মনে রাখতে হবে, সাংখ্য-দর্শন মানে অব্যক্ত, মহৎ, প্রকৃতি, পুরুষ প্রভৃতি কয়েকটি দার্শনিক পরিভাষামাত্র নয়; তাই উপনিষদের মধ্যে ওই পরিভাষাগুলির পরিচয় পেলেই সাংখ্য-দর্শনের বীজ খুঁজে পাওয়া গেলে বলা যায় না। তার বদলে, সাংখ্য একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক মতবাদ, যে-মতবাদটিকে খণ্ডন করবার জন্য বাদরায়ণ অতো রকমের আয়োজন করেছেন। সে-মতবাদ অনুসারে অচেতন প্রকৃতি বা প্রধানই জগৎকারণ; পুরুষ নেহাতই অপ্রধান এবং উদাসীন। এই কথাটি মনে রাখলে নিশ্চয়ই স্বীকার করতে হবে যে, উপনিষদের মধ্যেই ওই সাংখ্যমতের বীজ খুঁজে পাওয়া সত্যিই যাচ্ছে না; তার বদলে সাংখ্যমত খণ্ডনেরই একটা প্রবল প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। অতএব, উপনিষদের এই সাক্ষ্যগুলি থেকে বুঝতে পারা যায় যে, সাংখ্যমত শুধুই যে উপনিষদ-বিরুদ্ধ তাই নয়, তুলনায় প্রাচীনতরও। উপনিষদ রচনার আগে থাকতেই এই মতটি নিশ্চয়ই এদেশে প্রচলিত ছিলো; তা না হলে উপনিষদকারেরা কী করে এই মতকে এ-ভাবে খণ্ডন করবার চেষ্টা করলেন?
এদিক থেকে, শঙ্করাচার্য(৭৪০) যখন বলেন, উপনিষদের দার্শনিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করবার জন্য সাংখ্যাদিমত খণ্ডনের একান্ত প্রয়োজন,—‘বেদান্তবাক্যানি ব্যাচক্ষাণৈঃ সম্যগ্দর্শনপ্রতিপক্ষভূতানি সাংখ্যাদিদর্শনানি নিরাকরণীয়ানীতি’— তখন তিনি নিশ্চয়ই আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে যারা বেদান্ত বা উপনিষদের মধ্যেই সাংখ্যের বীজ অনুসন্ধান করেন তাঁদের তুলনায় সাংখ্য ও উপনিষদ উভয় মতবাদকেই অনেক সম্যকভাবে বোঝবার সহায়তা করেন।
অধ্যাপক রিচার্ড গার্বের কথায় ফিরে আসা যাক। তিনি যখন সিদ্ধান্ত করছেন যে, সাংখ্য আদিতে অ-বৈদিক মত ছিলো, তখন আমরা তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহজেই একমত হতে পারি। বেদান্ত-সূত্রকারের সাংখ্য-খণ্ডনই এর একমাত্র প্রমাণ নয়। আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি পশুপালন-নির্ভর বৈদিক সমাজ পুরুষ-প্রধান ছিলো বলেই বৈদিক চিন্তাধারাতেও এই পুরুষপ্রাধান্যের স্বাক্ষর পাওয়া যায়; অপরপক্ষে সাংখ্য-দর্শনের প্রধান বা
প্রকৃতি শুধুই অচেতনবস্তুবাচক বা material principle নয়, তাছাড়াও নারীবাচক বা female principle-ও। কিন্তু অধ্যাপক গার্বে সেইসঙ্গেই যখন বলেন, কালক্রমে এই সাংখ্য-দর্শনই উপনিষদাদির মধ্যে স্বীকৃত বা গৃহীত হয়েছিলো, তখন স্বভাবতই আমরা তার মন্তব্যটিকে মেনে নিতে অত্যন্ত সঙ্কোচ বোধ করি। কেননা, উপনিষদের চিন্তাধারা শুধুই ভাববাদী বা idealistic নয়, পুরুষপ্রধানও (পূঃ ১৫২)। অতএব, উপনিষদের চিন্তাধারার মধ্যে কালক্রমে সাংখ্য-মতের স্থান হওয়ার সম্ভাবনা সত্যিই সঙ্কীর্ণ। এবং উপনিষদের মধ্যে সাংখ্য-মত স্বীকৃত হবার নিদর্শন হিসেবে অধ্যাপক গার্বে উপনিষদের যে-অংশগুলির উল্লেখ করছেন, সেগুলিকে স্পষ্টভাবে বিচার করলেও আমরা দেখতে পাই যে, আসলে সেখানে সাংখ্যমত গ্রহণ করবার পরিবর্তে সাংখ্যমত খণ্ডন করবার প্রচেষ্টাটাই প্রকট। আমরা আরো বলতে চাই যে, অধ্যাপক গার্বের যুক্তি এখানে স্বপক্ষদোষদুষ্টও হয়েছে। কেননা, সাংখ্য যে আদিতে শুধু নিরীশ্বরবাদই নয়, বস্তুবাদও ছিলো—একথা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। এবং একথা যদি ঠিক হয় তাহলে তাকে মানতে হবে যে, অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী উপনিষদের মধ্যেই কালক্রমে নিরীশ্বরবাদী ও বস্তুবাদী সাংখ্য-দর্শনেরও স্থান হয়েছিলো।
আদিসাংখ্যকে যে বস্তুবাদী বলাই বাঞ্ছনীয়—একথা অধ্যাপক গার্বে কী ভাবে স্বীকার করছেন? বৌদ্ধদৰ্শনের আদিরূপটির সঙ্গে সাংখ্যের আদিরূপটির সাদৃশ্য দেখাবার উদ্দেশ্যে তিনি(৭৪১) বলছেন :
…it is a merit of Oldenberg to have emphatically pointed out the fact that primitive Buddhism does not yet know the often mentioned speculations on the nothingness of the world, but that, on the contrary, the idea of nothingness belongs to the later metaphysics of the Buddhists. The world of objects is, therefore, considered to be real by Buddha as well as by Kapila (c.f. Sutra I, 79; VI, 52); and this world of objects comprehends also the psychic organs and states according to the systems of both. As in Sankhya philosophy, even the highest internal processes, like thinking, volition, judging, etc., are mechanical functions of Matter, which are not to be ascribed to the Atman, but must be known to be anatman, so Buddha teaches, too, that… ‘sentiments, conceptions and cognition’ are anatta (= anatma).
সাংখ্য-মতে যদি চিন্তা, ইচ্ছা, বিচার প্রভৃতি মানসব্যাপারগুলিও অচেতনবস্তু বা matter-এরই যান্ত্রিক বিকাশমাত্র হয়,—যদি এগুলিও আত্মজনিত না হয়ে অনাত্মজনিতই হয়,—তাহলে বৌদ্ধ দর্শনের আদিরূপটির সঙ্গে তার সাদৃশ্য থাকুক আর নাই থাকুক, অন্তত উপনিষদের চিন্তার মধ্যে তার স্থান কষ্টকল্পিত হতে বাধ্য। কেননা, উপনিষদ মূলতই ভাববাদী এবং এই ভাববাদের সঙ্গে বস্তুবাদের সংঘর্ষই দর্শনের ইতিহাসে সবচেয়ে মৌলিক দ্বন্দ্ব(৭৪২)। এবং অধ্যাপক গার্বেও স্বীকার করেছেন যে, উপনিষদের চিন্তার সঙ্গে সাংখ্যের যে-বিরোধ, তা আসলে ভাববাদের সঙ্গে বস্তুবাদেরই মূল বিরোধ। অধ্যাপক গার্বে(৭৪২) বলছেন, “আমার মতে এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না যে, উপনিষদের ব্রহ্মন্-আত্মন্মূলক যে ভাববাদী মতবাদ,—যে-মতবাদ বেদ থেকেই শুরু এবং উত্তরকালে যা বেদান্ত দর্শনের কেন্দ্র হয়েছে—সেই মতবাদটি অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতবাদের তুলনায় প্রাচীনতর। এই ভাববাদ সংহত-রূপে এবং সোৎসাহে প্রচারিত হতে শুরু হবার পর এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই সাংখ্য-দর্শনের উদ্ভব হয়েছিলো”।
