তন্ত্রের দেহতত্ত্ব এবং সাংখ্যের প্রধানকারণবাদ এই দ্বিতীয় অর্থটির উপর আলোকপাত করে। মানবদেহের অনুরূপ হিসেবেই তন্ত্রে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে চেনবার প্রচেষ্টা দেখা যায়। ফলে উত্তরকালে তন্ত্রের উপর অধ্যাত্মবাদ ও ভাববাদের প্রলেপ যতোই পড়ক না কেন, তার আদিরূপটি ওই দেহবাদ বা বস্তুবাদই—সে-বস্তুবাদ যতো মূক, অব্যক্ত ও অচেতন হোক না কেন, যতোই অসম্ভব হোক না কেন তার বাস্তব জ্ঞানের দৈন্য। আদি-সাংখ্যের প্রধানকারণবাদ বা অচেতনকারণবাদ এই অফুট বস্তুবাদেরই পরিচ্ছন্ন দার্শনিক সংস্করণ, এবং বৈদান্তিক বা চেতনকারণবাদী চিন্তাধারার প্রধানতম প্রতিপক্ষ।
আমরা যে-চিন্তাধারাকে লোকায়ত বলে সনাক্ত করবার চেষ্টা করেছি বস্তুবাদ ছাড়াও তার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নারীপ্রাধান্য বা মাতৃপ্রাধান্য। আমরা ইতিপূর্বেই এই বৈশিষ্ট্যটির ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করেছি। বর্তমানে আমরা লোকায়তিক চিন্তাধারার বস্তুবাদমূলক বৈশিষ্ট্যের আলোচনা উত্থাপন করবো।
আমাদের প্রধান প্রতিপাদ্য হবে, প্রাক্-বিভক্ত সমাজের স্বাক্ষর বহন করছে বলেই লোকায়ত-মত প্রাক-অধ্যাত্মবাদী, এবং সেই অর্থেই অচেতনকারণবাদ বা বস্তুবাদ। এবং আমাদের মূল যুক্তি হবে, চেতনকারণ-বাদ বা ভাববাদের যেটা বাস্তব ভিত্তি (material basis), প্রাক্-বিভক্ত সমাজে তার বিকাশ সম্ভব নয় অতএব সে-পর্যায়ের ধ্যানধারণাও চেতনকারণ-বাদ বা ভাববাদে পরিণত হবার সুযোগ পায় না। অর্থাৎ, লোকায়তর অচেতনকারণ-বাদকে বোঝবার উদ্দেশ্বেই আমাদের প্রধানতম আলোচ্য হবে চেতনকারণ-বাদের জন্মকাহিনী।
ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে চেতনকারণ-বাদের আবির্ভাব কাহিনী নিয়ে আলোচনা তোলবার আগে সাধারণভাবে চেতনকারণ-বাদের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
চেতনকারণ-বাদের মূল কথাটা কী? চিন্তা বা ধারণা বা জ্ঞান বা মন বা ইন্দ্রিয়ানুভূতি—এককথায় কোনো-না-কোনো প্রকার চেতন-পদার্থই—চরম সত্য বা পরম সত্তা। যা-কিছু সত্য, যা-কিছু বাস্তব তা এর উপর নির্ভরশীল হিসেবে, এরই দাবি মিটিয়ে, তবে সত্য বা বাস্তব। অতএব তথাকথিত বহির্বাস্তব, চেতন-নিরপেক্ষ অর্থে সত্য নয়। চেতনা বা মানবসত্তার দাবি মেটানো-না-মেটানোর উপরই সবকিছুর সত্তা নির্ভরশীল।
অবশ্যই দর্শনের ইতিহাসে ভাববাদ বা চেতনকারণ-বাদের রূপ সর্বত্রই এক নয়। কিন্তু উপরোক্ত যুক্তিটিই চেতনকারণ-বাদমাত্রের মূল ভিত্তি। বিভিন্ন চেতনকারণ-বাদী দার্শনিক এই কাঠামোটির ভিতরেই বিভিন্নভাবে তাঁদের মন্তব্য ব্যক্ত করেছেন।
চেতনাই সর্বশক্তিমান,—অষ্টার মতো। মানুষের ধ্যানধারণায় এ-জাতীয় কথা আবির্ভাব হবার বাস্তব সর্ত কী? জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে সম্পর্ক বিচ্ছেদ; শুধু তাই নয়, জ্ঞানের তুলনায় কর্মকে হেয় বা নিম্নবৃত্তি বলে মনে করা। কেননা, কর্মের মধ্যে বহির্বাস্তবের অবধারিত যাথার্থ্যের অনিবার্য স্বীকৃতি(৭৬১); কর্ম বাদ দিয়ে বিশুদ্ধ জ্ঞানের উপর নির্ভর করে সত্যনিরূপণের প্রচেষ্টা তাই বহির্বাস্তবের যাথার্থ-স্বীকৃতির দায়মুক্ত। তখন চেতনাই চরম সত্য, সর্বশক্তিমান, সর্বনিয়ন্ত।
আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি (পৃ. ৭৯–৮৬) আদিম প্রাক্-বিভক্ত সমাজের ধ্যানধারণা অনিবার্য ঐতিহাসিক কারণে এই পর্যায়ে পৌঁছতে পারে না। কেননা, উৎপাদন-কৌশলের দৈন্য বা অনুন্নতিই সে-সমাজের ভিত্তি—এই দৈন্যের দরুনই উদ্ধৃত্ত-উৎপাদন সম্ভব নয়, তাই উদ্ধৃত্তজীবী শ্রেণীর আবির্ভাবও সম্ভব নয়। শ্রমে অংশগ্রহণ করবার দায়িত্ব সকলেরই। আর তাই মানুষের ধ্যানধারণাও বহির্বাস্তবের যাথার্থ্য-স্বীকৃতির দায়মুক্ত নয়। উৎপাদনকৌশলের উন্নতির ফলে উদ্ধৃত্ত-উৎপাদন—এবং অতএব উদ্ধৃত্তজীবী শ্রেণীর আবির্ভাব—হবার পরই বহির্বাস্তব এই শ্রেণীর মনের চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়েছে আর তখন থেকেই মানুষের মাথায় এ-যুক্তির আবির্ভাব হয়েছে যে, মনের চাহিদাই—চেতনার চাহিদাই—সর্বশক্তিমান, জগৎ-নির্মাতা। মিশরের পুরোহিত-রাজ পিরামিডের কথা ভাবলেন, বহির্জগতে গগন-চুম্বী পিরামিড গড়ে উঠলো—বহির্জগৎ মনের দাবি মানলো। কেননা, যে লক্ষ মানুষের কায়িক শ্রম এই অসাধ্য-সাধন করতে পেরেছে তারা দাস, তারা হীন, তারা নীচ—সমাজের সদর-মহলে তাদের স্থান নেই, আর তাই সদর-মহলের ধ্যানধারণায় তাদের ওই অবদানটারও স্বীকৃতি নেই।
In the face of all these creations, which appeared in the first place to be products of the mind, and which seemed to dominate human society, the more, modest productions of the working hand retreated into the background, the more so, since the mind that plans the labour-process…was able to have the labour that had been planned, carried out by other hands than its own. All merit for the swift advance of civilization was ascribed to the mind…and so there arose, in the course of time, that idealistic outlook on the world which, especially since the decline of the ancient world, has dominated men’s minds.(৭৬২)
আমরা দেখেছি (পৃ. ৩১–৩৩) লোকায়তিকদের ধ্যানধারণা এইভাবে শ্রমের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পায়নি, কেননা বার্তা বা কৃষিকাজই তাদের কাছে প্রধানতম বিদ্যা। আর তাই তাদের চেতনাও মুক্তি পায়নি বহির্বাস্তবের যাথার্থ্য-স্বীকৃতির দায়িত্ব থেকে। প্রাচীন সমাজের সেই পর্যায়টি—মেয়েরা যখন কৃষিকাজ আবিষ্কার করে নিজেদের ফলপ্রসূতার অনুরূপ হিসেবেই প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতাকে বোঝবার চেষ্টা করছে, এবং নিজেদের দেহের উপমান হিসেবেই প্রকৃতিকেও বুঝতে চেষ্টা করছে—প্রকৃত-পক্ষে প্রাক্-বিভক্ত সমাজেরই একটি পর্যায়। এই কারণেই বার্তাকেন্দ্রিক ওই ধ্যানধারণাও প্রাক্অধ্যাত্মবাদী, এবং সেই অর্থে বস্তুবাদী—সে-বস্তুবাদ যতো অফুট ও প্রাকৃতই হোক না কেন।
