লোকায়তিক অচেতনকারণ-বাদের তাৎপর্য বোঝবার আশায় আমরা অধ্যাত্মবাদ বা চেতনকারণ-বাদের উৎস নিয়ে আলোচনা তুলবো। ঘুরিয়ে বা নেতিমূলকভাবে হলেও এ-আলোচনা লোকায়তিক বস্তুবাদের উপর আলোকপাত করতে পারে। কেননা, ধ্যানধারণার ক্রমবিকাশের ইতিহাসে এই চেতনকারণ-বাদ যে-পর্যায়টিকে পিছনে ফেলে এসেছে সেই পর্যায়টিই হলো ওই লোকায়তিক প্রাক-অধ্যাত্মবাদ বা অফুট বস্তুবাদ।
কিন্তু যে-হেতু আমরা চেতনকারণ-বাদের আবির্ভাবকে শ্রেণীসমাজ-জনিত জ্ঞান ও কর্মের বিচ্ছেদের পরিণাম হিসেবেই বোঝবার চেষ্টা করবো, সেই হেতু আমাদের পক্ষে প্রথমে সাধারণভাবে শ্রেণীসমাজের উৎপত্তি-সংক্রান্তু ঐতিহাসিক নিয়মের পটভূমিটিকে মনে রাখা প্রয়োজন। উৎপাদনকৌশলের উন্নতিই আদিম প্রাক্-বিভক্ত সমাজ থেকে শ্রেণীবিভাগের দিকে অগ্রগতির মূল কারণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উৎপাদন-কৌশলের উন্নতির ঠিক কোন বৈশিষ্ট্যটি থেকেই মানবসমাজে ক্রমশ শ্রেণীবিভাগ পরিস্ফুট হয়ে উঠতে লাগলো? এঙ্গেলস্ দেখাচ্ছেন, পৃথিবীর সমস্ত মানবজাতির বেলাতেই হুবহু একরকম নয়। কোথাও বা কৃষিকাজের উন্নতি থেকে, আবার কোথাও বা পশুপালনের উন্নতি থেকে শ্রেণীবিভক্ত (ও রাষ্ট্রশক্তি-শাসিত) সমাজের উদ্ভব। কেননা, একদিকে যেমন কৃষিকাজের উন্নতি, অপরদিকে তেমনি পশুপালনের উন্নতি থেকেই মানুষের পক্ষে উদ্ধৃত্ত-উৎপাদনের ক্ষমতা প্রভূত পরিমাণে বেড়ে গেলো। (পৃ. ৩০০ দ্রষ্টব্য)।
আমেরিকার ইরোকোয়া নামের আদিবাসীরা কৃষি-উন্নতির পথ ধরেই প্রাক্-বিভক্ত সমাজের সীমারেখা পেরিয়ে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের দিকে অগ্রসর হবার উপক্রম করেছিলো; সেই অবস্থাতেই কলম্বাসের অনুগামীদের আক্রমণে তাদের অগ্রগতি নিরুদ্ধ হয়। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সিন্ধু-উপত্যকার ধুলোর নিচে এই অগ্রগতির কাহিনী নিশ্চয়ই ঢাকা পড়ে রয়েছে। কেননা, ওখানের প্রত্নতত্ত্বমূলক নিদর্শনগুলির মধ্যে একদিকে আমরা খুঁজে পাচ্ছি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র-শক্তি এবং শ্রেণীশোষণের পরিচয়, আবার অপরদিকে দেখা যাচ্ছে কৃষিউৎপাদনই ছিলো ওই নাগরিক জীবনের প্রধানতম সম্পদ। দ্রষ্টব্য এই যে, ওই শ্রেণীশোষণ ও কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র-শক্তির পর্যায়ে পৌঁছেও সিন্ধুসভ্যতার মানুষগুলির চেতনা থেকে মাতৃপ্রধান ধ্যানধারণার স্মৃতি সম্পূর্ণ মুছে যায়নি। অবশ্যই আদি-তন্ত্র ও আদি-সাংখ্যের মতো এই মাতৃপ্রধান ধ্যানধারণা তখনো প্রাক-অধ্যাত্মবাদ বা অচেতনকারণ-বাদের পর্যায়েই ছিলো কিনা, তা খুবই সন্দেহের কথা। বরং রাষ্ট্র-শক্তি ও শ্রেণীশোষণের পটভূমিকায় টিকে থাকবার সময় এগুলির পক্ষে অধ্যাত্মবাদী চেতনার অঙ্গীভূত হওয়াই স্বাভাবিক। তবুও মাতৃপ্রাধান্যমূলক ধ্যানধারণার সঙ্গে কৃষি-আবিষ্কারের সম্পর্ক যে কতো ঘনিষ্ঠ এবং মানবচেতনায় এই মাতৃপ্রধান ধ্যানধারণার প্রভাব যে কতো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, হরপ্পা-মোহেনজোদারোর প্রত্নতত্ত্বমূলক নিদর্শনগুলিই তার পরিচায়ক। অর্থাৎ, সিন্ধুসভ্যতা নিশ্চয়ই রাতারাতি গড়ে ওঠেনি; তার পিছনেও একটা দীর্ঘযুগের ক্রমোন্নতির ইতিহাস অনুমান করতে আমরা বাধ্য। সে-ইতিহাস নিশ্চয়ই কৃষিকাজ আবিষ্কার থেকে শুরু করে কৃষিকর্মের ওই অতোখানি উন্নত পৰ্যায় পর্যন্ত ব্যাপৃত, যে-পর্যায়ে পৌঁছে কৃষিজাত উদ্ধৃত্তের উপর নির্ভর করে অমন নগরজীবন ইত্যাদি গড়ে তোলা সম্ভবপর। অতএব অনুমান করবার সুযোগ আছে যে, সিন্ধু-উপত্যকায় যে-মাতৃপ্রধান ধ্যানধারণার পরিচয় পাই, তারও আদিরূপ আদি-তন্ত্রের মতোই প্রাক্-অধ্যাত্মবাদীই ছিলো, যদিও যে-পটভূমিকায় মাতৃপ্রধান ধ্যানধারণার এই স্মারকগুলি পাওয়া গিয়েছে, সেখানেও এগুলির পক্ষে ওই আদিম প্রাক-অধ্যাত্মবাদসূচক হবার সম্ভাবনা নিশ্চয়ই নেই।
তন্ত্রের দুটো দিক। মাতৃপ্রধান ও প্রাক্-আধ্যাত্মিক। কৃষি-আবিষ্কারজাত ধ্যানধারণা বলেই তা মাতৃপ্রধান। প্রাক্-বিভক্ত-সমাজ-জাত বলেই তা প্রাক্-আধ্যাত্মিক। কৃষি-আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে মানব-সমাজ শ্রেণী-বিভক্ত হয়নি।
অপরপক্ষে, প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী ধারণামাত্রেই মাতৃপ্রধান হতে বাধ্য নয়। তার কারণ, প্রাক্-বিভক্ত সমাজমাত্রই কৃষিনির্ভর—বা অনুন্নত পর্যায়ের কৃষিনির্ভর—হতে বাধ্য নয়। এ-আলোচনার জন্য প্রাক্-বিভক্ত সমাজ ছেড়ে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের দিকে অগ্রসর হবার দ্বিতীয় পথটির কথা উত্থাপন করা প্রয়োজন।
আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি (পৃ. ৩০০–৩০২), বৈদিক মানুষদের ইতিহাস এই পথটির পরিচায়ক। পশুপালনের উন্নতির উপর নির্ভর করেই তারা প্রাক্-বিভক্ত সমাজ ছেড়ে শ্রেণীসমাজের দিকে অগ্রসর হতে পেরেছিলো। পশুপালন-নির্ভর সমাজ পিতৃপ্রধান, বৈদিক ধ্যানধারণাও তাই পুরুষ-প্রধান (পৃ. ৩২০—৩২৮)। কিন্তু পুরুষ-প্রধান এই ধ্যানধারণার আদিপর্যায়ের মধ্যে প্রাক-অধ্যাত্মবাদী চেতনার পরিচয় পাওয়া যায় (পৃ. ১০২— ১১২ এবং পৃ. ১৫১–১৫২); সেই দিকটি হলো বৈদিক সমাজের প্রাক্-বিভক্ত পর্যায়ের স্বাক্ষর। কেননা, প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী ধ্যানধারণায় প্রাক্-বিভক্ত সমাজের প্রতিবিম্ব : কৃষি-নির্ভর প্রাক্-বিভক্ত সমাজের ধ্যানধারণা মাতৃপ্রধান, পশুপালন-নির্ভর প্রাক্-বিভক্ত সমাজের ধ্যানধারণা পুরুষপ্রধান–কিন্তু দুই-ই প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী। এবং এইদিক থেকেই বুঝতে পারা সম্ভব, বৈদিক চিন্তাধারার সঙ্গে উত্তরযুগে লোকায়তিক চিন্তাধারার যতোই পার্থক্য থাকুক না কেন, বৈদিক চিন্তাধারারও প্রাক্-আধ্যাত্মবাদী অর্থে একটা লোকায়তিক অতীত ছিলো।
