যুদ্ধে-জিত ধন-বন্টনের কথাও ঋগ্বেদে বিরল নয়; আমরা অংশ শব্দটির সূত্রে বিশেষ করে এই ইংগিতটিরই সন্ধান করেছি।
বৈদিক আর্যরা প্রধানতই পশুপালক ছিলেন; তাই কৃষির জন্য জমিবিভাগের কথা বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে ততো বেশি করে বা ততো স্পষ্টভাবে পাবার কথা নয়। তবুও, আমরা একটু পরেই দেখতে পাবো ঋগ্বেদের অর্বাচীনতম অংশে—দশম মণ্ডলে—কৃষির সঙ্গে অক্ষের সম্পর্কের ইংগিত পাওয়া যায় এবং প্রাচীন সমাজের সমবণ্টন-কৌশল হিসেবে অক্ষের ব্যবহারকে যদি আমরা সাধারণভাবে জানতে-পারা তথ্য হিসেবে গ্রহণ করতে স্বীকৃত হই, তাহলে কৃষিপ্রসঙ্গে এই অক্ষের উল্লেখের পিছনে আমরা হয়তো ভূমিবণ্টন-ব্যবস্থার ইংগিত অনুসন্ধান করতে পারি।
কিন্তু এ-আলোচনা তোলবার আগে ঋগ্বেদের অক্ষ সংক্রান্ত তথ্যের উল্লেখ প্রয়োজন।
প্রাচীন সমাজে সম-বন্টনের কৌশল হিসেবে অক্ষের ব্যবহার চোখে পড়ে। —যার যা দান পড়বে সে তাই পাবে। অধ্যাপক জর্জ টম্সন(৩১) দেখাচ্ছেন, আদিম সাম্যসমাজের স্মারক হিসেবে এই কৌশলটির পরিচয়, এমনকি গ্রীসে নগররাষ্ট্র গড়ে ওঠবার পরেও গণতান্ত্রিক শাসন-নীতির অঙ্গ হিসেবে বহুলাংশেই বর্তমান ছিলো। বৈদিক সাহিত্যেও অক্ষ-প্রসঙ্গের অভাব নেই, যদিও আধুনিক বিদ্বানেরা(৩২) একে জুয়াখেলা অর্থেই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সেই অর্থই একমাত্র অর্থ কিনা তা ভেবে দেখবার অবকাশ আছে।
দশম মণ্ডলের অক্ষসূক্তে (ঋগ্বেদ : ১০.৩৪) নিশ্চয়ই জুয়াখেলার বর্ণনা রয়েছে এবং জুয়া অর্থে অক্ষের নিন্দাও রয়েছে। “যে-ব্যক্তি পাশা ক্রীড়া করে তাহার শত্রু তাহার উপর বিরক্ত, স্ত্রী তাহাকে ত্যাগ করে, যদি কাহারও কাছে কিছু যাঞ্চা করে, দিবার লোক কেহ নাই। যেরূপ বৃদ্ধ ঘোটককে কেহ মূল্য দিয়া ক্রয় করে না, সেইরূপ দ্যূতকার কাহারও নিকট সমাদর পায় না”— (ঋগ্বেদ : ১০.৩৪.৩)—ইত্যাদি, ইত্যাদি। এবং অতএব, “অক্ষৈঃ মা দীব্যঃ কৃষিম্ ইৎ কৃষস্ব” (১০.৩৪.১৩),—অর্থাৎ অক্ষের সাহায্যে কখনো জুয়া খেলো না, বরং কৃষিকাজ করো, ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিন্তু ঋগ্বেদের এই মণ্ডলই সবচেয়ে অর্বাচীন এবং আমরা দেখাবার চেষ্টা করবে, ঋগ্বেদের এই মণ্ডলটিতেই প্রাচীন প্রাক্-বিভক্ত সমাজ ভেঙে যাবার পরিচয় প্রকট হয়েছে। তাই দশম মণ্ডলে অক্ষকে যে-ভাবে জুয়াখেলায় প্রযুক্ত হতে দেখা যায় তা বৈদিক সাহিত্যে অক্ষের আদি-তাৎপর্য না হতেও পারে। তাছাড়া দ্রষ্টব্য হলো, জুয়াখেলার অর্থ ছাড়াও এই অক্ষমূক্তেই অক্ষের অন্য প্রয়োগ সংক্রান্ত কিছু কিছু ইংগিত আছে। অক্ষস্থক্তের ব্যাখ্যার ভূমিকায় সায়ন সর্বানুক্রমণী থেকে উদ্ধৃত করছেন, প্রাবেপাঃ সলূনা মৌজবাম্বাক্ষোহক্ষ কৃষিপ্রশংসা চাক্ষকিতবনিন্দ চ। অর্থাৎ, কিতব বা জুয়া অর্থে অক্ষের নিন্দা এবং অক্ষ-কৃষি-প্রশংসাই এই অক্ষমূক্তের মূল প্রতিপাদ্য। এ-কথার মানে যাই হোক না কেন অন্তত এটুকু নিশ্চয়ই বোঝা যায় যে, জুয়াখেলার অর্থ ছাড়াও বৈদিক মানুষদের কাছে অক্ষের একটা অন্য ব্যবহার জানা ছিলো। এবং অক্ষের অন্য কোনো ব্যবহারের কথা অনুমান না করলে নিম্নোক্ত সাক্ষ্যগুলিকেও নেহাতই বৈদিক যুগের জুয়াড়িদের মাত্রারিক্ত উচ্ছৃঙ্খলতা বলেই গ্রহণ করতে হয়। আমাদের যুক্তি হলো, বৈদিক সাহিত্য প্রাচীন বলেই আধুনিক ধ্যানধারণা দিয়ে বা আধুনিক জীবনের বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তার ব্যাখ্যা পাওয়ার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। আধুনিক লাম্পট্য-ব্যবহারের অনুরূপ হিসেবে বৈদিক বামাচারকে (পৃ. ১০২-১১২) বা আধুনিক সুঁড়িখানার আলোয় বৈদিক সুরাপানকে বোঝা যায় না। তেমনিই, আধুনিক জুয়াড়ির উপমান হিসেবে বৈদিক মানুষদের অক্ষ দেবতা এবং দ্যূতকার দেবতাকে (ঋগ্বেদ : ১০.৩৪) চেনবার চেষ্টা করা ভুল হবে। অর্থাৎ, কালক্রমে এই অক্ষত্ৰীড়াই যদিও জুয়াখেলায় পরিণত হয়েছিলো, তবুও বৈদিক সাহিত্যে অক্ষের প্রতি যে-সন্মান ও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তার পিছনে অক্ষের প্রাচীন মহিমার স্মারক থাকতে পারে।
অথৰ্ববেদে(৩৪) পাশার দান ফেলার সঙ্গে বরুণের নিয়ম প্রবর্তনের তুলনা করা হয়েছে; দ্যূতকার যে-ভাবে অক্ষের দান ফেলেন দেবতা বরুণও সেইভাবেই নিয়মের প্রবর্তক হন। এর মধ্যে নিশ্চয়ই অংশ-বন্টনের কথা নেই; কিন্তু পাশার দান পড়ার সঙ্গে অমোঘ নিয়মের—ঋতের—সম্পর্কও তুচ্ছ নয়।
তারই পরিচয় পাওয়া যায় শতপথব্রাহ্মণের রাজসূয় যজ্ঞের(৩৫) বর্ণনায়, যদিও বৈদিক সাহিত্যের অন্যান্য উল্লেখের মতো এই উল্লেখটিতেও পাশা বা অক্ষের ব্যবহার অনেকাংশেই দুর্বোধ্য। কিন্তু এটুকু বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, শতপথব্রাহ্মণের এই বর্ণনায় রাজা ন্যায় ও নিয়মের ধারক হবার প্রতিজ্ঞা প্রসঙ্গেই পাশার ছকগুলি হাতে গ্রহণ করেন। এর থেকে কি অনুমান করা যায় না যে, এখানেও অক্ষ জুয়ার আয়োজনে নয়, তার বদলে ওই অক্ষ ন্যায় ও নিয়মের সঙ্গে জড়িত?
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে অক্ষমূক্তেও অক্ষগুলি হাতে ধারণ করে ঋতের বা সত্য ও নিয়মের আনুগত্য অঙ্গীকার করবার ইংগিত রয়েছে; এবং এই ইংগিতকে শুধুমাত্র পাশাখেলার ব্যাপারে নিয়মনিষ্ঠ হবার অঙ্গীকার বলে কল্পনা করায় বাধা হলো, অক্ষকেই(৩৬) এখানে মহৎ গণের সেনানী এবং ব্রাতের রাজা বলে উল্লেখ করা হয়েছে :
