নিম্নোক্ত ঋকটি অপেক্ষাকৃত দুর্বোধ্য; সায়নভাষ্য থেকে অনুমান হয় এর মধ্যে কোনো আদিম জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠানের ইংগিত থাকা সম্ভব। তবুও আদিম সাম্যাবস্থার সাক্ষ্য হিসেবে ঋক্টি মূল্যবান বিবেচিত হতে পারে; কেননা এর মধ্যে সমবণ্টনের একটা ইংগিত পাওয়াও হয়তো অসম্ভব নয়।
যুযু্যতঃ সবয়সা তদিদ্বপুঃ সমানমৰ্থং বিতরিত্রতা মিথঃ।
আদীং ভগো ন হব্যাঃ সমস্মদা বোল্হর্ন রশ্মীস্ত্ সমযংস্ত সারথি ॥
অর্থাৎ, —পরস্পর সমান অর্থ বিতরণ করিতে প্রবৃত্ত হইয়া সমানবয়স্ক (ব্যক্তিগণ) তাহার (অগ্নির) শরীরকে যেমন স্ব স্ব ব্যাপারে নিযুক্ত করিতে চেষ্টা করে, ভগ আমাদিগের হব্যকে তদ্রুপ করেন, সারথি যেরূপ রশ্মিদ্বারা রথকে সংযত করে ॥ ঋগ্বেদ : ১.১৪৪.৩ ॥
নিম্নোক্ত ঋক্টিতে ভগ শব্দ অংশ বা share হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ঋক্টির প্রতি বৈদিক কবি নিশ্চয়ই বিশেষ গুরুত্ব অর্পণ করতে চেয়েছিলেন, কেননা ঋগ্বেদের দ্বিতীয় মণ্ডলে এই ঋকটিই সাতটি সূক্তে পাওয়া যায় :
নূনং সা তে প্রতি বরং জরিত্রে দুহীয়দিন্দ্র দক্ষিণা মঘোনী।
শিক্ষা স্তোতৃভ্যো মাতি ধগ্ভগো নো বৃহদ্বদেম বিদথে সুবীরাঃ।
অর্থাৎ, —হে ইন্দ্র, স্তোতাদিগের প্রতি দেয় দক্ষিণা তুমি দোহনপূর্বক আমাদের দাও। স্তোতৃদের শিক্ষা দাও, আমাদের ভগ পুর্ণ কর, আমরা বিশেষভাবে এই সভায় বীরপুত্রের জন্য তোমাকে অনুরোধ করি। ॥ ঋগ্বেদ : ২.১১.২১ : ২.১৫.১০ : ২.১৬.৯ : ২.১৭.৯ : ২.১৮.৯ : ২.১৯.৯ : ২.২০.৯ ॥
এবার অংশের আলোচনা করা যাক। অংশ ও তৎজাত শব্দ ঋগ্বেদে এগারো বার উল্লিখিত হয়েছে। অংশ মানে যে ভাগ বা share এ-বিষয়ে নিশ্চয়ই সন্দেহ নেই; কিন্তু অংশ শব্দ প্রসঙ্গে একটি বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। অংশ শব্দের ব্যবহারের সঙ্গে প্রায়ই যুদ্ধের প্রসঙ্গ দেখতে পাওয়া যায়। তাই অংশ শব্দ বিশেষ করে war booty-র share বা যুদ্ধে অর্জিত ধনসম্পদের ভাগ বোঝাতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে অনুমান করবার অবকাশ থাকে যে, অন্যান্য প্রাচীন সমাজের মতোই বৈদিক সমাজেও যুদ্ধেজেতা ধনসম্পদের উপর কারুর একার অধিকার ছিলো না; তাতেও সকলের অংশ বা ভাগ ছিলো।
বয়ং জয়েম ত্বজা যুতা বৃতমস্মাকমংশমুদবা ভরেভরে।
অর্থাৎ,–(হে ইন্দ্র), আমরা তোমার সহিত যুক্ত হইয়া শত্রুকে জয় করি। তুমি আমাদের অংশ রক্ষা কর ॥ ঋগ্বেদ : ১.১০২.৪ ॥
যাভির্ভরে কারমংশায় জিন্বথ…
অর্থাৎ, —যাঁহাদের (অশ্বিনীদ্বয়ের) সহায়তায় তুমি (অগ্নি) যুদ্ধে ধ্বনি করিয়া আমাদের অংশ জয় কর ॥ ঋগ্বেদ : ১.১১২.১ ॥
আ নস্তুজং রয়িং ভরাংশং ন প্রতিজানতে।
বৃক্ষং পক্কং ফলমন্ত্ৰীব গৃহহীন্দ্র সংপারণং বস্তু।
অর্থাৎ, —হে ইন্দ্র, আমাদের শক্রদের ধনের অংশ আমাদিগকে দিতে প্রতিজ্ঞা কর; যেমন অঙ্কুশহস্ত ব্যক্তি বৃক্ষ আন্দোলিত করিয়া পক্ষ ফল (আহরণ করে) সেইরূপ আমাদের ধন আহরণ কর।। ঋগ্বেদ : ৩.৪৫. ৪।।
দেবো ভগঃ সবিতা রায়ো অংশ ইন্দ্রো বৃত্ৰস্য সংজিতো ধনানাম্।
ঋভূক্ষা বাজ উত বা পুরুদ্ধিরবন্ধ নো অমৃতাসস্তুরাসঃ।
অর্থাৎ, —ভগ, সবিতা, বৃত্রের বিজেতা ইন্দ্র, জিত ধনের অংশ আমাদিগকে দিন। সেই মৃত্যুহীন (দেবগণ) ত্বরান্বিত হইয়া, বহুভাবে আমাদিগকে এবং আমাদের ধন ও অল্পকে রক্ষা করুন ॥ ঋগ্বেদ : ৫.৪২.৫।।
প্রাচীন গ্রীক-সাহিত্য বিচার করে অধ্যাপক জর্জ টম্সন যে-সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তা মনে রাখলে ঋগ্বেদের এই বিভাগ, ভগ, অংশ প্রভৃতির সাক্ষ্যগুলিকে বোঝবার সুবিধে হতে পারে। প্রধানত তিন রকম প্রসঙ্গে তিনি moira-র উল্লেখ লক্ষ্য করেছেন। এক, অল্পবিভাগ। দুই যুদ্ধের অর্জিত ধনের বিভাগ। তিন, বিভিন্ন ট্রাইব ও ক্লানের মধ্যে চাষের জমি বিভাগ। এবং তিনি বলছেন, এ-থেকে ট্রাইব্যাল-সমাজের তিনটি পর্যায়ের সমবণ্টন-ব্যবস্থা অনুমান করা যায়। প্রাচীনতম বণ্টন-ব্যবস্থা বলতে অল্প-বিভাগ, শিকারজীবী পর্যায় থেকেই এর শুরু। তারপর শিকার থেকে (পশুপালন এবং প্রধানতই পশুলাভের কামনায়) যুদ্ধ বিগ্রহের পর্যায়ে উপনীত হবার সময় থেকে, বন্টন বলতে প্রধানতই যুদ্ধে জিত গোসম্পদ প্রভৃতিরই বন্টন। সর্বশেষে, কৃষিজীবী পর্যায়ে পৌঁছে চাষের জমি বিভাগ বা বন্টন করবার ব্যবস্থা।
অধ্যাপক জর্জ টম্সনের এই সিদ্ধান্তকে প্রাচীন সমাজের সম-বণ্টন সংক্রান্ত সাধারণভাবে জানতে-পারা তথ্য হিসেবে গ্রহণ করে আমরা ঋগ্বেদের সাক্ষ্যগুলি বোঝবার চেষ্টা করবো।
অন্ন-বিভাগের কথা ঋগ্বেদে বিরল নয়; আমরা ইতিপূর্বে সে-বিষয়ে কিছু দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করেছি। এবং এমনকি আদিম শিকারজীবী পর্যায়ের বন্টন ব্যবস্থার কথাও যে বৈদিক ঋষিদের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুছে যায়নি তারই একটি চিত্তাকর্ষক সাক্ষ্য হিসেবে আমরা বৈদিক সাহিত্যে শ্বঘ্নিন শব্দের উল্লেখ পাই কিনা সে-বিষয়ে ভেবে দেখবার অবকাশ আছে। শ্বঘ্নিন বলতে একদিকে যেমন শিকারী বোঝায় আবার অপরদিকে তেমনি দূতকারকেও বোঝায়(৩০)। শিকারের সঙ্গে পাশার এই সম্পর্ক শিকারজীবী পর্যায়ের অক্ষের সাহায্যে (casting the lot) অন্ন-বন্টনের আদিম কৌশলটির ইতিহাসের ইংগিত দেয় কিনা, সে-বিষয়ে বেদবিদেরা আশা করি চিন্তা করবেন।
