অধ্যাত্মবাদের আবির্ভাব-ইতিহাস প্রসঙ্গে আমরা এই বৈদিক ধ্যানধারণার ক্রমবিকাশ নিয়েই আলোচনা তুলবো। তার প্রধান কারণ হলো, প্রাক্-বিভক্ত সমাজ থেকে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের দিকে অগ্রগতির, —এবং তারই প্রতিবিম্ব হিসেবে প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী ধ্যানধারণার পক্ষে অধ্যাত্মবাদে পরিণতির—সুবিস্তীর্ণ সাহিত্য ওই বৈদিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই মুলভ। পরবর্তী পরিচ্ছেদে আমরা প্রধানত তারই আলোচনা করবো।
————————
৭৫৮. বঙ্গদর্শন, শ্রাবণ ১২৮১।
৭৫৯. চতুর্দশ বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের দর্শন শাখার সভাপতির অভিভাষণ।
৭৬০. সেন্ট পিটার্সবার্গ অভিধান দ্রষ্টব্য।
৭৬১. K. Marx C 177f. Contrast শঙ্কর : ব্রহ্মসূত্রভাষ্য ১. ২. ৪ । কালীবর বেদান্তবাগীশ ১:১০৭ ৷
৭৬২. F. Engels DN 288-9.
৩য় খণ্ড : ভাববাদ । ৪র্থ পরিচ্ছেদ : বরুণ—ভাববাদের উৎস-সন্ধানে
০১. বৈদিক আর্য ও আফ্রিকার পশুপালনজীবী ট্রাইব
অধ্যাপক উইন্টারনিংস্(১) অনুমান করছেন, বৈদিক আর্যদের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটের উপর দক্ষিণ আফ্রিকার দিন্ক এবং কাফির ট্রাইবদের মতোই ছিলো, আর তাই বৈদিক আর্যরাও এদের মতোই গোসম্পদকে চরম মূল্যবান মনে করতেন।
দিনক এবং কাফিরেরা প্রধানতই পশুপালক। কিন্তু সেই সঙ্গেই তারা চাষবাসও শুরু করেছে এবং ধাতুর ব্যবহার খানিকটা আয়ত্তে এনেছে। অর্থনৈতিক উন্নতির দিক থেকে আধুনিক ট্রাইবদের যে-স্তরবিভাগ করা হয় (পৃ. ৩০০) সে-বিভাগ অনুসারে আফ্রিকার এই ট্রাইবগুলি পশুপালনের দ্বিতীয় স্তরে পড়ে(২)। সমাজ-বিবর্তনের সাধারণ নিয়ম অনুসারে এইখান থেকেই অকৃত্রিম ট্রাইব্যাল-সংগঠনে ভাঙনের সূচনা দেখা যায়(৩)। অর্থাৎ একে প্রাক্বিভক্ত সমাজ ও শ্রেণীবিভক্ত সমাজের মধ্যবর্তী সীমানা মনে করা যায়— পিছনে প্রাক্-বিভক্ত সমাজের স্মৃতি, সামনে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের আভাস। দক্ষিণ আফ্রিকার এই ট্রাইবগুলির মধ্যে ক্লান-সংগঠন বা জ্ঞাতিভিত্তিক সংগঠন অনেকাংশেই অক্ষুণ্ণ থাকলেও এবং এমন কি এদের মধ্যে টোটেমবিশ্বাসের স্মারক অত্যন্ত প্রবল হলেও—ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাজশক্তির আভাস দেখা দিয়েছে। তারই প্রতিবিম্ব হিসেবে দেবলোকের কল্পনাও কিছু অংশে আধুনিক হয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি বা স্পষ্টভাবে নয়।
ভাষাতত্ত্বের সাক্ষ্য বিচার করে অধ্যাপক গর্ডন চাইল্ড(৪) অনুমান করছেন, প্রাচীন ইন্দো-ইয়োরোপীয়েরাও বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়বার সময়ে অর্থনৈতিক উন্নতির এই স্তরটিতেই পৌঁছেছিলেন। অর্থাৎ, তথাকথিত আর্যরাও সে সময়ে মূলতই পশুপালক, যদিও তারা তখন কিছুটা কৃষিকাজ ও ধাতুর ব্যবহার শিখেছেন। তাদের সমাজ-সংগঠনও জ্ঞাতিভিত্তিক বা ক্লান-সংগঠন। তাই তাদের অর্থনৈতিক জীবনকেও পশুপালনের দ্বিতীয় স্তর বলা হয়েছে।
এদিক থেকে, ভারতে আর্যোদয়-সংক্রান্ত মতবিরোধের মধ্যে প্রবেশ না করেও বলা যায় অধ্যাপক উইণ্টারনিৎস-এর উপরোক্ত অনুমান নিশ্চয়ই নির্ভুল। এবং এ-অনুমানের তাৎপর্যগুলি সত্যিই দুর্মূল্য। কেননা, বৈদিক আর্যদের সঙ্গে আফ্রিকার এই ট্রাইবগুলির অর্থনৈতিক উন্নতির সাদৃশ্য যদি মৌলিক হয় তাহলে আমাদের পদ্ধতি অনুসারে অনুমান করবার সুযোগ থাকে যে, প্রাচীনকালে বৈদিক আর্যরা মোটের উপর কী ভাবে জীবনযাপন করতেন তার অন্তত কিছুটা পরিচয় আজকের দিনেও আমাদের পক্ষে স্বচক্ষে দেখতে পাবার সুযোগ আছে। শুধু তাই নয়; অর্থনৈতিক অবস্থাই যদি ৷ সাংস্কৃতিক জীবনের প্রধান ভিত্তি হয় তাহলে আফ্রিকার ওই ট্রাইবগুলির সাংস্কৃতিক জীবন সংক্রান্ত জ্ঞান বৈদিক সংস্কৃতির উপরেও আলোকপাত করতে পারে।
আফ্রিকার দিনকদের সম্বন্ধে অধ্যাপক সেলিগ্ম্যান(৫) বলছেন, গোসম্পদই ওদের সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি; ফলে,
the desire to acquire a neighbour’s herds is the common cause of these inter-tribal raids which constitute Dinka warfare.
অধ্যাপক উইণ্টারনিৎস্(৬) বলছেন, ঠিক এই কারণেই বৈদিক সাহিত্যে
the old word for ‘war’ or ‘battle’ is originally ‘desire for cattle’ (gavisti).
বৈদিক আর্যদের মতোই আফ্রিকার এই ট্রাইবগুলির সমাজ-ব্যবস্থা পুরুষ-প্রধান। পশুপালনমূলক অর্থনীতির তাগিদেই যে এরা মাতৃপ্রাধান্যের পরিবর্তে পিতৃপ্রাধান্যের প্রচলন করেছে, সে-বিষয়ে আধুনিক বিদ্বানের আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন—অনেক ক্ষেত্রে পিতৃপ্রাধান্যের নিচে মাতৃপ্রাধান্যের ধ্বংসাবশেষ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে এবং উত্তরাধিকারসূত্রের মধ্যে মাতৃপ্রাধান্যের স্পষ্ট স্মারক টিকে থেকেছে(৭)। বৈদিক মানুষদের জীবনে পশুপালন-নির্ভরতা কী ভাবে আদিম মাতৃপ্রাধান্য বদলে পিতৃপ্রাধান্যের প্রবর্তন করেছিলো এ-বিষয়ে বিদ্বানেরা এখনো গবেষণা করেননি; আদিম মাতৃপ্রাধান্যের স্মারক হিসেবে অদিতির সাক্ষ্যকে গ্রহণ করা যায় কিনা তা ভেবে দেখবার অবকাশ আছে। কিন্তু এ-বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, যে-অবস্থায় বৈদিক সাহিত্য রচিত হয়েছিলো তা পুরোপুরি পুরুষপ্রধান— পশুপালন-নির্ভর বলেই পুরুষপ্রধান।
বৈদিক আর্যদের মতোই আফ্রিকার এই ট্রাইবদের মধ্যেও যজ্ঞ ও স্তোত্রের বহুল প্রচলন চোখে পড়ে; আধুনিক নৃতত্ত্ববিদেরা এই যজ্ঞ ও স্তোত্রকে sacrifices ও hymns আখ্যাই দেন। এদের যজ্ঞ প্রধানতই পশুযাগ এবং বৈদিক আর্যদের মতোই এদের পশুযাগেও মেধ্য পশুটির পেটের অংশই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বলে স্বীকৃত হয়। আফ্রিকার ট্রাইবদের পশুযাগ প্রসঙ্গে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বলা হয়েছে, the contents of the large intestine of the victim are scattered about and over this mound(৮); কিংবা, at the yearly sacrifice, one man, in whom the ancestral spirit is immanent, kills a sheep or a bull, and smears its blood and the contents of the large intestine upon the grave(৯), ইত্যাদি। বৈদিক পশুযাগের বেলায় পশুটিকে বধ করবার পর “অধ্বর্যু পেট চিরিয়া বপা বাহির করিয়া লন। তাঁহার সহকারী প্রতিপ্রস্থাতা দুইখানা কাঠে সেই বপা লইয়া শামিত্র অগ্নিতে তপ্ত করেন; পরে উত্তরবেদির নাভিস্থিত আহবনীয় অগ্নির উপরে ধরিয়া থাকেন। অগ্নির উত্তাপে বপ৷ গলিয়া বিন্দুবিন্দু আগুনে পড়িতে থাকে। অধ্বর্যু সঙ্গে সঙ্গে বপার উপর ঘি ঢালেন। সেই বপার কিয়দংশ যথাবিধি আগ্ৰীমন্ত্র পাঠের পর আগুনে ফেলিয়া অন্তিম প্রযাগ যাগ সম্পন্ন হয়। বপার অবশিষ্ট প্রধান যাগের জন্য রাখিয়া দেওয়া হয়”(১০)। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে(১১) বলা হয়েছে যজ্ঞে এই পশুর বপাটিই প্রধানতম অঙ্গ বলে বিবেচিত : “অনন্তর মনুষ্যগণ ও ঋষিগণ যজ্ঞ জানিবার উদ্দেশে যজ্ঞের কোন চিহ্ন দেখিব বলিয়া দেবগণের যজ্ঞভূমিতে আসিয়াছিলেন। তাঁহারা (যজ্ঞভূমির) নিকটে বিচরণ করিতে করিতে অঙ্গহীন (বপাহীন) পশুকে শয়ান (যজ্ঞভূমিতে পতিত) অবস্থায় প্রাপ্ত হইলেন এবং বুঝিলেন, এই যে বপাটুকু তাহাই পশু। সেইজন্য এই যে বপাটুকু তাহাই পশু”।
