তাহলে তন্ত্র, যোগ, সাংখ্য,—এবং ব্যাপক অর্থে লোকায়তিক ধ্যানধারণা,—এগুলির উৎস অনুসন্ধান করতে করতে আমরা যদি সুদূর অতীতে ফিরে যেতে পারি তাহলে কিসের পরিচয় পাবো? কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস এবং জাদু-অনুষ্ঠান। তবুও তন্ত্র, সাংখ্য ও যোগ ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে শুধুমাত্র অতীতের ব্যাপার নয়; সাম্প্রতিক যুগেও এদের প্রভাব ব্যাপক ও গভীর। এ-ঘটনার ব্যাখ্যা কী? আমাদের দেশের বাধাপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক বিকাশ : সামগ্রিকভাবে দেশের মানুষ কৃষিকাজের প্রাথমিক পর্যায়কে পিছনে ফেলে খুব বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারেনি। তাই সে-পর্যায়ের ধ্যানধারণা ও সাধনপদ্ধতির স্মারক এমন গভীর ও ব্যাপকভাবে সাম্প্রতিক যুগ পর্যন্ত টিকে থেকেছে। বর্তমানকালেও তান্ত্রিক ধ্যানধারণা ও আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপক প্রভাব প্রসঙ্গে আমরা ইতিপূর্বে দীর্ঘভাবে আলোচনা করবার চেষ্টা করেছি। বর্তমানে আমরা তার সঙ্গে শুধুমাত্র একটি কথা যোগ করতে চাই। আদিসাংখ্যকে যেহেতু তান্ত্রিক তত্ত্বেরই দার্শনিক সংস্করণ হিসেবে গ্রহণ করবার সুযোগ রয়েছে, সেইহেতু আমাদের দেশে আধুনিক যুগেও সাংখ্যদর্শনের বিপুল ও গভীর প্রভাবকে ব্যাখ্যা করবার জন্যে স্বতন্ত্র প্রকল্পের প্রয়োজন নেই।
“যখন গ্রামে গ্রামে, নগরে মাঠে জঙ্গলে শিবালয়, কালীর মন্দির দেখি, আমাদের সাংখ্য মনে পড়ে; যখন দুর্গা কালী জগদ্ধাত্রী পূজার বাদ্য শুনি, আমাদের সাংখ্যদর্শন মনে পড়ে”।
দুর্গা, কালী জগদ্ধাত্রী–দেবীনামের তালিকা নিশ্চয়ই দীর্ঘতর করা যায়। কয়েকটি নামের বিশ্লেষণ আমরা ইতিপূর্বে করেছি; অন্নপূর্ণা, শাকম্ভরী, ভগবতী। বঙ্কিমচন্দ্রের মন্তব্য অনুসারে এরা সকলেই সাংখ্যের প্রকৃতি। আমাদের যুক্তিও এদিক থেকে স্বতন্ত্র নয়। কেবল আমরা আরো বলতে চাই যে, সাংখ্যের ওই প্রকৃতিতত্ত্বকে, কিংবা এই দেবীগুলিকে ঠিকমতো বুঝতে হলে সমাজবিকাশের এমন এক স্তরে ফিরে যেতে হবে যেখানে মেয়েরা বড়ো, আর যে-পর্যায়ের মানুষদের ধারণায় নারীর উৎপাদিক-শক্তি আর প্রাকৃতিক উৎপাদিক-শক্তি একই সূত্রে বাধা এবং পরস্পরের উপর প্রভাবশীল। এই পর্যায়ের কথা আমাদের ঐতিহাসিকেরা এখনো সম্যকভাবে উদ্ধার করেননি; ফলে তন্ত্র ও সাংখ্যের অনেক আদিম তত্ত্ব আজো আমাদের কাছে রহস্যময় ও ভূর্বোধ্য। শুধু তাই নয়; সমাজবিকাশের সেই পর্যায়টি নিয়ে আধুনিক ঐতিহাসিকেরা যেদিন সম্যকভাবে বিচার করবেন, সেইদিন আমরা আরো স্পষ্টভাবে জানতে পারবো—
অনেক হাজার বছর আগে সিন্ধুসভ্যতার মানুষেরা, কোন্ আদিম বিশ্বাসের প্রভাবে ওই সব ছোটোছোটো পোড়ামাটির মাতৃমূর্তি গড়ায় মন দিয়েছিলো?
কোন আদিম বিশ্বাসের প্রভাবে, আজো আমাদের গ্রামাঞ্চলে এ-জাতীয় মূর্তি রচনার বিরাম নেই?
কোন আদিম বিশ্বাসের প্রভাবে, আমাদের বাংলা সাহিত্য শক্তি, ডোম্বী, রজকী, শবরী, নৈরামণি, সহজসুন্দরী প্রভৃতির মাহাত্ম্যে এমন ভরপুর হয়ে উঠেছিলো?
এই আদিম বিশ্বাস ও তার বাস্তব ভিত্তিকে যেদিন স্পষ্টভাবে চিনতে পারা সম্ভব হবে, সেইদিনই আমরা সাংখ্য-দর্শনের আদিরূপটির সমস্ত বৈশিষ্ট্যও হৃদয়ঙ্গম করবার পথে অগ্রসর হবো।
কিন্তু এই বিষয়গুলিকে সম্যকভাবে চিনতে হলে আমাদের নিজেদের মনের দুটি সংস্কারের সমালোচনা করবার সাহসও অর্জন করতে হবে। এক : পিতৃপ্রধান সমাজের সংস্কার—কেননা, তন্ত্র, সাংখ্য প্রভৃতি ধ্যানধারণায় মাতৃপ্রধান সমাজেরই স্বাক্ষর টিকে আছে। দুই : সাধারণভাবে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সংস্কারও। কেননা, তন্ত্র, সাংখ্য প্রভৃতি যে-ধ্যানধারণাকে ব্যাপক অর্থে আমরা এখানে লোকায়তিক বলে গ্রহণ করবার চেষ্টা করছি, সেগুলি শুধুই নারীপ্রাধান্যের পরিচায়ক নয়; তাছাড়াও এগুলি হলো প্রাক-অধ্যাত্মবাদী— এবং সেই অর্থে বস্তুবাদী—ধ্যানধারণাও। এবং আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো যে, এই জাতীয় ধ্যানধারণার প্রাক-অধ্যাত্মবাদী বা বস্তুবাদী দিকটির মধ্যে প্রাক্-বিভক্ত সমাজেরই প্রতিবিম্ব খুঁজে পাওয়া যায়।
————–
৭৪৪. S. N. Dasgupta op. cit. 3:527.
৭৪৫. মৈত্রায়নীয় উপনিষদ ৭.৮.৯ ।
৭৪৬. বিষ্ণুপুরাণ ৩.১৮.১৪-২৬।
৭৪৭. গীতা ১৬.৬ |
৭৪৮. ঐ ১৬.৮ ।
৭৪৯. কারিকা ৭০ ৷
৭৫০. SBE 14:260sq.
৭৫১. ঋগ্বেদ ষষ্ঠ মণ্ডল ।
৭৫২. ঋগ্বেদ ৬.২৭.৫।
৭৫৩. ঋগ্বেদ ৬.২৭.৬ দ্রষ্টব্য।
৭৫৪. M. Wheeler IC 18.
৭৫৫. ঋগ্বেদ ১. ৫১.৫ ৷
৭৫৬. গুণরত্ব : তর্করহস্যদীপিকা ৩০০।
৭৫৭. E. H. Johnston ES দ্রষ্টব্য ।
৪৩. প্রাক-বিভক্ত সমাজ ও প্রাক-অধ্যাত্মবাদী চেতনা
লোকায়ত, তন্ত্র, সাংখ্য—আমরা দেখাবার চেষ্টা করেছি কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসের মধ্যেই এই ধ্যানধারণাগুলির উৎস, এবং এ-দেশের উৎপাদন কৌশলের বিকাশ অনেকাংশে বাধাপ্রাপ্ত বলেই অপেক্ষাকৃত অনুন্নত পর্যায়ের কৃষিকাজই এখানে প্রধানতম জীবনোপায় হয়েছে। ফলে তারই উপর প্রতিষ্ঠিত ওই ধ্যানধারণাগুলিই দেশের সংস্কৃতিতে বহু দীর্ঘদিন ধরে গভীর ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। লোকায়ত-মতকে এইদিক থেকেই লোকেষু আয়ত—অর্থাৎ, জনসাধারণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত—মনে করা যায়।
অপরপক্ষে, লোকায়তর আর একটি অর্থ আছে। শ্ৰীযুক্ত রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়(৭৫৮) যেমন বলছেন, ‘ইহলোক ঐ দর্শনের সর্বস্ব, তজ্জন্যই উহার ঐরূপ নামকরণ হয়’। মহামহোপাধ্যায় পঞ্চানন তর্করত্নের(৭৫৯) মতেও লোক—অর্থাৎ দৃশ্যমান ইহলোক—ব্যতীত, উত্তরকাল স্বীকার করে না বলেই এ-দর্শনের নাম লোকায়ত। সেণ্ট পিটার্সবার্গ অভিধানেও(৭৬০) লোকায়ত শব্দকে materialism বা বস্তুবাদ অর্থেই গ্রহণ করা হয়েছে।
