বেদান্ত ভাববাদী, সাংখ্য বস্তুবাদী—দুয়ের মধ্যে মৌলিক প্রভেদ। উপরোক্ত উক্তির মধ্যে এই স্বীকৃতিটি অবশ্যই মূল্যবান। কিন্তু তার মানে নিশ্চয়ই এই নয় যে, আমরা দুয়ের মধ্যে উপনিষদের ভাববাদকেই প্রাচীনতর এবং সাংখ্যের বস্তুবাদকে তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া-মাত্র বলে স্বীকার করতে বাধ্য। বরং, আমাদের পক্ষে নিছক ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে যেটুকু সংগ্রহ করা সম্ভবপর, তার সাক্ষ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা, আমরা আগেই দেখেছি, উপনিষদ-সাহিত্যের মধ্যে—এবং বিশেষ করে ব্রহ্মসূত্রের মধ্যে—সাংখ্যমতের বিরুদ্ধে অভিযানের প্রচেষ্টাটা স্পষ্ট; অপরপক্ষে সাংখ্যের কোনো গ্রন্থেই আমরা উপনিষদের চিন্তাধারার বিরুদ্ধে অভিযানের লক্ষণ দেখতে পাই না। অবশ্যই, এ-কথা ঠিক যে, ষষ্টিতন্ত্র প্রভৃতি সাংখ্যের আদি গ্রন্থগুলি বিলুপ্ত হয়েছে এবং সাংখ্য-সূত্র ও এমন কি সাংখ্যকারিকাও অনেক পরের রচনা বলেই এগুলির মধ্যে সাংখ্যের আদিরূপটির পরিচয় নেই। সাংখ্যের আদিগ্রন্থ উদ্ধার করা সম্ভব হলে তার মধ্যে বৈদান্তিক ভাববাদের বিরুদ্ধে সচেতন অভিযানের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যেতো কিনা সে-কথা কল্পনা করেও কোনো লাভ নেই। হয়তো যেতো; কিন্তু তার থেকেই প্রমাণিত হতো না যে, উপনিষদের ভাববাদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই সাংখ্য-দর্শনের সূত্রপাত হয়েছিলো। কেননা, তন্ত্রের সঙ্গে সাংখ্যের সাদৃশ্যের দিক থেকে এবং সাংখ্যকে তন্ত্রেরই দার্শনিক সংস্করণ হিসাবে চেনবার দিক থেকে, আমরা যে-কথা বোঝবার চেষ্টা করছি তা হলো সাংখ্য আগে না উপনিষদ আগে,—এই তর্কই অনেকাংশে ভ্রান্তিপ্রসূত। আসলে বেদান্ত ও সাংখ্য— দুটি চিন্তাধারা বৈদিক ও অবৈদিক হটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতির পরিচায়ক। এবং বৈদিক ও অবৈদিক এই দুটি সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্যকে আধুনিক বিদ্বানের অনেক সময় নিছক জাতিগত পার্থক্যের দিক থেকে বোঝবার চেষ্টা করে ভুল করেছেন; কেননা, এই দুটি সংস্কৃতির মধ্যে যে-পার্থক্য, তার সঙ্গে জাতিগত পার্থক্যের সম্পর্ক থাকুক আর নাই থাকুক, অন্তত নিছক জাতিগত পার্থক্য হিসেবে তার ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করা যায় না। আমরা ইতিপূর্বেই দেখাবার চেষ্টা করেছি যে, তান্ত্রিক ও বৈদিক ঐতিহ্যের মধ্যে যে-মৌলিক পার্থক্য তার ব্যাখ্যা উৎপাদন-পদ্ধতির পার্থক্যের দিক থেকেই খুঁজে পাওয়া সম্ভবপর : পশুপালন-প্রধান জীবন বলেই বৈদিক সমাজ পুরুষ-প্রধান এবং বৈদিক সমাজের প্রতিফলন হিসেবে বৈদিক চিন্তাধারাও পুরুষ-প্রধান। অপরপক্ষে কৃষি-নির্ভর মাতৃপ্রধান সমাজের প্রতিফলন হিসেবে, তান্ত্রিক চিন্তাধারা শক্তিপ্রধান বা মাতৃপ্রধান। তন্ত্রের সঙ্গে সাংখ্যের সাদৃশ্য যদি সত্যিই মৌলিক হয় তাহলে বৈদান্তিক চিন্তাধারার সঙ্গে সাংখ্য-মতের বিরোধটিকেও এই দিক থেকেই বোঝবার অবকাশ থাকে নাকি?
অবশ্যই এখানে আর একটি প্রশ্ন উঠবে। সাংখ্যের প্রকৃতি বলতে শুধুমাত্র female principle নয়; material principle-ও। তাই নারীপ্রধান্য ও পুরুষ-প্রাধান্যমূলক প্রভেদ ছাড়াও সাংখ্য ও বেদান্তের মধ্যে বস্তুবাদ-বনাম-ভাববাদের দিক থেকে যে-তফাত—তার ব্যাখ্যা উপরোক্ত উক্তির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না।
এই বস্তুবাদের দিক থেকে এখানে নতুন সমস্যাও ওঠে। বৈদান্তিক বা উপনিষদের চিন্তাধারা যতো চূড়ান্ত ভাববাদীই হোক না কেন, তারও একটা অতীত ছিলো এবং সেই অতীতটিকে পরীক্ষা করলে আমরা দেখতে পাই লোকায়তর মতোই একরকম প্রাকৃত বস্তুবাদী ধ্যানধারণার ধ্বংসস্তুপের উপর বৈদান্তিক ভাববাদের আবির্ভাব ঘটেছে, যদিও সেই প্রাকৃত বস্তুবাদের সঙ্গে লোকায়তিক বস্তুবাদের মূল প্রভেদ হলো এ-বস্তুবাদ পুরুষ-প্রধান চেতনার অঙ্গ, তন্ত্র ও সাংখ্যের মতো নারীপ্রাধান্যের পরিচায়ক নয়। বৈদিক ঐতিহ্য অতি দীর্ঘ; সংহিতা থেকে শুরু করে উপনিষদ পর্যস্ত সহস্রাধিক বছর ধরে রচিত হয়েছে তার সাহিত্যিক নিদর্শন। এবং এই সহস্রাধিক বছরের সাহিত্যিক নিদর্শন হুবহু একই ধ্যানধারণার পরিচায়ক নয়; এ-সাহিত্যের প্রাচীনতর অংশে ভাববাদের পরিচয় নেই এবং সেদিক থেকে পুরুষপ্রধান চিন্তার পরিচায়ক হলেও লোকায়তর মতোই তা অফুট বস্তুবাদই। সেই অস্ফূট ও আদিম বস্তুবাদের ধ্বংসস্তুপের উপরই কালক্রমে উপনিষদের ভাববাদের আবির্ভাব হয়েছে। অতএব এদিক থেকে বলা যায়, উত্তরকালে বৈদিক ঐতিহ্যের বাহকের যে-বস্তুবাদী চিন্তাকে অমন ঘৃণার চোখে দেখতে শিখেছিলেন, সেই বস্তুবাদই তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে—বৈদিক ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠাতাদের কাছে—সত্যের মর্যাদা পেয়েছিলো। কামাচার অর্থে বামাচার প্রসঙ্গেও আমরা ইতিপূর্বে (পৃ. ১০৩—১১২) এই বৈশিষ্ট্যটিই লক্ষ্য করেছি। আমরা দেখেছি, এই কামাচার বা বামাচার মানবোন্নতির প্রাচীন পর্যায়ের জাদুবিশ্বাসেরই পরিচায়ক; তার মূল কথা হলো প্রাকৃতিক উৎপাদনকে মানবীয় প্রজননের অনুকরণেই আয়ত্তে আনবার কল্পনা। বৈদিক ঐতিহে সেই জাদুবিশ্বাসের স্মারক থেকেই প্রমাণিত হয় এ-ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠাতার মানবোন্নতির সেই প্রাচীন পর্যায়েই জীবন-যাপন করতেন, যদিও তাদের অর্থনীতি মূলতই বা প্রধানতই পশুপালন-নির্ভর ছিলো বলেই, এ-জাদুবিশ্বাস শুধুই পুরুষপ্রধান নয়, লোকায়তিক বামাচারের তুলনায় অনেকাংশেই গৌণ। কারণ, ওই লোকায়তিক সংস্কৃতি মূলতই কৃষিনির্ভর, এবং কৃষিকাজের তুলনায় পশুপালনের ক্ষেত্রে জাদুবিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কম (পৃ. ৩৪২—৩৪৭)।
