়। তাই, উত্তরকালে বেদপন্থী ও বেদনিন্দুকদের মতাদর্শে যতোই প্রভেদ দেখা দিক না কেন, বৈদিক সাহিত্যের স্মারকের সাহায্যেই ওই বেদনিন্দুকদের কিছুকিছু কথা বুঝতে পারার সম্ভাবনা সত্যিই রয়েছে। অবশ্যই এ-কথা বলতে গেলে বিদগ্ধ সমাজে যে-মতবাদ প্রায় স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে—অর্থাৎ আর্য-অনার্য বা আর্য-দ্রাবিড় মতবাদ—তার সংঙ্কীর্ণতা ঠিক কোথায় সে-প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা তোলা দরকার। কিন্তু শুরুতেই যদি এতো রকম সমস্যার জোটে জড়িয়ে পড়তে হয় তাহলে আর অগ্রসর হবার সম্ভাবনা থাকে না। তাই, আপাতত শুধু বামাচার বা কামাচারের কথাটা আরো একটু তলিয়ে দেখা যাক।
কথা হলো, কোনো এক যুগে,—কিংবা আরো সাবধানে বললে বলা উচিত মানব সমাজের ক্রমোন্নতির কোনো এক পর্যায়ে,–সন্তান উৎপাদন ও ধন-উৎপাদনকে মানুষ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দুটি ক্রিয়া বলে চিনতে শেখে নি। সে-যুগটা যাই হোক না কেন, সে-পর্যায়টা যাই হোক না কেন, বৈদিক সাহিত্যের সাক্ষ্যকে যদি আপনি গুরুত্ব দিতে রাজী হন তাহলে আপনাকে মানতেই হবে যে, বৈদিক মানুষেরাই এককালে ক্রমোন্নতির এ-রকম একটা পর্যায়ে বেঁচে ছিলো। তারই রাশি রাশি স্মারক রয়েছে বৈদিক সাহিত্যে। এ-কথা যদি আপনি না মানেন তাহলে আপনাকে বলতে হবে মৈথুন নিয়ে অমন প্রচণ্ড উৎসাহটা বৈদিক ঋষিদের পক্ষে অতি কদর্য কামবিকারেরই পরিচয়। আমরা আপনার কথায় সায় দিতে পারবো না। কেননা, আমরা দেখছি বৈদিক রচনায় যেখানে কামাচারের কথা সেখানে রসালো অশ্লীলতা উপভোগ করবার কোনো রকম লক্ষণই নেই। বরং এই বামাচার যে তাঁদের কাছে কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক ব্যাপার তার পরিচয় তাঁরা দিয়েছেন একে যজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করে, সামগানের সঙ্গে তুলনা করে। যজ্ঞ ও সামগানের সঙ্গে তুলনা করে। যজ্ঞ ও সামগান সম্বন্ধে আজকের দিনে আমরা যতো হালকা কথাবার্তাই বলতে শিখি না কেন, তাঁদের কাছে এগুলিই ছিলো জীবনের সর্বস্ব।
বেদে লেখা আছে,–কথাটা তাই মানতেই হবে। মানতেই হবে, ক্রমোনতির কোনো এক পর্যায়ে মানুষ সত্যিই মনে করেছিলো, মিথুনের দরুন শুধু সন্তান উৎপাদনই নয়, ধন উৎপাদনও সম্ভবপর। তাই, সমস্যা হলো : এ-পর্যায় সম্বন্ধে সংবাদ সংগ্রহ করা যাবে কোথা থেকে?
একবার উল্টো দিক থেকে চেষ্টা করা যাক। বেদনিন্দুকদের কথা বোঝবার আশায় বৈদিক সাহিত্যের সাহায্য নেওয়া গিয়েছে। এবার দেখা যাক বৈদিক সাহিত্যে বামাচারে ওই স্মারকগুলি মানব চেতনার ঠিক কোন স্তরের পরিচায়ক সে-কথা বোঝবার ব্যাপারে বেদনিন্দুকদের দিক থেকে এগোলে কি কোনো সুবিধে হতে পারে?
গুণরত্নের কথা বলেছি। লোকায়ত-সংক্রান্ত তাঁর কিছুকিছু মন্তব্যের উল্লেখ করেছেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী : লোকায়তিকেরা যোগী, তারা গায়ে ভস্ম মাখে, তারা বামাচারী, তারা কাপালিক। গুণরত্ন কিন্তু লোকায়তিকদের সম্বন্ধেই আরো কিছু কথা বলেছেন, মহামহোপাধ্যায় তার উল্লেখ করেন নি।
গুণরত্ন বলেছেন, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে লোকায়তিকেরা একত্র সমবেত হয়। তারা একত্রে মিলিত হয় এবং প্রমত্ত হয় নির্বিচার মৈথুনে।
বর্ষে বর্ষে কস্মিন যপি দিবসে সর্ব্বে সংভূত যথানাম নির্গমম্ স্ত্রীতিঃ অভিরম্যস্তে(২৭)…
বলাই বাহুল্য, লোকায়তিকদের সম্বন্ধে এই সংবাদটি দেবার পিছনেও গুণরত্নের আসল উদ্দেশ্যটা হলো তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচার করা। কিন্তু তা হোক। তবুও গুণরত্ন লোকায়তিকদের সম্বন্ধে এই যে খবরটি দিলেন এর জন্যে ভারতীয় দর্শনের প্রত্যেক ছাত্রই তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে। কেননা, এটুকু সংবাদের মধ্যে শুধুই যে লোকায়তিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎস সম্বন্ধে মূল্যবান ইঙ্গিত পাওয়া গেলো তাই নয়, বামাচাঈ ক্রিয়াকাণ্ডগুলি মানব সমাজের ঠিক কোন স্তরের পরিচায়ক সে-কথা অনুমান করবারও একটি সুযোগ পাওয়া গেলো।
গুণরত্নের দেওয়া এই তথ্যটি সম্বন্ধে ভালো করে ভেবে দেখুন। ব্যাপারটা কী? মানুষগুলো এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে, একত্রে পানাহার করছে, প্রমত্ত হয়ে উঠছে অবারিত মৈথুনে! একে কি কোন একরকম দলগত কামবিকার বলতে হবে নাকি? এখানেও সেই একই কথা। শুধুমাত্র একালের লাম্পট্য-ব্যবহারকে সম্বল করলে সেকালের আচরণকে বুঝতে পারা যাবে না।
