প্রাচীন গ্রীক-সংস্কৃতি প্রসঙ্গে অধ্যাপক জর্জ টমসনের এই মন্তব্যগুলি মনে রেখে এবার আমরা ঋগ্বেদের ধনবণ্টন-সংক্রান্ত তথ্যগুলি বোঝবার চেষ্টা করবো।
প্রথমত দেখা যাক, ঋগ্বেদে ধন-বিভাগের প্রসঙ্গ কতোখানি মৌলিক।
রায়ো বন্তারো বৃহতঃ স্তামাস্মে অস্তু ভগ ইন্দ্র প্রজাবান॥
অর্থাৎ –হে ইন্দ্র, আমরা ধনের বণ্টনকর্তা হইয়া মহান হইব। তুমি আমাদিগকে প্রজাযুক্ত ভগ দাও॥ ঋগ্বেদ : ৩.৩০.১৮ ॥
এখানে বণ্টনকর্তা বলতে “আমরাই”; ইন্দ্র প্রজাযুক্ত যে-ভগ দেবেন তা আমরা বণ্টন করে নেবো। তাই ভগ বলতে এখানে হয়তো ধন বা ঐশ্বর্যই। কিন্তু অন্তর দেখা যায় বৈদিক দেবতারাই বিভাগকর্তা বা বণ্টনকর্তা।
যো গা উদাজৎস দিবে বি চাভজন্মহীব রীতিঃ শবসাসরৎপৃথক্ ॥
অর্থাৎ —যিনি (ব্রহ্মণস্পতি) গরুগুলিকে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন, তিনিই নিজবলের দ্বারা মহাস্রোতের ন্যায় সেই গরুগুলিকে দেবতাদের মধ্যে ভাগ করিয়া দিলেন ॥ ঋগ্বেদ : ২.২৪.১৮ ॥
আ নঃ স্পার্হে ভজনতা বলব্যে যদীং সুজাতং বৃষণো বো অন্তি।
অর্থাৎ,—আমাদের অর্জিত ধনসমূহে আমাদিগকে ভাগধেয় কর, যেহেতু তোমরা (মরুৎগণ) সুজাত এবং কামবর্ষী ॥ ঋগ্বেদ : ৭.৫৬.২১ ॥
বিভক্তাসি চিত্রভানো সিদ্ধোরূর্মা উপাক আ সদ্যো দাণ্ডষে ক্ষরসি ॥
অর্থাৎ, —হে চিত্ৰভানু, তুমি যজমানদিগকে সদ্য (ধন) দান কর, তুমি যেন বিভাগকর্তা— সিন্ধু যেমন তাহার সমীপন্থ তরঙ্গগুলিকে বিভাগ করে, তদ্রুপ ॥ ঋগ্বেদ : ১.২৭.৬ ॥
বিভক্তারং হবামহে বসোশ্চিত্রস্য রাধসঃ সবিতারং নৃচক্ষসম্॥
অর্থাৎ,—বৈচিত্র্যযুক্ত ধনসমূহের বিভক্ত, ময়ূন্যের প্রকাশকারী সবিতাকে আহ্বান করি ॥ ঋগ্বেদ : ১.২২.৭ ॥
যদস্য ভাগং বিভজাসি নৃভ্য উষো দেবি মর্ত্যত্রা সুজাতে॥
অর্থাৎ, —হে সুজাতা দেবি উষা, মনুষ্যের রক্ষাকর্ত্রি, তুমি আজ মনুষ্যদিগের মধ্যে (ধন) ভাগ করিতে যাইতেছ॥ ঋগ্বেদ : ১.১২৩.৩॥
যুবামন্দ্রাগ্নী বসুনো বিভাগে তবস্তমা শুশ্রব বৃত্ৰহত্যে॥
অর্থাৎ, —ইন্দ্র ও অগ্নি, তোমরা দুইজন বৃত্রের অনলের জন্য অতিশয় বলপ্রকাশ করিয়াছিলে এবং ধন বিভাগ করিয়াছিলে॥ ঋগ্বেদ : ১.১০৯.৫ ॥
য আদৃত্যা পরিপন্থীব শূরোহষজ্বনো বিভজন্নেতি বেদঃ॥
অর্থাৎ, —যিনি সমাদরে পরিপন্থী যজ্ঞবিহীন ব্যক্তিদিগের ধন অপহরণপূর্বক ভাগ করিতে করিতে আসিতেছেন, সেই ইন্দ্র॥ ঋগ্বেদ : ১.১০৩.৬॥
(এখানে war booty-র বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বিভাগ-বর্ণন হচ্ছে; পরে আমরা এ বিষয়ে আরো দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করবো। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বিভাগ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জর্জ টমসনের আলোচনা দ্রষ্টব্য।)
প্রজাভ্যঃ পুষ্টিং বিভজন্ত আসতে রয়িমিব পৃষ্ঠং প্রভবন্তমায়তে॥
অর্থাৎ, —প্রজাদিগের মধ্যে ধন বিভক্ত করিয়া দিয়া (গৃহস্থগণ) গৃহে বাস করেন, যেমন গৃহাগত অতিথিগণকে ধন বিভক্ত করিয়া দেন, সেইরূপ॥ ঋগ্বেদ : ২.১৩.৪ ॥
ক্ষপাং বস্তা জনিতা সূর্যস্য বিভক্তা ভাগং ধিষণেব বাজম্॥
অর্থাৎ, —যিনি (ইন্দ্র) রাত্রির আচ্ছাদয়িত সূর্যের জনক এবং ঐশ্বর্ধশালীর ন্যায় অন্নের ভাগগুলি বিভক্ত করেন॥ ঋগ্বেদ : ৩.৪৯.৪॥
দেবং বো অদ্য সবিতারমেষে ভগং চ রত্নং বিভজন্তমায়োঃ॥
অর্থাৎ, —আজ সেই দেবতা সবিতার নিকট গমন করি, যিনি ভগ, রত্ন এবং আয়ুকে বিভাগ করিতে করিতে আসেন॥ ঋগ্বেদ : ৫.৪৯.১ ॥ (এর পরের ঋক্টিতেও সবিতার বর্ণনাতেই বলা হয়েছে—জ্যেষ্ঠং চ রত্নং বিভজন্তমায়োঃ।)
ভগো বিভক্ত শবসাবসা গমছুক্ষব্যচা অদিতিঃ শ্রোতু মে হবম্।
অর্থাৎ,–ভগ, অন্ন এবং রক্ষণ বিভক্ত করিয়া আগমন করুন এবং সর্বব্যাপী অদিতি আমার আহ্বান শুনুন ॥ ঋগ্বেদ : ৫.৪৬.৬ ॥
সত্রা মদাসস্তব-বিশ্বজন্যাঃ সত্রা রায়োহধ যে পার্থিবাস।
সত্রা বাজানামভবো বিভক্ত যদেবেষু ধারয়থা অসূৰ্যম্॥
অর্থাৎ,—(হে ইন্দ্র), তোমার পানজনিত শক্তি বিশ্বহিতের জন্যই; অধোদেশে যে ধনসমূহ আছে তাহাও (বিশ্বহিতের জন্যই)। তুমি প্রকৃতই অল্প এবং অয়ের বিভক্ত হইয়াছিলে এবং এইজন্যই তুমি দেবগণের মধ্যে বলবত্তম ॥ ঋগ্বেদ : ৬.৩৬.১ ॥
…ইন্দ্রঃ একো বিভক্তা তরণির্মঘানাম্।
অর্থাৎ, —ইন্দ্র ত্রাণকর্তা এবং ধনসমূহের একমাত্র বিভক্তা ॥ ঋগ্বেদ : ৭.২৬.৪ ॥
…মহো অর্ভস্য বসুনো বিভাগে।
উভ তে পূর্ণা বসুনা গভস্তী।
অর্থাৎ, —মহান ও অল্প (উভয়) ধনের বিভাগকালে তোমার (ইন্দ্রের) উভয় হস্ত ধনের দ্বারা পুর্ণ ছিল ॥ ঋগ্বেদ : ৭.৩৭.৩ ॥
যদদ্য দেবঃ সবিতা সুবাতি স্যামাস্য রত্নিনো বিভাগে॥
অর্থাৎ, —আজ যে দেব সবিতা আমাদিগকে দিতেছেন, আমরা সেই রত্নবানের বিভাগ কার্যে উপস্থিত থাকিব ॥ ঋগ্বেদ : ৭.৪০.১ ॥
ত্বং নো মিত্রো বরুণে ন মায়ী পিত্বো ন দস্ম দয়সে বিভক্তা।
অর্থাৎ, —মিত্র ও বরুণের ন্যায় মায়াযুক্ত হইয়া হে দর্শনীয় (ইন্দ্র), তুমি আমাদিগের অন্নের বিভক্ত ও দাতা হও ॥ ঋগ্বেদ : ১০.১৪৭.৫ ॥
তাহলে ঋগ্বেদের কবিতা ও গানগুলি প্রধানতই কামনার কবিতা ও গান। সে-কামনা প্রধানতই পার্থিব সম্পদের কামনা। এই পার্থিব সম্পদ একার জন্য নয়, সকলের জন্য : “আমার” জন্য চাওয়া নয়, “আমাদের” জন্য চাওয়া। সকলের জন্য বা সাধারণের জন্য এই সম্পদ সকলের মধ্যে বিভাগ করে দেবার কামনাও জানানো হয়েছে। এইভাবে সকলের মধ্যে অর্জিত ধন। বিভাগ করবার ব্যবস্থাও প্রাচীন প্রাক-বিভক্ত সমাজেরই বৈশিষ্ট্য।
