আসুরী-মতের এই কথাটি কিন্তু আমাদের কাছে নতুন নয়। তন্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনায় আমরা এই মতেরই পরিচয় পেয়েছি, এই মতেরই পরিচয় আমরা পেয়েছি সাংখ্যের সৃষ্টিতত্ত্বে : “যথা স্ত্রী-পুরুষসংযোগাৎ সুতোৎপত্তিস্তথা প্রধান-পুরুষ-সংযোগাৎ সর্গস্যোৎপত্তিঃ”।
শ্ৰীধরের কথা যদি ঠিক হয়—অর্থাৎ আসুরী-মত বলতে গীতায় যদি লোকায়ত-মতই বুঝিয়ে থাকে—এবং এই সৃষ্টিতত্ত্বই যদি আসুরী-মতের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়, তাহলে এরই সূত্র ধরে আমরা লোকায়ত, তন্ত্র এবং সাংখ্যের মধ্যে একটা সম্পর্ক খুঁজে পাই নাকি?
আরো কথা আছে। সাংখ্য-কারিকার শেষে ঈশ্বরকৃষ্ণ(৭৪৯) বলছেন, “এই পরম পবিত্র শাস্ত্র কপিল মুনি অনুকম্পা-পুরঃসর আসুরীকে প্রদান করিয়াছিলেন। আসুরী পুনরায় সেই শাস্ত্র পঞ্চশিখকে উপদেশ দেন এবং পঞ্চশিখ দ্বারা ইহা পরে বহুধা বিস্তৃত হয়।”
এখানে আসুরী ব্যক্তি-বিশেষের নাম, না, এর আর কোনো তাৎপর্য থাকতে পারে—সে-প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই খুব জোর করে দেওয়া যায় না। কিন্তু এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, বৌধায়ন(৭৫০) বলছেন, কপিল বলে এক অসুর ছিলেন, তিনি দেবতাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন এবং তিনি যে-উপদেশ দিয়েছেন তা সর্বের পরিত্যজ্য।
ঋগ্বেদের(৭৫১) ষষ্ঠ-মণ্ডলে অসুরদের বিরুদ্ধে ইন্দ্রের অভিযান-বৰ্ণনা পাওয়া যায়। তারই এক জায়গায় বলা হয়েছে :
ইন্দ্ৰ চয়মানের পুত্র অভ্যবতীর প্রতি অনুকূল হইয়া বরশিখের পুত্রগণকে সংহার করিয়াছিলেন। তিনি হরিয়ুপীয়ার পুর্বভাগে অবস্থিত বৃচীবানের বংশধরদিগকে বধ করেন, তখন পশ্চিমভাগে অবস্থিত (বরশিখের) শ্রেষ্ঠ পুত্র ভয়ে বিদীর্ণ হইয়াছিল(৭৫২)।
বৃচীবান কোনো অসুর-ট্রাইবের নাম হতে পারে(৭৫৩)। হরিয়ুপীয়া তাদেরই নগর, অর্থাৎ কোনো এক অসুর-নগর। এ-নগর কোথায় ছিলো? হরপ্পা আবিষ্কারের পর ডি.ডি. কোসাম্বী, রমেশচন্দ্র মজুমদার, বি.বি. রায় প্রমুখ ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেছেন, খুব সম্ভব এই হলো ঋগ্বেদ-উল্লিখিত ওই অসুর-নগর। এম. হুইলারও(৭৫৪) এ-সম্ভাবনাকে অস্বীকার করছেন না—ওই হরিয়ুপীয়া আর হরপ্পা এক-হওয়া অসম্ভব নয়। আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, জন মার্শাল দাবি করছেন, প্রত্নতত্ত্বের সাক্ষ্যে প্রমাণ এ-নগরে মাতৃপ্রধান শাক্ত বা তান্ত্রিক ধ্যানধারণা প্রচলিত ছিলো। একেও কি অসুর-নগরে আসুরী-মতের সাক্ষ্য বলা যায়?
শুধু মাতৃপ্রধান বা শক্তিপ্রধান ধ্যানধারণাই নয়। ওই অসুর-মত বলতে যে অধ্যাত্মবাদ-বিরোধী অফুট বস্তুবাদই বোঝা হতো ঋগ্বেদেই(৭৫৫) তার ইংগিত পাওয়া যায়।
ত্বং মায়াভিরপ মায়িনোইধমঃ স্বধাভির্ষে
অধিশুপ্তাবজুহ্বত।
ত্বং পিপ্রোর্নৃমণঃ প্রারুজঃ পুরঃ প্ৰ
ঋজিশ্বানং দস্যুহত্যেদ্বাবিথ।
—তুমি (ইন্দ্র) মায়াসমূহের দ্বারা, যাহারা নিজেদের মুখে স্বধা (অন্নহবিঃ) প্রদান করিত, সেই মায়াবীদিগকে পরাজিত করিয়াছিলে; হে নরগণের রক্ষক, তুমি পিপ্রুর নগরগুলি ধ্বংস করিয়াছিলে এবং দস্যুদিগের হত্যালীলা হইতে ঋজুপথগামীদিগকে রক্ষা করিয়াছিলে।
এখানে যে অসুরদেরই উল্লেখ করা হয়েছে সে-বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তারা নিজেদের মুখেই স্বধা প্রদান করতো। এ-কথার ব্যাখ্যায় সায়নাচার্য কৌষীতকী ও বাজসনেয়ীর উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। কৌষীতকী বলেন, “অসুরা বা আত্মন্নজুহবুরুদ্ধাতেহগ্নেী তে পরাভবন্”—অর্থাৎ, অসুরের অগ্নিকে পরাভূত করিয়া নিজেদেরই হোম করিত। বাজেসনেয়ী বলেন, “দেবাশ্চ হ বা অসুরাশ্চাম্পর্ধন্ত ততো হাসুরা অভিমানেন কৰ্ম্মৈ চ ন জুহুম ইতি স্বেষ্বাবাস্যেষু জুহ্বতশ্চেরুস্তে পরাবভূবুঃ”—অর্থাৎ, দেবতা ও অসুরগণ পরস্পর স্পর্ধাযুক্ত হইল, তাহার পর অসুরেরা অভিমান ভরে ঠিক করিল, ‘আমরা কাহাকেও হোম করিব না’; এবং অতএব নিজেদের মুখে হবিপ্রদান করিয়া তাহারা ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল এবং অবমাননা করিল।
গুণরত্ন(৭৫৬) বলেছিলেন, চর্ব থেকেই চার্বাক নামের উৎপত্তি—গলচৰ্ব অদনে, ইত্যাদি। যদি তাই হয় তাহলে যে-অসুরেরা দেবতার উদ্দেশ্যে হবিপ্রদানের প্রতিবাদে নিজেদের মুখেই অন্নহবির বা স্বধা প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলো তাদেরও চার্বাকপন্থী বলে সনাক্ত করবারই প্রলোভন হয় নাকি? এবং এই অসুরদের ধ্যানধারণাই যদি তন্ত্র ও সাংখ্যের সঙ্গে অভিন্ন হয় তাহলে এদিক থেকেও তন্ত্র ও সাংখ্যকেও লোকায়ত-মত বলেই গ্রহণ করবার সম্ভাবনা বাড়ে না কি?
এইভাবে তন্ত্র, লোকায়ত ও সাংখ্যের সম্পর্ককে বোঝবার চেষ্টা করলে আরো কয়েকটি বিষয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। প্রথমত সাংখ্যের সঙ্গে যোগ-এর সম্পর্ক। সাধারণত ধরে নেওয়া হয় যে, উত্তরযুগে এই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যদিও আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে কেউ কেউ(৭৫৭) এর বিপরীত কথা অনুমান করবার চেষ্টা করেছেন। তাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে সাংখ্য ও যোগের মধ্যে প্রভেদটাই বরং উত্তরকালের অবদান। আমরা ইতিপূর্বেই যোগের উৎস সংক্রান্ত সমস্যার আলোচনা করবার চেষ্টা করেছি এবং দেখেছি যে, পরের যুগে যোগশাস্ত্র বলতে যাই বোঝাক না কেন, আদিম কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস এবং জাতু-অনুষ্ঠানের মধ্যেই তার উৎস অনুসন্ধান করবার সুযোগ আছে। আমরা আরো দেখেছি যে, ওই আদিম কৃষিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাসের মধ্যেই তান্ত্রিক ধ্যানধারণা এবং আচারঅনুষ্ঠানের সূচনা দেখতে পাওয়া যায়। এবং এইদিক থেকে বুঝতে পারা যায়, তন্ত্রসাধনা ও যোগসাধনা আদিতে কেন পৃথক নয়। অপরপক্ষে, তন্ত্র এবং সাংখ্যের সম্পর্ক এত ঘনিষ্ঠ যে, উভয়েরই এক উৎস অনুমান করবার সুযোগ আছে। অতএব আমাদের যুক্তির বর্তমান পর্যায়ে আমরা বলতে পারি যে, যে-কারণে তন্ত্রের সঙ্গে যোগের সম্পর্ক, সেই কারণেই সাংখ্যের সঙ্গেও যোগের সম্পর্ক আদি ও অকৃত্রিম। অতএব, সাংখ্যের সঙ্গে যোগের সম্পর্ক পরের যুগেই স্থাপিত হয়েছে এ-কথা মনে করবার সঙ্গত কারণ নেই। তার বদলে বরং অনুমান করা যায়, কৃষিকাজের আদিম পর্যায়ে তত্ত্বের দিকটি সাধনার দিক থেকে স্বাতন্ত্র্য লাভ করতে পারেনি—কালক্রমে হয়তো তত্ত্বের দিকটি স্বাতন্ত্র্য লাভ করে সাংখ্য-দর্শনে পরিণত হয়েছে এবং অনুষ্ঠানের দিকটি পরিণত হয়েছে স্বতন্ত্র যোগ সাধনায়। তারপর ক্রমশ আরো উত্তরকালের দার্শনিকদের প্রচেষ্টায়, এই সাংখ্য এবং যোগ উভয়ই আস্তিক, অর্থাৎ, বৈদিক ঐতিহ্যের অন্তর্গত এবং আধ্যাত্মিক, অর্থাৎ সেশ্বর মোক্ষশাস্ত্রে পরিণত হয়েছে— পুরুষের ত্রিতাপ-নাশই তখন সাংখ্যের উদ্দেশ্য। কিন্তু এতোখানি পরিবর্তনের পরও দুয়ের মধ্যে যে-আদিম সম্পর্ক, তা সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হতে পারেনি।
