অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তের যুক্তি যদি ঠিক হয়,—অর্থাৎ, চরকসংহিতায় যদি সত্যিই সাংখ্য-দর্শনের কোনো প্রাচীনতর পর্যায়ের পরিচয় পাওয়া যায় এবং সেই পরিচয় অনুসারে সাংখ্যের পুরুষও যদি প্রকৃতিরই অব্যক্ত অংশমাত্র হয়,—তা হলে সাংখ্যের আদিরূপটিকে দ্বৈতবাদ না বলে বস্তুবাদ আখ্যা দেবার সম্ভাবনা অনেক বাড়ে না কি? এবং সাংখ্য-দর্শন এইভাবে মূলত বস্তুবাদী ছিলো বলেই ভাববাদী ও অধ্যাত্মবাদী বৈদান্তিক চিন্তাধারার পক্ষ থেকে সাংখ্য-দর্শনকেই প্রধানতম প্রতিপক্ষ বলে গ্রহণ করবার তাগিদটাও অনেক ভালো করে বুঝতে পারা যায়।
সাংখ্য হলো অচেতনকারণবাদ, প্রধানকারণবাদ। সাংখ্যমতে পুরুষ নেহাতই অপ্রধান এবং উদাসীন। এই মূল কথা ক’টি মনে রেখে এবার আমরা উপনিষদের সেই অংশগুলির বিচার করবো যেগুলির মধ্যে আধুনিক বিদ্বানেরা সাংখ্য-দর্শনের বীজ আবিষ্কার করবার কল্পনা করেছেন। এ-জাতীয় অংশের তালিকা আমরা ইতিপূর্বেই তৈরি করেছি; এখানে সে-তালিকা থেকে কিছু কিছু নমুনা উদ্ধৃত করা যাক :
কঠোপনিষৎ থেকে :
ইন্দ্ৰিয়সমূহ হইতে ইন্দ্রিয়বিষয়সমূহ শ্রেষ্ঠ, ইন্দ্ৰিয়-বিষয়সমূহ হইতে মন শ্রেষ্ঠ, মন হইতে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ এবং বুদ্ধি হইতে মহান আত্মা শ্রেষ্ঠ ॥ ১,৩,১০॥
মহং হইতে জগতের বীজরুপ অব্যক্ত শ্রেষ্ঠ, অব্যক্ত হইতে পুরুষ শ্রেষ্ঠ, পুরুষ হইতে শ্ৰেষ্ঠ আর কিছুই নাই; তিনি শেষ, তিনি পরা গতি ॥ ১, ৩, ১১ ॥ ইন্দ্ৰিয়সমূহ হইতে মন শ্রেষ্ঠ, মন হইতে সত্ত্ব শ্রেষ্ঠ, সত্ত্ব হইতে মহান আত্মা অধিক, মহৎ হইতে অব্যক্ত শ্রেষ্ঠ ॥ ২,৩,৭, ॥
অব্যক্ত হইতে ব্যাপক এবং অ-লিঙ্গ পুরুষ শ্রেষ্ঠ, যাহাকে জানিয়া জীব মুক্ত হয় এবং অমৃতত্ত্ব প্রাপ্ত হয় ॥ ২,৩,৮, ॥
শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ থেকে :
ঈশ্বর এই পরস্পরসংযুক্ত ক্ষর ও অক্ষর, ব্যক্ত ও অব্যক্ত সমুদয় বিষয় ধারণ করিয়া আছেন। আর অনীশ (অর্থাৎ ঈশ্বরত্ববিহীন) আত্মা ভক্ত ভাববশত: অবিদ্যাদি বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু দেবকে (অর্থাৎ ঈশ্বরকে) জানিয়া সমুদয় বন্ধন হইতে মুক্ত হয় ॥১,৮॥
প্রধান (অর্থাৎ প্রকৃতি) ক্ষর; হর (the soul, হিউমের তর্জমা) অমৃত ও অক্ষর। সেই ‘একঃ দেবঃ’ প্রকৃতি ও আত্মাকে নিয়মিত করেন। তাঁহার চিন্তন এবং তাঁহার সহিত সংযোগ ও একত্বদ্বারা অন্তে সম্পূর্ণরূপে সমুদয় মোহ নষ্ট হয় ॥১,১০॥
পুরুষ অর্থাৎ পরমাত্মাই মহান প্রভূ, ইনি অন্তঃকরণের প্রবর্তক, মুনির্মল পরমপদ প্রাপ্তির নিয়ন্তা, জ্যোতির্ময় ও অব্যয় ॥৩,১২॥
লোহিত-শুক্ল-কৃষ্ণা বহু প্রজার উৎপাদিকা এক অজার সহিত শয়ন করিয়া এক অজ উপভোগ করে; অপর আজ এই ভূক্তভোগ্যাকে পরিত্যাগ করে ॥৪,৫৷৷ মায়াকেই প্রকৃতি বলিয়া জানিবে এবং মায়ীকে মহেশ্বর বলিয়া জানিবে; তাহার অঙ্গসমূহ দ্বারাই এই সমস্ত জগৎ ব্যাপ্ত রহিয়াছে ॥৪, ১০৷৷
যে অদ্বিতীয় (পরমাত্মা) প্রত্যেক কারণ, সমুদয় রূপ এবং সমুদয় বীজের অধিষ্ঠাতা, যিনি সকলের অগ্রে প্রসূত ঋষি কপিলকে (= কনকবর্ণ হিরণ্যগৰ্ভ?) জ্ঞানদ্বারা পোষণ করেন এবং তাহাকে জন্মাইতে দেখিয়াছিলেন ॥৫, ২৷৷
যিনি (পরমাত্মা) গুণত্রয়যুক্ত হইয়া সুখদুঃখাদি ফলবৎ কর্ম করেন, তিনিই সেই কর্মের ফলভোগ করেন। তিনি নানারূপ ত্রিগুণ, ত্রিবত্মর্ণ হইয়া নিজকর্মবশে সঞ্চরণ করেন ॥৫, ৭৷৷
যিনি অঙ্গুষ্ঠমাত্র রবিতুল্যরূপ, যিনি সংকল্প ও অহংকারের সহিত মিলিত হইয়া বুদ্ধি ও আত্মগুণ সমন্বিত হইয়া লোঁহকণ্টকের অগ্রভাগের ন্যায় দৃষ্ট হন।॥৫, ৮॥
যে অদ্বিতীয় দেবতা উর্ণনাভের ন্যায় স্বভাবত প্রধানজাত তন্তুসমূহদ্বারা আপনাকে আচ্ছাদিত করিয়াছেন, তিনি আমাদিগের ব্রহ্মে প্রবেশ বিধান করুন ॥৬, ১০ ৷৷
যিনি নিত্যদিগের মধ্যে নিত্য, চেতনাবাদিগের মধ্যে চেতনাবান, যিনি একাকী অনেকের কাম্যবস্তুসকল বিধান করিতেছেন, সেই কারণরূপী দেবকে সাংখ্য-যোগ দ্বারা জানিয়া সাধক সমুদয় বন্ধন হইতে মুক্ত হন ॥৬, ১৩৷৷
(হিউমের(৭৩৮) তর্জমা অনুসারে এখানে সাংখ্য-যোগ discrimination and abstraction—প্রাচীন ভাষ্যকারদের অনুসরণ করেই হিউম এ-তর্জমা করেছেন)।
তিনি বিশ্বকৃৎ, বিশ্ববিৎ, স্বয়স্থ, কালের কর্ত, গুণী, সর্ববিৎ, প্রধানের ও ক্ষেত্রজ্ঞের স্বামী গুণের ঈশ্বর এবং সকলের স্থিতি, বন্ধন ও মোক্ষের কারণ ॥৬, ৮৬ ৷৷
একইভাবে, গীতা-বর্ণিত সাংখ্যও(৭৩৯) বাদরায়ণ-খণ্ডিত সাংখ্য নয়।
এখানে, একটি অত্যন্ত সরল প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন : বাদরায়ণ সাংখ্য-মত হিসেবে যে-অচেতনকারণবাদকে খণ্ডন করবার চেষ্টা করেছেন, উপনিষদের উদ্ভূত উক্তিগুলির মধ্যে কি সেই মতেরই পরিচয় পাওয়া যায়, ন, সেই মতকে চেতনকারণবাদের চেয়ে নিকৃষ্ট বলে প্রতিপন্ন করবার চেষ্টাই চোখে পড়ে? উপনিষদের ওই অংশগুলিতেও কি জগৎকারণ হিসেবে অচেতন প্রধানকেই চেনবার চেষ্টা করা হয়েছে? এখানেও কি পুরুষকে অপ্রধান এবং উদাসীন হিসেবে গৌণ জ্ঞান করা হয়েছে? নিশ্চয়ই নয়। বরং তার বিপরীত কথাই এই উক্তিগুলির মধ্যে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া যায়। কঠোপনিষদ বলছে, অব্যক্ত হইতে পুরুষ শ্রেষ্ঠ, পুরুষ হইতে শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নাই। একি সাংখ্যের মত, না, সাংখ্যমত খণ্ডন? অন্তত, সাংখ্যমত হিসেবে বাদরায়ণ যে-মতটি খণ্ডন করছেন এখানে নিশ্চয়ই তার পরিচয় পাওয়া যায় না। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে যখন প্রধানকে ছোটো করে পুরুষ, পরমাত্মা, দেব ও ঈশ্বরের উপদেশ দেওয়া হচ্ছে, যখন বলা হচ্ছে অদ্বিতীয় দেবতাই উর্ণনাভের ন্যায় আত্মস্বভাব প্রসূত প্রকৃতি দ্বারা নিজেকে আচ্ছাদন করেছেন—তখন কি আমরা সে-কথাকে সাংখ্যের উপদেশ বলে গ্রহণ করবো, না, সাংখ্যের অচেতনকারণ-বাদকে তুচ্ছ প্রতিপন্ন করে, চেতনকারণ-বাদকেই প্রতিষ্ঠা করবার আয়োজন বলে স্বীকার করতে বাধ্য হবো?
