তাহলে এই সাংখ্য-সূত্র বলে পুঁথিটি নামে সাংখ্য হলেও বিজাতীয়,— অর্থাৎ বৈদান্তিক,—চিন্তাধারায় ভরপুর। এবং সাংখ্য সূত্রেরই যদি এই দশা হয়, তাহলে বিজ্ঞানভিক্ষুর ভাষ্য যে এ-বিষয়ে আরো অনেক চূড়ান্ত আপোসের পরিচয় দেবে সে-বিষয়ে আর বিস্ময়ের অবকাশ কোথায়? স্বভাবতই আদিসাংখ্যের নিরীশ্বরতাকে উড়িয়ে দেবার আশায় তাকে নানা রকম অত্যদ্ভুত যুক্তির অবতারণা করতে হয়েছে; অধ্যাপক গার্বে এই বিস্ময়কর যুক্তিগুলির তালিকা করে দিয়েছেন।
সাংখ্য যে আদিতে এই রকম নিরীশ্বরবাদই ছিলো,—অতএব আজকাল সাংখ্য-দর্শনের মধ্যে আমরা যে-সব আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গের পরিচয় পাই, সেগুলি যে উত্তরকালে সাংখ্যের উপর প্রক্ষিপ্ত ধ্যানধারণা মাত্র—এ-বিষয়ে স্পষ্টভাবে সচেতন হলেও আধুনিক বিদ্বানেরা আর একটি বিষয় সম্বন্ধে সম্যকভাবে সচেতন হননি। বিষয়টি হলো, আদি-সাংখ্য শুধুই নিরীশ্বরবাদ নয়, জড়বাদ বা বস্তুবাদও। এই বিষয়টি সম্বন্ধে সম্যকভাবে সচেতন নন বলেই আধুনিক বিদ্বানেরা সাধারণত সাংখ্য-দর্শনকে বস্তুবাদ না বলে দ্বৈতবাদ বা dualism আখ্যা দিয়ে থাকেন।
দ্বৈতবাদ বলা হয় কেন? কেননা, সাংখ্যে প্রকৃতি ছাড়াও পুরুষের তত্ত্ব রয়েছে এবং প্রকৃতি অচেতন-পদার্থ হলেও পুরুষ চেতন পদার্থ।
অতএব, আমাদের পক্ষে প্রশ্ন তোলা দরকার সাংখ্য-দর্শনে প্রকৃতি ছাড়াও ওই পুরুষের তত্ত্ব আছে বলেই কি তাকে বস্তুবাদ না বলে দ্বৈতবাদ বলা প্রয়োজন? উত্তরে আমরা বলতে চাই, অন্তত আদি-সাংখ্যকে এইভাবে দ্বৈতবাদ বলবার প্রয়োজন নেই। কেননা তা যদি থাকতো তাহলে বাদরায়ণ-প্রমুখ প্রাচীনের সে-তাগিদ অনুভব করতেন—অর্থাৎ, সাংখ্যকে সরাসরি অচেতনকারণ-বাদ না বলে তারা একে অচেতন-চেতন-কারণবাদ বা ওই ধরনের কোনো আখ্যা দিতে বাধ্য হতেন। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, প্রাচীনের সাংখ্যকে শুধুমাত্র অচেতনকারণ-বাদ আখ্যা দিতে কোনো রকম দ্বিধা বোধ করেননি। তার কারণ কি এই যে, তারা জানতেন না সাংখ্য-দর্শনে প্রকৃতি ছাড়াও পুরুষের তত্ত্ব আছে? নিশ্চয়ই জানতেন। কিন্তু তা ছাড়াও তাঁরা জানতেন যে, এই পুরুষের স্থান সাংখ্য-দর্শনের আদি-আকৃত্রিম ংস্করণটিতে এমনই গৌণ যে, তা থাকলেও যেন না থাকারই সামিল। কেননা পুরুষ অপ্রধান, পুরুষ উদাসীন। “কথঞ্চোদাসীন পুরুষঃ প্রধানং প্রবর্তয়েৎ?” —উদাসীন পুরুষ কী ভাবে প্রধানকে প্রেরণ করবে? এবং বৈদান্তিকের অত্যন্ত স্পষ্টভাষাতেই বলেছেন, এ-বিষয়ে সাংখ্য-দর্শনের অন্ধ-পঙ্গু বা লৌহঅয়স্কান্তের উপমা কোনোমতেই সন্তোষজনক হতে পারে না। আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, আধুনিক বিদ্বানেরাও অনেকেই কী ভাবে সাংখ্য-দর্শনের মধ্যে পুরুষের স্থান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন : ন্যায়সঙ্গতভাবে সাংখ্যতত্ত্বের সঙ্গে পুরুষের কোনো মৌলিক যোগাযোগ নেই, অথচ তা রয়েছে; জগৎকারণ অচেতন প্রকৃতি বা প্রধানের পাশে পুরুষের তত্ত্বটুকু বাস্তবিকই এতো গৌণ যে, সাংখ্য-দর্শনের প্রবর্তকের এটুকু বাদ দিলেই বরং আরো যুক্তিসঙ্গত মনোভাবের পরিচয় দিতেন। আমরা দেখাবার চেষ্টা করেছি যে, আদিতে পুরুষ বলতে চেতন-আত্মার পরিবর্তে পুরুষমানুষই বোঝাতো এবং সাংখ্য-তত্ত্বের মধ্যে মাতৃপ্রধান সমাজবাস্তব প্রতিবিম্বিত হয়েছে বলেই সে-সমাজে পুরুষের স্থানকে কেন্দ্র করে যে-অন্তর্বিরোধ, তারই প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় সাংখ্য-দর্শনের পুরুষতত্ত্বটি নিয়ে অন্তর্বিরোধের মধ্যে। আপাতত, সে-যুক্তির কথা বাদ দিয়েও আমরা দেখাতে চাইছি যে, সাংখ্য-দর্শনে পুরুষের তত্ত্ব থাকা সত্ত্বেও আদি-সাংখ্যকে দ্বৈতবাদ মনে করা ঠিক হবে না; কেননা ওই প্রকৃতি ও পুরুষের মধ্যে গুরুত্ব সমান নয়—প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টির স্থান এমনই গৌণ ও অকিঞ্চিৎ যে, আধুনিক বিদ্বানেরা এমন কি একথাও মনে করেছেন যে, এই তত্ত্বটিকে বাদ দিলেই বরং সাংখ্যকারেরা আরো বেশি সুসংলগ্ন চিন্তার পরিচয় দিতেন।, এবং বাদরায়ণ প্রমুখ প্রাচীন বিদ্বানেরাও তর্ক করে বলেছেন, অচেতনকারণবাদ হিসেবে সাংখ্যের যেটা মূল দুর্বলতা (আমরা বলতে পারি বৈশিষ্ট্য) তা ওই উদাসীন পুরুষটির তত্ত্ব যোগ করেও খুব কিছু পরিবর্তিত হয় না। অতএব, প্রাচীন ও আধুনিক বিদ্বানদের এই যুক্তি যদি ঠিক হয় তাহলে, তত্ত্ব আছে বলেই সাংখ্য-দর্শনকে বস্তুবাদ বা materialism না বলে দ্বৈতবাদ বা dualism বলা যুক্তিসঙ্গত হবে না।
অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত(৭৩৭) ও প্রাচীন সাংখ্য সংক্রান্ত আর একটি অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করেছেন যার তাৎপর্য আমাদের এই যুক্তিকে সম্যকভাবে সাহায্য করতে পারে। তিনি দেখাচ্ছেন, সাংখ্য-দর্শনের প্রাচীনতর একটি রূপের পরিচয় পাওয়া যায় চরক-সংহিতায়,—যদিও দুঃখের বিষয়, অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত বলছেন, আধুনিক বিদ্বানেরা এই রূপটির প্রতি এখনো উপযুক্ত মনোযোগ দেননি। অতএব প্রশ্ন হলো, চরক-সংহিতায় সাংখ্য-দর্শনের যে-পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে তার দিক থেকে প্রকৃতি ও পুরুষের সম্বন্ধ কী রকম? চরকের মতে, প্রকৃতিরই অব্যক্ত অংশটির নাম পুরুষ। প্রকৃতির যেটা বিকার বা পরিণামের দিক তার নাম ক্ষেত্র এবং প্রকৃতির যেটা অব্যক্ত দিক তার নাম ক্ষেত্ৰজ্ঞ : অব্যক্তমস্য ক্ষেত্রস্য ক্ষেত্ৰজ্ঞমৃষয়ো বিদ্যুঃ। অব্যক্ত এবং চেতনা একই। এই চেতনা বা অব্যক্ত-প্রকৃতি থেকে বুদ্ধি, বুদ্ধি থেকে অহংকার, অহংকার থেকে পঞ্চভূত এবং পঞ্চেন্দ্রিয়ের উৎপত্তি এবং সেই উৎপত্তিকেই আমরা সৃষ্টি আখ্যা দিয়ে থাকি।
